সহকারী শিক্ষক
০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০৬:০৩ পূর্বাহ্ণ
THE _VICE & VIRTUE _ OF_ EYES ( চোখের দোষ ও গুণ )
THE _VICE & VIRTUE _ OF_ EYES ( চোখের দোষ ও গুণ )
"আইন ব্লিক জাগ্ট মেয়ার আলস থাউজেন্ট ভরটে।"
জার্মান ভাষার এ কথাটির মানে হলো -- "এক পলক হাজারো শব্দের চেয়ে বেশি কথা বলে।"
পুরনো এই প্রবাদ বাক্যটির সাথে আমরা সবাই কমবেশি একমত।@@@
বুঝতেই পারছেন--- আজ আমি চোখের বয়ান দিবো।
চোখ মানুষের দেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।আল্লাহর দেওয়া একটি নেয়ামত। চোখ প্রাণীর আলোক সংবেদনশীল অঙ্গ ও দর্শনেন্দ্রিয়।পৃথিবীর আলো, রং, রুপ আমাদের সামনে মূর্ত হয়ে ধরা দেয়ার জন্য যে অঙ্গটি সবচেয়ে জরুরি সেটা হলো চোখ।
আসুন, এবার চোখের গঠন সম্পর্কে একটু ধারনা নিই। কর্নিয়া, রেটিনা, অপটিক নার্ভ, আইরিস, অ্যাকুয়াস হিউমার, ভিট্রিয়াস হিউমার ইত্যাদি অংশ নিয়ে চোখ গঠিত।মানুষের চোখের গঠন প্রকৃতি জটিল এবং মানুষের চোখ দুটি একই তলে অবস্থিত, তাই মানুষ তার চোখ দিয়ে একমাত্রিক দৃশ্য গঠন করতে পারে।(একটা তথ্য দিয়ে রাখি গরু কিন্তু তার চোখ দিয়ে দ্বিমাত্রিক ছবি গঠন করে।)
মানুষের চোখের আকৃতি ও প্রকৃতি ভিন্ন রকম হয়।চোখের প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে একজন মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও বলা যায়।যাইহোক আজকে এই আলোচনায় না-ই গেলাম।
চোখকে কেউ কেউ আঁখি,নেত্র,লোচন,অক্ষি,নয়ন ইত্যাদি নামেও অভিহিত করে থাকেন। তবে যে নামেই ডাকি না কেন এটা তো সত্যি চোখের রয়েছে অসাধারণ একটি charismatic power বা ঘায়েল করার মত একটা ক্ষমতা আছে।
"চোখ হল বিধাতার লেখা এক কাব্য।"
এই অনুভূতিটি প্রথম আসে ছোটবেলা যখন মায়ের সাথে নানার বাড়ীতে ( মামার শ্বশুর বাড়ী) প্রতি শুক্রবার বিটিভিতে দল বেধে সবাই ছবি দেখতাম। আজো একটা দৃশ্য জীবনের চিত্রপটে ভাস্বর।
নায়ক রুবেলের চোখ যখন নায়িকার চোখে পড়ল, তখন দুজনার মনের ভিতরে কী যে অনুভুতি তৈরি হল সেটা বুঝে উঠার আগেই চোখের সামনে ভেসে উঠল একটি ফুলের বাগান।আর সে বাগানের মাঝখানে দাড়িয়ে নায়ক কোমর দোলাচ্ছে আর নায়িকা দুইহাত প্রসারিত করে ছুটে আসছে নায়কের বুকে। বলা বাহুল্য, বয়স কম থাকায় তখনও ভালো করে বুঝতাম না কেমনে কী হয়!!!!
তবে আমার ঈমান পরিপক্ক হলো যখন আমি ক্লাস টেন-এ পড়ি। চোখের যে অসাধারন ক্ষমতা সেদিন আমি পরিলক্ষিত করলাম, তা আজও আমার স্মৃতিতে অম্লান।
নায়ক মেহেদীর চোখ হঠাৎ করে নায়িকা পলির চোখে পড়ল আর মুহুর্তে বানর নাচ শুরু।
আহা! কী সুন্দর সংগীত ভেসে আসে মহাসিন্ধুর ওপার থেকে.........
