Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ১২:৪৮ পূর্বাহ্ণ

বিভ্রান্ত চিন্তার গুরুতর ভুল

বিভ্রান্ত চিন্তার গুরুতর ভুল

 

কালের ঘূর্ণাবর্তে সবকিছুর পালা বদল হচ্ছে। পরিবর্তন আসছে জীবনের ঢং ছন্দে। পুরনো চিন্তার জগতকে পরিমার্জন পরিবর্তন করছে নতুন চিন্তা। এভাবেই চলছে গ্রহণ বর্জনের নিরন্তর চক্র।

কয়েক দশক আগেও এটা ভাবা বাহুল্যতা ছিল মুসলিম যুবক কাফির দেশে কামলা দিতে যাবে নিজের ঈমানকে ঝুঁকিতে ফেলে। আজ মানুষের বিবেক পৃথিবীর নানা আকর্ষণীয় বস্তুর কারণে আচ্ছাদিত, খাহেশাতে নাফসানির শেকল ফাঁদে আবদ্ধ। 3'S ( Sports,Sex and Success) এর ঠেলায় যুবসমাজ কাত। ক্ষণভঙ্গুর অন্তসারশূন্য সমাজ ব্যবস্থায় টাকায় যেন সব। মানুষের মনোজগতের এই যে পরিবর্তন তা আমাদের ধর্মীয় পরিচয়কে করে প্রশ্নবিদ্ধ।

গত সপ্তাহ অন্তে এক পরম আত্মীয়ের সাথে কাকতালীয়ভাবে দেখা। তাই যথারীতি পরম স্নেহ -মমতা দরদমাখা কণ্ঠে কুশল বিনিময় আদান-প্রদান হলো। এক পর্যায়ে সেই মামার ( মামার শালা) কাছে মামাতো ভাইদের খবর জানতে চাওয়া হলে, তিনি জানিয়েছেন বড় জন বাবার ব্যবসা দেখাশুনা করছে, মেঝো জন ডিপ্লোমা কমপ্লিট করছে আর ছোট জনকে বিদেশ পাঠানোর চিন্তায় আছে কেননা সে কিছুটা পড়াশুনাবিমুখ। যখন কথার পরিপ্রেক্ষিতে উনি জানালেন ইউরোপের কোনো দেশে পাঠাতে চান তখন আমি কিছুটা হতভম্ব হলাম। যেন বালুর উত্তাপ থেকে বাঁচার জন্য আগুনে আশ্রয় নেওয়ার মতো।

আপনি ভাবছেন এটাতো স্বাভাবিক বিষয়!!!

আমার কাছেও স্বাভাবিক লাগে অনেকের বেলাতেই। আমার এক সম্বন্ধি সে থাকে ইতালিতে, আরেকজন রোমানিয়াতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত, আমার আশেপাশের অনেক লোকই রোমানিয়াতে আছে আর অনেকে যাওয়ার জন্য তোড়জোড় চালাচ্ছে। তাদের এহেন কর্মকাণ্ড আমাকে বিচলিত কমই করে কারন তারা " বাল তুখছিরুনাল হায়াতাদ দুনিয়া" এই আয়াতের উপর আমলকারী লোক।

কিন্তু আমার মামা وَالآخِرَةُ خَيرٌ وَأَبقى

অথচ আখিরাত সর্বোত্তম স্থায়ী।

এই আয়াতের উপর আমলকারী ব্যক্তিত্ব।

দাঁড়িশোভিত নূরানী চেহারার একজন হাজী মানুষ কেমন করে এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে পারে?

নিজ ছেলের ঈমানকে ধ্বংসের পথে পরিচালিত করতে পারে।

প্রত্যেক দায়িত্বশীলকে প্রভুর সামনে তার কাজের হিসাব দিতে হবে যেমন রাখাল দিনশেষে তার মালিকের কাছে কাজের হিসাব দেয়। আল্লাহ সুবহানুতায়ালা পবিত্র কোরআনে নিজকে এবং নিজ আওলাদকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। কোন একটা বইতে অথবা লেকচারে শুনেছিলাম যখন কোন সন্তানের হাশর ময়দানে জাহান্নাম ফয়সালা হবে তখন সে আল্লাহর কাছে আর্জি জানাবে এই বলে- "হে আমার রব! আপনার নাফিরমানিতে নিমজ্জিত থাকাকালীন আমার পিতা- মাতা আমাকে কোনো বাধা দেয়নি, সত্যের পথে ডাকে নি। যদি তারা আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করত তাহলে আজ আমার এই দূর্ভোগ হতো না। আজ তাদেরকে আমার সামনে এনে দেন তাদের গর্দানের উপর দিয়ে আমি হেঁটে জাহান্নামে যেতে চাই।" (নাউজুবিল্লাহ।)

