সহকারী শিক্ষক
০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০৪:০৮ অপরাহ্ণ
Bangladesh is an abode of meritorious people.
Bangladesh is an abode of meritorious people.
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন বাংলা ২য় পত্র বইয়ের প্রকৃতি ও প্রত্যয় অধ্যায়ে পড়েছি মেধা+বীন =মেধাবী।এই বিশেষণ পদটি গত কয়েকদিন ধরে মস্তিষ্কের নিউরনে নিউরনে সঞ্চারনশীল।মস্তিষ্কের এহেন আচরনে মনের যুক্তিবাদী অংশে প্রশ্ন উঠল আসলে মেধাবী কারা?
বলাবাহুল্য ৩৮ তম বিসিএস এর রেজাল্ট প্রকাশিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে একটা হিড়িক পড়ে গেলো এবং অনেকে এটাও বলেন এবং দাবি করেন দেশের সেরা মেধাবী হল বিসিএস ক্যাডাররা।
প্রথমেই অভিনন্দন জানাই যাঁরা ৩৮ তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিভিন্ন চাকুরির জন্য সুপারিশ প্রাপ্ত হয়েছেন।বিসিএস ক্যাডাররাই দেশের সেরা মেধাবী এই ধারনার সাথে একমত না হতে পারার জন্য দুঃখিত।
বাংলার প্রকৃতি যেমন পরিবর্তন হয়,বাংলার রাজনীতিতেও পরিবর্তন হয়েছে ঠিক তেমনি চিন্তাতেও পরিবর্তন হয়েছে এবং হবে।
গঙ্গা নদীর খাত চিরকাল একই খাতে বয়েনি।আগে যেখানে গৌড় ছিল বর্তমানে নদী কিন্তু সেখান থেকে ৪০ মাইল নিচে চলে এসেছে। যে যমুনা নদী সিরাজগঞ্জ দিয়ে বয়ে যেতে দেখছেন ১৭৮৭ সালের দিকে সে নদীটি ছিল ছোট্ট একটা খাল তখন বড় নদী ছিল পুরাতন ব্রহ্মপুত্র। ফারাক্কা বাঁধ ১৯৫১ সালে যেখানে দেওয়া হয়েছিল সেখান থেকে ১০ মাইল দূরে সরে গেছে।
ঠিক তেমনি আমাদের মানসজগতে এসেছে বিরাট পরিবর্তন।আজ থেকে১৫/২০ বছর আগে বিসিএস ক্যাডার ছিল একটি চাকুরী মাত্র। আর চাকুরী হল দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার একটি ক্ষনস্থায়ী অংশমাত্র। কিন্তু বর্তমানে এই ধারনাটি ইউটার্ন নিয়ে সমাজে এমন একটা হাইভ তৈরি হয়েছে যে, মনে করা হয়,
যদি তুমি হও ক্যাডার, তবে তুমি বেশ
আর যদি না হও,তবে তুমি শেষ।
তাছাড়া উদ্বৃত্ত হিসাবে পকেটে জমা হবে সেরা মেধাবীর তকমা।
But my curious mind wants to know is it true?