আমরা মানুষেরা নিজেই নিজেদের বড় তোষামোদকারী। Francis Bacon তাঁর
" Of Love" বইটিতে বলেছেন_ প্রেমিক হল সকল তোষামোদকারীর মধ্যে সেরা তোষামোদকারী। প্রেমিক তার প্রেয়সীর মন পাওয়ার জন্য প্রেয়সীর রুপের এত প্রশংসা করে যা সকল তোষামোদকারীকে হার মানায়। আর সেই কারনে হয়ত বাংলা সাহিত্যে চোখের উপমার এত ছড়াছড়ি।
টানাটানা চোখ, হরিনের মতো চোখ, সাগরভাসা চোখ, কাজলকালো চোখ, পটলচেরা চোখ, বিড়াল চোখা, শৃগালের চোখ, লক্ষীটেরা ..................
চোখের কারনে হয় কেউ সুনয়না,সুদর্শনা কেউবা প্রিয় দর্শিনী। তবে সুনয়না হওয়ার চেয়ে সুমনা হওয়ায় শ্রেয়।
এই চোখের স্তুতি করে অনেক কবি, সাহিত্যিক লিখেছেন অনেক বিখ্যাত কবিতা। প্রেমিকদের কথা বাদই দিলাম। Because Bangladesh is the land of lovers.
জীবনানন্দ দাসের সেই বিখ্যাত পঙক্তি ____
"পাখির বাসার মতো দুটি চোখ তোমার
ঠিক যেন নাটোরের বনলতা সেন।"
জনৈক প্রেমিকের স্তুতি----
" তোমার চোখের ঐ ব্ল্যাকহোলে
আমার ঘড়ির কাঁটা আটকে যায়।"
যাই হোক শুরু করছিলাম যেখান থেকে সেখানে ফিরে গিয়ে শেষ করি। প্রাচ্য হোক বা পাশ্চাত্য সাহিত্যে চোখের উপমার প্রয়োগ বারবার ঘুরে ফিরে আসবেই নব নতুন হয়েই........
আচ্ছা, চোখ যদি কথা বলতো,
কেমন হতো?
আমিতো মনে করি বিচ্ছিরি একটা কাজ হতো।
চোখ এতটা বেআড়া, এতটা অবাধ্য
শুধু সুন্দরের দিকে তাকিয়ে থাকতে চায়।গানের সুরে শুনিয়ে দেয়-----
"তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়,
সে কি মোর অপরাধ?"
চোখ যদি কথা বলতে পারতো, তাহলে আমাদের জীবনের এমন সব গোপন নথিপত্র ফাঁস করে দিতো যা পানামা পেপার কেলেংকারীর চেয়ে ভয়ংকর হতো।
ভাগ্যিস! কথা বলতে জানে না।
চোখ নিয়ে আমার জীবনের কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করার বাসনা থেকেই লিখতে বসা।তবে মনের ডালপালা এত বেশি গজায়....কক্ষপথ চ্যুত হয়ে যায় মাঝেমধ্যে।তার বড় প্রমান উপরের হ-য-ব-র-ল লেখাগুলো।
২০০৮ সাল। একটা কোম্পানীতে চাকুরীর সুবাধে পোস্টিং হল রাজশাহীতে। সে দিনগুলোতে আমার প্রথম চোখে সমস্যা দেখা দেয়। তীব্র মাথা ব্যাথা ও চোখ ব্যাথা।চোখের পাতা মেলতে পারতাম না।ঘুমালেও ব্যাথা কমতো না। তাই রাজশাহী মেডিকেল কলেজের বহির্বিভাগে ১০ টাকা দিয়ে টিকেট কিনলাম।ভিতরে যাওয়ার পর ডাক্তার সাহেব হিসটরি শুনলেন অতঃপর এই সিদ্বান্তে উপনীত হলেন এটা মাইগ্রিন প্রবলেম এবং জেনেটিক যেহেতু আমার বাবার ও মাথা ব্যাথা ছিল। অতঃপর বললাম আমার চোখে সমস্যা আছে কিনা একটু পরীক্ষা করুন। আমি চশমা ব্যবহার করতে চাই। তখন আমাকে পাশের রুমে পাঠানো হলো আর ১০০ টাকা ফী নিলো। ডাক্তার সাহেব আমাকে একটি লেটার চার্ট দেখিয়ে বললেন--- বর্ণগুলো পড়তে, আমি গড় গড় করে সব বলে ফেললাম।যদিও বর্ণগুলো কোনটি বড়,কোনটি ছোট,কোনটি মাঝারি ছিল।তখন ডাক্তার সাহেব জানালেন, আমার চোখে কোনো সমস্যা নেই। কিছু মেডিসিন প্রেসক্রাইব করে বিদায় দিলো। আবার যখন খুলনায় ট্রান্সফার হয়ে আসলাম তখনও একই সমস্যা নিয়ে ইসলামিয়া হাসপাতালের ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। তখন ও ডাক্তারের একই উত্তর, আপনার চোখে কোনো সমস্যা নাই।
সত্যি কি তাই!!!!
