সহকারী শিক্ষক
০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০৯:৪২ অপরাহ্ণ
শিক্ষাক্রম- ২০২১ ও বাস্তবতা
শিক্ষাক্রম- ২০২১ ও বাস্তবতা
___________________________
সপ্তদশ শতকে ইউরোপে বনেদি বংশের লোকদের রাখালপ্রীতি ছিল কিন্তু রাখাল কেউ হতে চাইত না। খুব বেশি দূরের কথা না, গত শতকের মার্কিন মুল্লুকেই তো জন ওয়েনকে দেখে বুনো কাউবয় হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে অনেকেই কিন্তু ওয়েস্টার্ন ফ্যান্টাসি বাস্তবায়িত করেছে ক'জন ? একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাঙ্গালীদের শিক্ষকপ্রীতি ঠিক তেমনিই। শিক্ষকতা মহান পেশা, শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর ইত্যাদি মুখরোচক বুলি সবাই আওড়িয়েছেন কিন্তু কয়জন শিক্ষক হতে চেয়েছেন ? সবারই টানেল ভীশন ডাক্তার ,ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার, প্রশাসনিক কর্মকর্তা হওয়া। ফলশ্রুতিতে আমার মত পেছনের সারির শিক্ষার্থীদের জীবন ও জীবিকার তাগিদে বেছে নিতে হয় শিক্ষকতা পেশা।
শিক্ষকতা মানবজাতির ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যা চর্চা ও বিদ্যা শিক্ষার একটি পবিত্র সাধনা । এতে লোভ লালসার কোন স্থান ছিল না। তবে আজকের শিক্ষা একটি বিপণনযোগ্য পণ্য যা লাভ লোকসানের বেনিয়া তাড়নায় নিয়ন্ত্রিত হয়। যে সমাজের আদর্শ সবার উপরে নিজের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সত্য তাহার উপরে নাই , সে সমাজে শিক্ষা পণ্য হওয়াটাই স্বাভাবিক। শিক্ষার সাথে অর্থের সম্পর্ক এটা যে শুধু এখনকার সমস্যা তা কিন্তু নয়। আমরা যদি ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে আমরা এর গুঢ় রহস্য সে প্রাচীন ও মধ্যযুগ থেকেই দেখতে পাই।
প্রাচীন গ্রিসে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। এক ঘরানার দার্শনিকগণ মনে করতেন, অর্থের বিনিময়ে শিক্ষাদান পাপের সমতুল্য যার নেপথ্যে রয়েছেন সক্রেটিস। আরেক ঘরানার দার্শনিকগণ বিশ্বাস করতেন যে, শিক্ষা শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনে সাফল্যের জন্য গড়ে তোলে কাজেই অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা দেওয়া ন্যায়সঙ্গত। আর এই ধারণাটি আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত ।এই ধারণার প্রবক্তা হলেন দার্শনিক প্রোটাগোরাস। তৃতীয় মতবাদের প্রবক্তারা মনে করতেন যে, বিদ্যার জন্য অর্থের প্রয়োজন রয়েছে, তবু বিদ্যাকে অর্থের দাসে পরিণত করা মোটেও উচিত নয় বরং শিক্ষা আমাদেরকে শেখাবে দারিদ্র্য ও ঐশ্বর্যের মধ্যে কিভাবে সমন্বয় সাধন করতে হয় অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা ঐশ্বর্যের দাস হবে না বরং ঐশ্বর্যের প্রভু হবে।
প্রাচীন চীনেও দেখা যায় কনফুসিয়াস ও তার শীর্ষরা অর্থের বিনিময়ে পড়াতেন। যদিও তারা অর্থের বিনিময়ে অনেকে পড়াতেন কিন্তু প্রাচীন ও মধ্যযুগের শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল আধ্যাত্বিক কিন্তু আধুনিক যুগে এসে আমরা সে পথ থেকে অনেক বিচ্যুত হয়েছি। আমরা এতটা বেশি কমার্শিয়াল হয়েছি আমাদের শিক্ষাকে এতটা বেশি পণ্যে রূপান্তরিত করেছি ,যাকে বলা যায় দারুণ্যে কি নিদারুণ ! মূল্যবোধ তথা আধ্যাত্মিকতা শিক্ষা থেকে যোজন যোজন বহুদূর।