সমাজে এই হাইভটা তৈরি কারা করেছে? যদি আপনি এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করেন তাহলে দেখতে পাবেন আমরা শিক্ষকরা, কোচিং চক্র এবং অভিভাবকরা এর জন্য দায়ী। রাস্তার পাশের কলেজ থেকে শুরু করে ভার্সিটি পর্যন্ত এর বিস্তার হয়েছে। আমাদের সম্মানিত শিক্ষকরা ক্লাসে লেকচার দেন বিসিএস মানেই জীবন।ভালো মানুষ হওয়ার আহবান সেখানে তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজী নজরুলের ন্যায় বিপ্লবী,মুজিবের ন্যায় বজ্রকন্ঠ,ঈশ্বরচন্দ্রের ন্যায় সমাজসংস্কারক আর নেতাজি সুভাষের ন্যায় দেশপ্রেমিক হওয়ার আহবান সেখানে নস্যিমাত্র।অ অা পড়ানো প্রাইমারি মাষ্টাররাও ইদানিংকালে ক্লাসে এ নিয়ে বয়ান দিয়ে থাকেন। আর কোচিং চক্র তাঁদের ব্যবসাকে চাঙ্গা রাখার জন্য ইয়াং গ্র্যাজুয়েটদের মরিচীকা নামক স্বপ্নের পিছনে ছুটাচ্ছে যে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা ১% এর কম। যদিও আমি এটাতে আহামরি মন্দের কিছু দেখি না কারন এটা তাদের ব্যবসার পলিসি।আমাদের সম্মানিত অভিভাকরাও সন্তানকে বিসিএস ক্যাডার বানানোর জন্য বদ্ধ পরিকর সেটাতে মন্দের কিছু নেই। বাবা- মা মাত্রই সন্তানকে ভালো অবস্থানে দেখতে চান। কিন্তু সমস্যাটা হলো যখন সন্তানকে জ্ঞান করেন বিসিএস মানেই জীবন। জীবনে বড় হওয়ার অনেক পথ আছে। প্রশ্ন হলো শুধু একটি গলিতে কেন? আর কেনই বা ঐ গলিকে শ্রেষ্ঠ মনে করা হবে??? শিক্ষক আর অভিভাবকদের এমন মানসিকতা সমাজে একটা বিসিএস হাইভ তৈরি করেছে যা সমাজের অন্যান্য পেশার লোকদের জন্য অত্যান্ত লজ্জাস্কর বলে আমি মনে করি।মনে হচ্ছে উদ্ভট এক উটের পিঠে চলছে স্বদেশ।
জীবনে এই প্রথম বুঝতে পারলুম রবীন্দ্রনাথ কত বেদনা পেয়ে লিখেছেন -
"মনে হল যেন পেরিয়ে এলেম অন্তবিহীন পথ!"
অভিভাবক ও শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় এবং সমাজে সুপ্রেমেসির স্থান দখল করে নেওয়া বিসিএস ক্যাডারদের দেখে অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা রাত জেগে লাল- হলুদ- সবুজ রঙ্গে বইকে রাঙ্গিয়ে লাইলাতুল বিনির্মানে যাত্রা শুরু করে এবং একটা লুক্রেটিভ একটা জব পায়। আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে ভালো একটা সরকারি চাকুরি পাওয়া সত্যিই সৌভাগ্যের বিষয় এবং নিঃসন্দেহে একটা বড় অর্জন। সেই জন্য স্যালুউট জানাই সে সকল ফাইটারদের প্রতি।আমি বিশ্বাস করি উনারা কেতাদুরস্ত বিদ্বান এবং তাঁদের সামর্থ্য নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো এই পরীক্ষা কি একজন প্রার্থীর ইনোভেশন বা সৃজনশীলতা মুল্যায়ন করে? তাহলে একজন বিসিএস উত্তীর্ণ প্রার্থীকে সেরা মেধাবী বলা যায় কী????
লঙ্কা জয় ও সীতাকে উদ্ধার করে রামচন্দ্রজি যতটা না পরিতৃপ্তির হাসি দেয় তার চেয়ে ঢেরগুণ বেশি আকর্ণ হাসি হেসে একজন বিসিএস ক্যাডার নিজেকে যখন সেরা মেধাবী হিসাবে দাবি করে তখন স্মরন করিয়ে দিতে হয়-
ব্লেড খুব ধারালো কিন্তু গাছ কাটা যায় না
কুঠার খুব শক্তিশালী কিন্তু চুল কাটা যায় না
অর্থাৎ প্রত্যেক বস্তুই তাঁর নিজ কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।প্রত্যেকটি মানুষের রয়েছে অতুলনীয় প্রতিভা।
আমি আমার ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি অধিকাংশ বিসিএস ক্যাডার এমন কি নন- ক্যাডারদের অাত্মভরিতা। তাঁরা অধিকাংশই ( ব্যতিক্রম আছে) সুপারিয়োরিটি কমপ্লেক্সে ভুগেন। নিজেদের সেরা বলে দাবি করেন অন্যদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য ভাব দেখান। তাঁদের এহেন আচরনে আমার মনের লজিক্যাল ইউনিটে প্রশ্ন জাগে, মেধার মানদন্ডটা কী?
"রবিবাবুর ভাষায়- কলে ছাঁটা বিদ্যার ফিনিশড প্রোডাক্ট" এটাই কি মেধার মানদন্ড?
