Loading..

ব্লগ

রিসেট

০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ

বা'জান তুমি আইবা না আর গেরামে? তোমার আম্মারে শেষ দেখা তো দেখতে পারলা না অন্তত আমারে দেইখা যাও।"

"বা'জান তুমি আইবা না আর গেরামে?


তোমার আম্মারে শেষ দেখা তো দেখতে পারলা না অন্তত আমারে দেইখা যাও।"


আব্দুল মিয়ার বৃদ্ধ কন্ঠের করুন কথার বিপরীতে ফোনের অপরপাশে থাকা তার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ডাক্তার ছেলে মুখ ঝামটা দিয়ে বলল 

-'এটা কী মুখের কথা যে বললেই চলে আসা যায়? আমেরিকা থেকে বাংলাদেশের দূরত্ব জানো? বললেই তো আসা যায় না। আমি চেষ্টা করবো। এখন আর বিরক্ত করো না ফোন রাখো।'


বৃদ্ধ আব্দুল হাতের টেলিফোনটা ফেক্সিলোডের দোকানদার ছেলেটার দিকে এগিয়ে দেয়। রীতিমতো বৃদ্ধার ঘোলাটে চোখে জলে টইটম্বুর। দোকানী ছেলে রাফিন ফোনটা রাখতে রাখতে বলল

-'চাচা রোজ এমন ঝাড়ি খাইতে আপনার কত ভালো লাগে?'

বৃদ্ধ চোখে জল নিয়েও মুখে হাসি দিয়ে গর্বের সহিত বলল

-'ছেলে আমার মস্ত বড় ডাক্তার। এত কামের মাঝেও যে ফোনটা ধইরা চাইরডা কথা কয় সেডাও বা কম কিসে?'


ফেক্সিলোডের দোকানের পাশে থাকা টং দোকান থেকে ষাটোর্ধ্ব মতিন বলে উঠলো

-'অমন ডাক্তার পোলা দিয়া কী হইবো আব্দুল? যে পোলা ছয় বছর ধইরা বিদেশের মাটি কামড়াইয়া পইড়া আছে, মায়ের মরার সময়ও আসতে পারে নাই,বাপের একলা জীবনেও সাথ দিতে পারে নাই এমন শিক্ষিতের কী লাভ? আমার পোলা চা বেচে তাও শান্তি। দিনশেষে আব্বা ডাকটা হুনতে পারি।'


বৃদ্ধ আব্দুল কথা বলে না। মাথা নিচু করে গ্রামের পথ ধরে হাঁটা শুরু করে। ছেলেরে ডাক্তার বানিয়েছিলো নিজের সব জমিদারী বিক্রি করে, এই গ্রামের পথ ধরে বুক ফুলিয়ে গর্বে মাথা উঁচু করে হাঁটবে বলে কিন্তু আজ সেটাই লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়ালো? ছেলে তার আমেরিকা হতে বাংলাদেশের দূরত্ব কত জিজ্ঞেস করে কিন্তু ছেলে ভুলে গেছে দুরত্ব মাপার যোগ্যতাটা তার বাবা'ই তাকে করে দিয়েছে। ছেলে জানেনা সে আমেরিকা আর বাংলাদেশের দূরত্ব জানলেও বাবার গুরুত্ব এখনো জানে নি। 

______

বিলেত ফেরত আব্দুল মিয়ার ডাক্তার ছেলে দাঁড়িয়ে আছে বাবা মায়ের কবরের সামনে। টং দোকানের ষাটোর্ধ্ব মতিন কবরের পাশে দক্ষিণ দিকের নারকেল গাছটা দেখিয়ে বলল,

-'তোমারে বিদেশ পাঠানের লাইগ্যা ভাবী আর আব্দুল সব বেইচ্চা ফেলছিলো।


কত কষ্টে যে জীবন যাপন করছিলো। আমরা ভাবছিলাম ছেলে মানুষ হইয়া ফিইরা আইয়া কষ্ট মুইছা দিবো বাপ মার, কে জানতো ছেলে যে পড়ালেখা কইরা কতগুলা কাগজ পত্রই কামাই ছিলো মনুষ্যত্ব কামায় নাই। এই নারকেল গাছটা তোমার বাপে বড় যত্ন কইরা রাখছে। ভাবছিলো দেশে আইলে ছেলের পছন্দের কচি ডাব পাইড়া খাইবো কিন্তু হেই বাপের ইচ্ছায় পানি ঢাইলা ছেলে তো আর দেশে ফিরলো না।


জানো, মরার আগেও শেষ নিঃশ্বাস যখন ফেলছিলো তখনও বইলা গেছে মতিন আমার পোলা আইলে ডাব পাইড়া খাওয়াইছ।কিন্তু আব্দুল জানলো না এখনকার পোলাপাইন সব ঘূণেধরা।তারা ভালোবাসা বুঝে না।'


বিলেত ফেরত ডাক্তার কেবল তাজ্জব বনে বাবা মায়ের কবরের পানে তাকিয়ে রইল। বড্ড দেড়িতে আমেরিকার আর বাংলাদেশের দূরত্ব ঘুচিয়ে বাবার গুরুত্ব বুজে ছিলো  কিন্তু ততদিনে বড্ড দেরি হয়ে গেলো। বাবা যেতে যেতেও ছেলের কথা ভুলে নি। বাবা-মা এর মর্ম আজকাল ছেলেমেয়েরা বুঝে না। সত্যিই আজকাল ছেলেমেয়ে গুলো ঘূণেধরা সন্তান।


(সমাপ্ত)


©কালেক্টেড

মন্তব্য করুন

ব্লগ