সেখান কিভাবে একজন মুসলিম নিজ সন্তানকে ঈমান হারানোর পথে পরিচালিত করতে পারে। হাতে আগুনের কয়লা রাখা যতটা কঠিন, ইউরোপের দেশগুলোতে একজন ঈমানের বাতি নিভু নিভু করা অবিবাহিত ছেলের ঈমান ধরে তার চেয়ে বেশি কঠিন।

মুলত আমরা ইসলাম বুঝিনি। আমরা ইসলাম বলতে কতগুলো রিচুয়ালকে বুঝেছি। স্বলাত, সদাকা,যাকাত, হজ্জ, কিছু নেক আমল এর মধ্যেই ইসলামকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। কিন্তু আসলে ইসলাম হলো____

Complete code of life.

Islam in our deeds &actions.

আসুন, এবার সমাজের দিকে তাকাই। সেখানে কি এর চেয়ে ভালো কোনো উদাহরণ আছে?

না, সেখানেও এমন চিত্র অহরহ খুঁজে পাওয়া যায়। বাবা- মা নামাজী, হাজী নেক আমলকারী কিন্তু তারা তাদের সন্তানদের ইউরোপের দেশগুলোতে স্যাটেল হওয়াকে গর্বের মনে করে। ষোলআনা ঈমান আনলাম বলা লোকটি দুনিয়ার ধোঁকায় পড়ে অবশেষে চার আনা ঈমান প্রদর্শন করে। ২৫ টাকার ঈমান দিয়ে কি আল্লাহর জান্নাত পাওয়া যায়,ওহে বনী আদম!!!

আমাদের দ্বীনদারী অনেকটা বাজারে ম্যাংগো কিংবা ওরেঞ্জ জুস- এর মত যেখানে আম কিংবা কমলার ছিটেফোঁটাও নেই আছে শুধু একটু ম্যাঙ্গো ফ্লেভার বা অরেঞ্জ ফ্লেভার।

মাসখানেক আগের কথা আমাদের এক স্যারের মেয়েকে দেখলাম মাইজদী শহরে পার্লার থেকে সেজে রিকশায় চড়ে মানুষের হুশ ফিরাচ্ছে আর আমার স্যার জামাতের প্রথম কাতারে থেকে সিজদা দিতে দিতে কপাল দাগ করে ফেলছে।

এবার বলুনতো উনি ইসলাম সম্পর্কে কি বুঝছে?

কুকুর যখন ঘাস খায় তখন বুঝতে হবে ওর পেটে অসুখ হয়েছে; অনুরুপভাবে একজন আমলী মানুষ যখন টুপি পাগড়ি জুব্বা পড়ে ঘুষ খায়, সুদ খায়, হারাম খায় তখন বুঝতে হবে ওর ঈমান নষ্ট হয়ে গেছে।

দুনিয়ামুখী মানুষগুলোকে শয়তান ওয়াসওয়াসা দেয় এই বলে___

আরো চাই, এই নাও ---

কত চাও, যত চাও দিবো আরো,

দেখতে চাই কতটা তুমি নিতে পারো।

আল্লাহর জন্য কিছু করা সহজ কিন্তু ছাড়া কঠিন। আপনি যখন আল্লাহকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসবেন তখন দুনিয়ার অনেক মোহ আপনাকে হাতছানি দেওয়া স্বত্ত্বেও তা আপনি ছেড়ে দিবেন। এটাই ঈমানের পরীক্ষা। কেন আমরা ভুলে যাই একদিন গরম পানি আর বড়ই পাতা পৃথিবীর সব মায়া ধুয়ে দিবে।