মেধার এহেন মানদন্ডে কেতাদুরস্ত বিদ্বানরা বিজ্ঞানে A+ অর্জন করেছে ঠিকই কিন্তু বিজ্ঞানমনস্ক হয় নি, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষায় A+ অর্জন করেছে ঠিকই কিন্তু নিজের মধ্যে ধর্ম আর নৈতিকতা নাই। আপনারা ও একটা সিলেবাস পড়ে পরীক্ষা দিয়ে বিসিএস ক্যাডার হন আর নিজেদের সেরা মেধাবী দাবি করেন।
কিন্তু আপনারা ভুলে যান সমাজে এমন মেধাবী লোক আছে যারা জীবনে বিসিএস ফরমটা পূরণ করেনি।তাঁদের জীবনের লক্ষ্যটায় ভিন্ন।
তারা কেউ বাবার ব্যাবসা করবে, কেউ বিদেশে স্যাটেল হবে, কেউ সুপ্রিম কোর্টের লইয়ার হবে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করবে, কেউ কর্পোরেট হাউজে জব করবে,কেউ উদ্যোক্তা হবে,কেউ ওয়াইল্ড ফটোগ্রাফার হবে,কেউ ডিফেন্সে জব করবে,কেউ বা বংশ পরম্পরাই প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হবে, কেউ বিশ্ববিখ্যাত খেলোয়ার হবে ব্লা ব্লা ব্লা
তাছাড়া বাংলাদেশের আনাচে কানাচে এমন অনেক মেধাবীরা আছে যাদের জীবনের চিত্রনাট্যে ভাগ্য বিমাতা সুলভ আচরণ করেছে। মোদ্দাকথা হলো যারা অনুকূল পরিবেশ পেয়েছে তারা তাদের জীবন তরীকে নিরাপদ অবস্থানে ভিড়িয়েছে কিন্তু যারা মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও অনুকূল পরিবেশ পায়নি তাদের কথা মাথায় রাখবেন।
নিজেদের শুধু মেধাবী ভেবে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার আগে এটা মনে রাখবেন, সমুদ্র না পাওয়া জলকনারাই মাটির খোরাক।ধোলাই খালের টোকাই ক্ষুদে ইঞ্জিনিয়ারদের দেখে আসেন নিজেকে শিশু মনে হবে।
তর্কের খাতিরে ধরেই নিলাম, আপনারা সেরা মেধাবী। কিন্তু আপনাদের এই মেধা বাংলাদেশের কোন উপকারে এসেছে। প্রশাসন, পুলিশ, বিভিন্ন মন্ত্রনালয় দুর্নীতির আখড়া হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে আর দুর্নীতির সূচকে আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। আরেকটা উপকার হয়েছে সুইস ব্যাংকে টাকার পরিমাণ বাড়ছে। লন্ডন,সিঙ্গাপুর ও নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের বাড়ির সংখ্য বাড়ছে।
মনে রাখবেন শয়তানও কিন্তু তুখোড় মেধাবী ছিল।
জোনাথন সুইফট তাঁর গালিভার'স ট্র্যাভেল বইতে লিখেছেন সৎচরিত্র লোকের অজ্ঞতার ফলে কৃত ভুলে জনস্বার্থের যত না ক্ষতি হয় তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয় সেই লোকের দ্বারা যে স্বভাবগতভাবে দুর্নীতিপরায়ণ এবং যে দুর্নীতি করে তা চাপা দিতে এবং দুর্নীতির ক্ষেত্র আরো প্রসারিত করে। তিনি দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে নৈতিকতা ও মুল্যবোধের গুরুত্ব বেশী। তাই প্রার্থনা থাকবে আপনারা মানবিক হবেন এবং নৈতিকতা ও মুল্যবোধের চর্চা করবেন তাহলেই হাঁসবো আমরা আর হাঁসবে বাংলাদেশ।
পুনশ্চঃ এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত।এই মতের সাথে আপনি দ্বিমত হতেই পারেন। ডিম আগে না মুরগি আগে এ নিয়ে তর্ক চলতেই থাকবে। তবে অনুরোধ থাকবে- pls, don't take it personally.
মোঃ মানিক হোসেন।
১
১ মন্তব্য