Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০৪:১৬ অপরাহ্ণ

ক্ষুদে ডাক্তার , প্রাথমিক বিদ্যালয়

"আমরা জাতির শক্তি-সৈন্য, মুক্তবুদ্ধি বীর

আমাদের তরে শূণ্যে আসন জাতির কান্ডারীর।"

                                                                     _ কবি তামিম হোসেন

 

আজকের শিশুরাই আগামীর স্বপ্নময় ভবিষ্যতের দিশারী এবং এ জাতির কাণ্ডারী। সত্যও সুন্দরের পূজারী হিসাবে অধিক সমাদৃত শিশুদের স্বাস্থ্য সচেতন ও মানবিক মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে "ক্ষুদে ডাক্তার" কার্যক্রম একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। যা সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ,শিক্ষকবৃন্দ ও শিক্ষার্থীবৃন্দ অত্যন্ত গুরুত্ব ও পাবন্দির সাথে পালন করে।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে ২০১১ সালে এ কার্যক্রমটি শুরু হয়। Sustainable Development Goal (SDG) -এর তৃতীয় লক্ষ্যমাত্রা " সুস্বাস্থ্য " অর্জনের প্রেক্ষিতে "ক্ষুদে ডাক্তার" কার্যক্রমটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চলমান। যা স্বাস্থ্যখাতের কর্মযজ্ঞের একটি গভীর দ্যোতনা দেয়। শিশুদের বিজ্ঞানমনস্ক ও ভবিষ্যতের ডাক্তার তথা মানবসেবার মানসিকতা উন্নয়নে ক্ষুদে ডাক্তার কার্যক্রম খুবই ফলপ্রসূ বলে মনে করেন সচেতন মহল। তাই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়-" মানবসেবার পঙ্কেই বিকশিত হচ্ছে ক্ষুদে ডাক্তারের শতদল।"

"ক্ষুদে ডাক্তার টিম"- এর কার্যক্রম সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো---

"ক্ষুদে ডাক্তার" কার্যক্রমের লক্ষ্য হল - "স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, রোগের প্রতিরোধ, সুস্বাস্থ্যে জীবন ধারনের জন্য শিশুর মাধ্যমে শিশুদের শিক্ষা ।" এবং উদ্দেশ্য হল- ১. দেশব্যাপী ক্ষুদে কার্যক্রম প্রতিষ্ঠা করা। ২. স্বাস্থ্য অধিদপ্তদরের সাথে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরসহ অন্যান্য সমমনা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে সহযোগিতার উন্নয়ন করা।

"ক্ষুদে ডাক্তার" দল গঠনের জন্য দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতি ক্লাসে তিনজন করে মোট ১৫ জন ক্ষুদে ডাক্তার নির্বাচন করতে হয়। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে চটপটে এবং বাকপটু হওয়ায় 'ক্ষুদে ডাক্তার' বানাতে তাদেরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। প্রতি শ্রেণী বা সেকশনের জন্য ৩ জনের একটি দল হিসেবে ১৫ শিক্ষার্থীর দল বিদ্যালয়ে কাজ করে। ক্ষুদে ডাক্তারদের ৩ জন মিলে একেকটি দল একজন করে গাইড শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত হয়।

ক্ষুদে ডাক্তারদের মূল দায়িত্ব (৪টি), যেমন:

১) স্বাস্থ্য বার্তা প্রদান (ফ্লীপ চার্ট থেকে নির্ধারিত শ্রেণির শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য বার্তা পড়ে শোনানো)।

২) বছরে ২ বার কৃমিনাশক ঔষধ সেবন ( এপ্রিল ও অক্টোবর মাসে কৃমি নিয়ন্ত্রন সপ্তাহে কৃমিনাশক ঔষধ সেবনে সত্রিনা অংশগ্রহণ। ৩) বছরে ২ বার শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা (জানুয়ারি ও জুলাই মাসে স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ- অজান, উচ্চতা, দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করা, গত রাউণ্ডে কৃমিনাশক সেবন ও শিশুকালে প্রতিষেধক টিকা নেয়ার তথ্য)।

তাছাড়া অন্যান্য দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে-

• বিদ্যালয়ের সকল ছাত্র-ছাত্রী স্কুল বহির্ভূত ও ঝরে পড়া ছেলে-মেয়েদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হয়ে আগাম ঘোষণা দেয়া।

• স্কুল বহির্ভূত ও ঝরে পড়া ছেলে-মেয়েদের উপস্থিতি নিশ্চিত করে তাদেরকে অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে কৃমি নাশক ঔষধ সেবন করানো।

• ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিচর্চা যেমন হাত ধোয়া, নখ কাটা, হাঁচি দেয়া, দাঁত ব্রাশ ইত্যাদির কৌশলসমূহ ব্যবহারিক প্রদর্শনীর মাধ্যমে উপস্থাপন করা। দাঁত ও মুখের স্বাস্থ্য রক্ষায় - "সকাল বিকাল মাঝব দাঁত , রোগ জীবাণু করবো কাত" - এই মূল্যবান বার্তাটি ক্ষুদে ডাক্তারদের মাধ্যমে প্রচার করা হয়।