তাই আমি মনে করি, এখন সময় এসেছে আমাদেরকে বিবেচনা করতে হবে আমরা শিক্ষাকে কিভাবে গ্রহণ করব। উপরে তিনটি দার্শনিক মতবাদটিকে লক্ষ্য করলে এটা সহজে অনুমেয় বিদ্যার সাথে অর্থের সম্পর্ক দূষণীয় নয় কিন্তু দূষণীয় তখনই হবে যখন শিক্ষা অর্থের দাসে পরিণত হবে।
কালের পরিক্রমায় শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন হয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে অনেক নেতাই কল্পনা করেছিলেন যে, শিক্ষার প্রসারের সাথে সাথে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে "নতুন মানুষের” আবির্ভাব ঘটবে । কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি “নতুন মানুষের" স্বপ্ন আজও স্বপ্নই রয়ে গেছে।যে দেশে শিক্ষা বিপণনযোগ্য পণ্য ,সে দেশে সুষম মানবসম্পদ উন্নয়ন অলীক কল্পনা মাত্র।
একবিংশ শতাব্দীতে বৈপ্লবিক কারিগরি পরিবর্তনের ফলে শিক্ষা জগতে আমূল পরিবর্তন সময়ের দাবি। এই যুগে এসে যে দেশ নতুন জ্ঞান অর্জন করতে পারবে না তারা তত বেশি পিছিয়ে পড়বে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সে অনেক আগেই আক্ষেপ করে বলেছিলেন- হে ভগবান! আমাদের শিক্ষাকে জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দাও। রুশো থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সবাই শিক্ষাকে আনন্দদায়ক হওয়ার কথা বলেছেন ।নতুন শিক্ষানীতি তারই নিমিত্তে প্রণীত।তাই আমি আদম নতুন শিক্ষানীতিকে স্বাগত জানাই।
কিন্তু তাই বলে নতুন শিক্ষাক্রম সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। বাংলাদেশের সমাজ ,পরিবেশ ও মূল্যবোধ পশ্চিমের সমাজ ও মূল্যবোধ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আমাদের নীতি নির্ধারক মহল বিদেশ সফর করেন, অতঃপর সে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে এডজাস্ট করা প্রাণান্তকর চেষ্টা করেন । ভালো কথা আমরা ইউরোপ আমেরিকার মতো হতে চাই কিন্তু ইউরোপ আমেরিকার মতো হওয়ার জন্য যে লজিস্টিক সাপোর্ট দরকার সেটা কি আমাদের দেশে আছে ? আমাদের দেশের শিক্ষকরা নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করার জন্য কি যোগ্য বা তাদেরকে কি যোগ্য করে গড়ে তোলা ব্যবস্থা করা যাবে ? বলাবাহুল্য, বাংলাদেশের অধিকাংশ লোকই কোয়ালিটি কোড নয়। বিদেশীদের মত বাংলাদেশের শিক্ষকদের সমান সুযোগ সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে? কাচের ঘরে থাকলে সাধারণত অনেক কিছুকে চকচকা মনে হয় কিন্তু আমরা যারা মাঠে থাকি তারা জানি- All frills, no substance. (খালি উপর দিয়ে চকচকা ,ভিতরে খালি।)
পশ্চিমে ও ইউরোপের অনেক দেশে প্রাথমিক লেভেলে যারা শিক্ষকতা করেন তাদের কেউ কেউ পিএইচডি ডিগ্রিধারী । বেশিদিন আগের কথা নয় সম্ভবত এই মাসেরই ঘটে যাওয়া ঘটনা। আমাদের সচিব মহোদয় কোন এক সাংবাদিক কনফারেন্সে বলেছিলেন আগের এসএসসি পাস শিক্ষকরাই অনেক ক্ষেত্রে ডেডিকেটেড অর্থাৎ উনার এই উক্তিটি প্রমাণ করে যে অ আ পড়ানোর জন্য উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে আসার কোনো প্রয়োজন নেই। মহোদয়ের এমন মানসিকতা বর্তমান শিক্ষানীতির পরিপন্থী।