আসুন কুরআন হাদীস কি বলে সেটা দেখি


সৌদি আরবের সাবেক গ্রান্ড মুফতি, সামাহাতুশ শাইখ, আল-‘আল্লামাহ্, ইমাম আব্দুলআযীয বিনআব্দিল্লাহ বিন বায (رحمه الله)-কে বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,

অমুসলিম দেশগুলিতে ভ্রমণ করা একটি ঝুঁকি যা একান্ত প্রয়োজন ব্যতীত মুসলিমদের এড়িয়ে চলতে হবে।

রাসুলুল্লাহ বলেছেন,

আমি সমস্ত মুসলিমদের দায়ভার বহন করবো না যারা মুশরিকদের মাঝে থাকে।

[আবু দাউদ: ২৬৪৫, তিরমিযী: ১৬০৪; সনদ: সহিহ (তাহকিক: আলবানি)]

সাধারণভাবে জীবিকার জন্য অমুসলিম রাষ্ট্রে যাওয়া উচিৎ নয়। কেননা এতে তাদের দ্বারা দ্বীন প্রভাবিত তে পারে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘মুশরিকদের সাথে যে সকল মুসলমান বসবাস করে আমি তাদের দায়িত্ব তে মুক্ত...’ (আবুদাঊদ হা/২৬৪৫; মিশকাত হা/৩৫৪৭; ছহীহাহ হা/৬৩৬)

তিনি বলেন, ‘মুশরিকদের সাথে তোমরা একত্রে বসবাস কর না, তাদের সংসর্গেও যেয়ো না। যে মানুষ তাদের সাথে বসবাস করবে অথবা তাদের সংসর্গে থাকবে সে তাদের অনুরূপ বলে বিবেচিত হবে’ (তিরমিযী হা/১৬০৫; ছহীহাহ হা/২৩৩০, সনদ হাসান)

তবে বাধ্যগত কারণে তাদের মাঝে বসবাস করতে লে নিজ ধর্মের বিধি-বিধান মেনে চলবে এবং সুযোগমত তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিবে’ (নাহল ১৬/১২৫, মুমতাহিনাহ ৬০/; ইবনু হাজার আসক্বালানী, ফাৎহুল বারী /৪০৩; শায়খ বিন বায, মাজমূফাতাওয়া /৪৩)

এছাড়া মূলতঃ তিনটি শর্ত সাপেক্ষে কোন মুসলিম অমুসলিম রাষ্ট্রে যেতে পারে।

() হক-বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী জ্ঞান থাকা।

() প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার মত ঈমানী মযবুতী থাকা।

() এমন অভাবী হওয়া যে, জীবিকার বিকল্প পথ না থাকা (উছায়মীন, মাজমূফাতাওয়া /২৪)

আমার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মানুষকে ভুল সম্পর্কে সজাগ করে দেয়া। যাতে করে ভবিষ্যতে সে ভুলটার পুনরাবৃত্তি না করে আরেকজনের উপরে বিজয় আমার উদ্দেশ্য নয়। কেননা আমাদের মধ্যে কেউ বক্সিং রিংয়ের প্রতিযোগিতারত নয়। আল ওয়ালা ওয়াল বারাহ অর্থাৎ আল্লাহর জন্য ভালোবাসা, আল্লাহর জন্য ঘৃণা।

তাই আসুন, নতুন মাত্রার জীবন উদ্দেশ্য এবং জীবনবোধের মোড়কে উন্মোচিত হই। জীবন নিয়ে ইদুর দৌড় খেলা থেকে আমরা দৃষ্টি সরিয়ে আল্লাহর রেজামন্দ হাসিলে প্রানন্তকর প্রচেষ্টায় ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ হই।

মানুষ কত রকম যে ভালোবাসে _

কারো ভালোবাসা আবেগের।

আবেগ ফুরলেই ঠুস!

কারো ভালোবাসা পরিণত।

 

হে আমাদের রব! আপনাকে পরিণত ভালোবাসতে পারার তৌফিক দান করুন। আমিন।

 

মোহাম্মদ মানিক হোসেন

৩০//২০২৪

 

মন্তব্য করুন