আমার চোখ কী সত্যিই সুস্থ?
না!
আমার চোখ সুস্থ নয়। আমার চোখ অসুস্থ।
এই অসুস্থতা হয়ত কোনো ডিগ্রীপ্রাপ্ত ডাক্তার কিংবা যন্ত্রপাতি সনাক্ত করতে পারবে না কারন এ অসুখের কেন্দ্রস্থল চোখের কর্ণিয়া নয়, আমার বক্ষস্থিত অন্তর।
অনেক আদম বলে থাকেন, যারা চোখে দেখে না; তাদের মতো অভাজন পৃথিবীতে আর কেউ হতে পারে না।
এই বিশ্বাস আমার ভিতরে বাসা বাধতে পারে নাই। কারন আমি বিশ্বাস করি চর্মচক্ষুর চেয়ে অন্তরচক্ষু অনেক বেশি ক্রিয়াশীল ও মুল্যবান।
চর্মচক্ষু দিয়ে পৃথিবীর বাহিরের রুপ দেখা যায় আর অন্তরচক্ষু দিয়ে পৃথিবীর বাহির ও ভিতরের রুপ অনুভব করা যায় আর প্রশান্তি লাভ করা যায়।যার চর্মচক্ষু সচল কিন্তু অন্তরচক্ষু বন্ধ তিনি কখনো চোখের প্রশান্তি লাভ করতে পারেন না।তাই আমি মনে করি, একজন অন্ধ কিন্তু কার্যকর অন্তরচক্ষু সমৃদ্ধ লোক চর্মচক্ষুওয়ালা লোকের তুলনায় অধিক সৌভাগ্যবান।
আমরা আমাদের বাস্তবজীবনে আনন্দ,সুখ,শান্তি,প্রশান্তি এই টার্মগুলো ব্যবহার করে থাকি। এই টার্মগুলোর আলাদা আলাদা সংজ্ঞা রয়েছে। আসুন প্রশান্তির সংজ্ঞাটি একটু জানি।প্রশান্তি একটি আত্নিক উপলব্ধি। তা ব্যাক্তির আত্মজ্ঞান থেকে উদ্ভুত হয়। প্রশান্ত হৃদয় মৃত্যুকে ভয় পায় না।
আর চোখের প্রশান্তি সে তো অন্তরচক্ষুর সচলতার ফসল.....