বলা বাহুল্য, ২০১০ সালের শিক্ষাক্রম ছিল সৃজনশীল। গত ১০ বছর যাবত এই শিক্ষাক্রম চলমান ছিল । একটা গবেষণায় দেখা গিয়েছে ১৩৫ টি দেশের সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতির মধ্যে বাংলাদেশ ১২৯তম অর্থাৎ বাংলাদেশ খুব তলানিতে রয়েছে।এর মূল কারণ বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজ সৃজনশীল বিষয়টা বুঝতে পারেনি এবং কর্তৃপক্ষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদেরকে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৩ শিক্ষানীতির সাথে শিক্ষক সমাজ কতটা অ্যাডাপ্ট করতে পারবেন তা প্রশ্নবিদ্ধ।
আমি মনে করি এই শিক্ষাক্রমে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা মূল্যায়ন পদ্ধতি। এর জন্য মূল্যায়ন পদ্ধতি যতটা না দায়ী তার চেয়ে ঢের গুণ বেশি দায়ী আমাদের শিক্ষক সমাজ তথা আমাদের দেশের দুর্নীতি। মনে রাখতে হবে - "এটা সত্য যুগ নয়, এটা হল-ফেল কড়ি ,মাখো তেলের যুগ।" যে দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত দুর্নীতির ছড়াছড়ি সেই সমাজের একটি অংশ শিক্ষক এবং সেই শিক্ষককে চেক এন্ড ব্যালেন্সের ভিতর না রেখে মূল্যায়নের সরাসরি দায়িত্ব দেওয়া বোকামি বৈ অন্য কিছু নয়।
আমি বিশ্বাস করি প্রত্যেক স্বার্থপর শিক্ষকের মাঝেও একজন নিঃস্বার্থ শিক্ষক থাকতে পারেন কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না সমুদ্রের পানি যখন নির্মল হয়, তখন নদীর পানিতে ময়লা থাকে না । আর সমুদ্রের পানি যখন নোংরা হয়ে যায়, তখন নদীর পানি নির্মল থাকতে পারে না। যে রাষ্ট্র ও সমাজে নোংরা রাজনীতির চর্চা হয় সে সমাজেরই বাসিন্দা শিক্ষক। তাহলে সে শিক্ষক কিভাবে পরিশুদ্ধ হবেন । তাইতো আমরা দেখতে পাই- some teachers are part time teacher and full time politician . একেক জন যেন Trade Union বা CBA নেতা।
তাছাড়া আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা খুবই হরিবল। আমরা দেখেছি জেএসসি , এসএসসি এইচএসসি ইত্যাদি পাবলিক পরীক্ষার ব্যবহারিক পরীক্ষাগুলোর নাম্বার কিভাবে দেওয়া হয় ।কোন নিয়ম নীতি তোয়াক্কা না করে , শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের লেভেল মূল্যায়ন না করে শিক্ষক তার পছন্দমত নাম্বার দিয়ে থাকেন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ হরহামেশাই শোনা যায় তারা পরীক্ষার কাগজ ঠিকমতো দেখেন না ,তারা পিয়ন দিয়ে কাগজ দেখান । সেখানে মূল্যায়নের মত একটা মৌখিক বিষয় শিক্ষকদের উপর চেক এন্ড ব্যালেন্স ছাড়া বর্তানো জাতির জন্য বুমেরাঙ হতে পারে।
আমাদের ২০১০ শিক্ষাক্রমের সূচনাতে ছিল আবেগময় ভালোবাসার ছড়াছড়ি কিন্তু উপসংহারে অপ্রাপ্তিতে বিচ্ছেদের ঘনঘটা। আমরা ২০২৩ শিক্ষাক্রমে এমনটা দেখতে চাই না।
একটি নিয়ন বাতি সাদৃশ আলোকিত জাতির প্রত্যাশায়...........
মোহাম্মদ মানিক হোসেন
সহকারী শিক্ষক
খলিশাটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
৮
৮ মন্তব্য