ক্ষুদে ডাক্তার কর্তৃক শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রম প্রতিটি বিদ্যালয়ে বছরে ২ বার অর্থাৎ জানুয়ারি ও জুলাই মাসে সম্পাদিত হয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় মোট ৫টি বিষয় দেখা হয় :১. ওজন পরিমাপ

২. উচ্চতা নির্ণয় ৩. দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা ৪. গত রাউন্ডে কৃমির ঔষধ খেয়েছে কি না তার তথ্য ৫. শিশুকালে প্রতিষেধক নিয়েছে কি না তার তথ্য। স্বাস্থ্য পরীক্ষার সরঞ্জাম হিসাবে শিক্ষার্থীরা নিম্নোক্ত সরঞ্জাম পেয়ে থাকেন।

১. উচ্চতা মাপার ফিতা (স্টীকার ফেল, দর্জিদের ব্যবহার্য ফিতা অথবা দেয়ালে সঠিকভাবে অংকিত ক্ষেল)২. আই চার্ট / ই-চার্ট ( দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষার চার্ট)

৩. ওজন মাপার মেশিন

স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষকদের করণীয়ঃ

স্বাস্থ্য পরীক্ষা পূর্ববর্তীঃ

১. স্বাস্থ্য পরীক্ষার ৩টি মূল বিষয় যেমন- ওজন, উচ্চতা ও দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে জানা (গাইড লাইন)। ২. স্বাস্থ্য পরীক্ষার পূর্বে ওজন মেশিন, আই চার্ট, উচ্চতা মাপার খেল / ফিতা, স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফরম সংগ্রহ করে রাখা (গাইড লাইন)।

৩. স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফরমে ছাত্র-ছাত্রীদের নাম লিপিবদ্ধ করা (ফরম)। ৪. ক্ষুদে ডাক্তার কিভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবে সে বিষয়ে টীমের প্রত্যেককে হাতে কলমে শিক্ষা বা নির্দেশনা দেওয়া (গাইড লাইন)। ৫. স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাস্তবায়নে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও তদারকি।

ক্ষুদে ডাক্তারদের করণীয় :

১. বিদ্যালয়ের সকল ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য-স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরুর ২/৩ দিন পূর্বে প্রত্যেক টীম যার যার নির্ধারিত ক্লাশে উপস্থিত হয়ে আগাম ঘোষণা দিবে। ২. ক্ষুদে ডাক্তার টীম কিভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবে তা শিক্ষকদের নিকট থেকে শিখে অনুশীলন করবে। ৩. শ্রেণীভিত্তিক সকল ছাত্র-ছাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করবে। আর ৪. স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার পর প্রতিবেদন প্রস্তুত করণ

যেমন- শ্রেণিভিত্তিক মোট কতজন ছাত্র-ছাত্রী, কতজনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছে, অস্বাভাবিক ওজন, উচ্চতা ও দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন ছাত্র-ছাত্রীর শ্রেণিভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন ও সংখ্যা নির্ণয়।

"ক্ষুদে ডাক্তার" কার্যক্রম শিক্ষার্থী ও সমাজের উপরে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। তন্মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি ,রোগ প্রতিরোধ , স্বাস্থ্যের উন্নয়ন , পরিবারকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা ,সামাজিক কার্যাবলীতে অংশগ্রহণ , শিক্ষার্থীর নেতৃত্বের গুণাগুণ ও টিম ওয়ার্কের উৎকর্ষতা সাধন করে।

 

শিক্ষার্থী কর্তৃক শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা সেবা প্রদান শিশুমনে এক গভীর আবেগের দ্যোতনা তৈরি করে যা ছড়া হয়ে শিশুমুখে স্ফূট হয়---

Oh! Little Doctor , dear to me,

A healer of great renown is he,

With steady hand and gentle touch

He mends our bodies without a crutch.

 

আর তখন কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ মন নিয়ে ক্ষুদে ডাক্তারদের মনে ধ্বনিত হয় রবিবাবুর সেই গান -

"অলক আলোকে নীরবে দুয়ার খুলে

প্রাণের পরশ দিয়ে যাও মোর কাজে।"

 

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় লেলিনগ্রাডের রণক্ষেত্রে রুশ সৈন্যরা দেশমাতৃকার জন্য যে আবেগ ও ঐকান্তিকতা নিয়ে যুদ্ধ করেছিল তার চেয়েও ঢ়েড় গুণ বেশি আবেগ ও মানবসেবার ব্রত নিয়ে আমাদের শতদল কাজ করে যাচ্ছে বিদ্যালয়গুলোতে । এহেন কার্যক্রম বাংলাদেশকে জাতির পিতার সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলবে বলে আমি আশাবাদী।

মোঃ মানিক হোসেন

সহকারী শিক্ষক

খলিশাটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

 

 

 

                                              

মন্তব্য করুন