আসুন আরেকটি ঘটনা শুনি
২০১৫ সাল। মাইজদী টির্চারস ট্রেনিং সেন্টার থেকে B.Ed প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলাম। বলা বাহুল্য , তখন আমি প্রাইমারীর একজন শিক্ষক। প্রশিক্ষণের সুবাধে আলাপ হলো বিএড করতে আসা আরেকজন শিক্ষকের সাথে। উনি মাইজদীতে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।( নাম ও বিদ্যালয়ের নাম বলা শোভন মনে করছি না।) প্রায় সময় উনার সাথে আমার কথা হতো। উনি ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষার শিক্ষক ছিলেন। সব সময় ধর্মীয় পোশাক পড়ত। মুখে হালকা দাড়ি ছিল, যাকে আমরা ছাগইল্লা দাড়ি বলি। প্রায় সময় উনার সাথে হেঁটে হেঁটে কলেজ থেকে টাউন হল আসতাম। অনেকদিন ধরে একটা বিষয় লক্ষ করছি," উনার দৃষ্টিসীমার ভিতরে কোনো মেয়ে বা মহিলা আসলে, উনি এক নাগাড়ে তাকিয়ে থাকতেন। বিষয়টা আরো বেশি খারাপ লাগতো যখন দেখতাম উনি পিছনে তাকিয়েও মহিলাদেরকে দেখতে চাইতেন। মহিলা উনাকে ক্রস করে চলে গেলেও উনি ঘাড় ফিরিয়ে দেখতেন। একদিন আমি উনাকে মুখের উপর লজ্জা দিলাম।
বললাম, আপনার এই স্বভাবটা খুবই খারাপ।
তখন তিনি হাসি দিয়ে বললেন--- মানিক ভাই! কি যে বলেন।
উনার পরের কথাগুলো শোনার পর আরেকটু হতভম্ব হলাম।
উনি বললেন-- আমি একটা মসজিদে ইমামতি করি। উনি কামেল পাশ এবং ঢাকায় ইসলামি ফাউন্ডেশন থেকে একটা প্রশিক্ষন নিলো। কথাগুলো শোনার পর অন্তরে একটা কথায় বাজতে লাগলো.....
""চিত্তকে শাসনে আনা বড় ভয়ানক কথা""
যদি প্রশ্ন করি আপনাকে, ভদ্রলোকের চোখ কী সুস্থ?
অবশ্যই, না।
এবার প্রশ্ন করুন নিজেকে---------
আপনার চোখ কি সুস্থ?
আমার চোখ কিন্তু অসুস্থ।
জগতে প্রতারণার সবচেয়ে বিশ্বস্ত অঙ্গই সম্ভবত চোখ।চোখে দেখতে না পাওয়াটা একটা সমস্যা বটে তবে খুব গুরুতর সমস্যা নয়। যে চোখ নিষিদ্ধ আবেগ আর কামনার বলি হয়, যে চোখ পাপে নিমজ্জিত থাকে, যে চোখ রঙিন দুনিয়ায় বিচরণ করে, সে চোখ না থাকা-ই শ্রেয়।
হুমায়ুন আহমেদের একটা বইতে পড়েছিলাম_____
""সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে কেউ মিথ্যা বলতে পারে না।মিথ্যা বলতে হয় অন্যদিকে তাকিয়ে।""
কিন্তু আজ আমরা এলিয়েনরা কী করতেছি?
চোখে চোখ রেখে ডাহা মিথ্যা কথা বলতেছি, চোখের দৃষ্টি দিয়ে সুদ আর ঘুষের টাকা গুনে গুনে পকেট ভর্তি করতেছি, চোখ দিয়ে পরের স্ত্রীর দেহের দৈর্ঘ্য মাপছি, চোখ দিয়ে নীল দুনিয়ায় ব্রাউজিং করছি।
ক্রাশ! ক্রাশ! ক্রাশ খাচ্ছি.....
আর আমরা মনে করছি আমাদের চোখ ভালো আছে। কেবল দেখতে পাওয়া চোখের সুস্থতা নয়।
চোখের সুস্থতা নির্ভর করে আপনার অন্তরচক্ষুর পরিপক্কতার উপর। আর অন্তরচক্ষুর পরিপক্কতা নির্ভর করে আপনার নৈতিকতার উপর,হালাল ও বৈধতার উপর। স্ত্রীর দিকে তাকালে আপনার চোখের প্রশান্তি আসবে এবং আমলনামায় সওয়াব আসবে। আর ক্রাশের দিকে তাকাইলে অন্তর কুলষিত হবে।
পরিশেষে একটা কথা বলতে চাই______
চোখকে বিশ্বাস করুন,ভরসা নয়।
আমি আমার চোখের অসুস্থতার জন্য অনুতপ্ত।আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।
হে আল্লাহ! আমার চোখের প্রশান্তি দান করুন।
মোঃ মানিক হোসেন
সহকারী শিক্ষক
খলিশাটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
৭
৭ মন্তব্য