সহকারী শিক্ষক
০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০৬:০৯ পূর্বাহ্ণ
ভালোবাসায় গনতন্ত্র নাকি একনায়কতন্ত্র
ভালোবাসায় গনতন্ত্র নাকি একনায়কতন্ত্র
আমার শয়নকক্ষের এক কোণায় আছে চারপা বিশিষ্ট একটি ছোট্ট পড়ার টেবিল, যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে আমার কিছু বই, ডায়েরি এবং কাগজ কলম। বলতে পারেন নিতান্তই ভালোবাসার জিনিস।
চেয়ারে বসি আছি আর ভাবছি কতদিন হয়ে গেল কিছুই লিখছি না ; যদিও এইতো কয়েকদিন আগের কথা লিখেছিলাম কয়েকপাতা। কিন্তু মনে হচ্ছে কয়েকমাস পার হয়ে গেল..... তবে কেন এমন মনে হয়????
সময় সে তো একটি নির্দিষ্ট গতিতে চলছে; তাহলে কেন আমাদের এমন মনে হয়?
প্রিয়জনের অপেক্ষায় যখন আমরা থাকি তখন মনে হয় সময় কচ্ছপের পিঠে ভর করে চলছে আর প্রিয়জনের সান্নিধ্যের মহুর্তটুকুতে মনে হয় সময় হামিংবার্ডের পাখায় চড়ে ছুটছে।এর বৈজ্ঞানিক কারনটা যদিও আমার ও জানা নেই, তবে যতটুকু বুঝতে পারি তা হলো --- Passion। প্রিয়জনদের প্রতি ভালোলাগার অনুভূতি আমাদের অবচেতন মনকে এমনভাবে আড়ষ্ট করে রাখে যার কারনে এমন মনে হয়।
টেবিলের গা ঘেষে বামে একটি বক্স খাট। যেখানে শুয়ে শুয়ে মোবাইলের গ্যালারির বিভিন্ন ছবি দেখে স্মৃতিরোমন্থন করছেন আর মুচকি হাসছেন আমারিই প্রিয় সহধর্মিণী
হঠাৎ করেই কল্পনার জগতে ডুব দিলাম আর ভাবতে লাগলাম যদি আমি সুলতান সুলেমান হতাম। তবে কেমন হতো? তাহলেতো হুররাম সুলতানা, মাহী সুলতানার মতো সুন্দরী বউ থাকতো আমার। শেখর কুটিরে থাকত ইউরোপের প্রিন্সেস আর থাকত হেরামে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সুন্দরী ললনা। মনে মনে ভাবছি আর মজা পাচ্ছি।
কিন্তু না, এই সুখ সইল না পোড়াকপালে।
একটা শব্দ সেই সুখের মহুর্তের ছেদ ঘটালো। তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে হাজার লক্ষ কি.মি দূর-দূরান্ত পাড়ি দিয়ে যে মন স্বপ্নে বিভোর; সে মন হতচকিত হয়ে আলোর গতিতে ছুটছে সাড়া দিতে সে অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দের।
বাস্তবজগতে মন মহাশয় উপস্থিত হয়ে তাঁর উপস্থিতি জানান দিল,,,,,,হু
প্রিয়মুখ, ভালোবাসার লাল গোলাপ, আমার পানে তাকিয়ে দুর্ভেদ্য এক হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, " আন্নে কইতে হাইরবেন্নি, আঁই কিয়ার লাই আঁসিয়ের? "
আমি বললাম,"হুম, পারবো।"
তাহলে বলেন----
"তোমার মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোন নিঃসৃত হচ্ছে এখন তাই হাসতেছ।"
"বুঝলাম না। কি কন?"
চটুল যুবক -- " আমরা যখন হাসি তখন আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোন নিঃসৃত হয়, তাই বললাম আরকী।"
হারেমবাসিনী--- ও, আচ্ছা, বুঝছি।
এখন বলেন আমি কি নিয়া হাসছি?
উত্তরটা যেহেতু আমার জানা ছিল না তাই আমার অবস্থাটা হলো......পাতাহীন সিন্দুল গাছটির মতো
হঠাৎ মনে হলো যদি মনের ক্ষেত্রে ও সিমুলেশন বা অনুক্রিয়া বিষয়টি কাজে লাগিয়ে আগে ভাগেই সবকিছু বলে দেওয়া যেতো ; কতই না ভালো হতো।
যারা ইন্জিনিয়ারিং এর ছাত্র তারা এ ব্যাপারটি ভালো বুঝে কারন তারা এ বিষয়টি নিয়ে পড়ে। সিমুলেশন বা অনুক্রিয়া বিষয়টি কাজে লাগিয়ে হিসাব নিকাশ করে অনেক কিছুই নাকি বলে দেওয়া যায়। এই ধরুন, কোনো একটি বিল্ডিং বানানোর আগেই সিমুলেশন বিষয়টি ব্যবহার করে বলে দেওয়া যাবে বিল্ডিংটি কত বছর টিকবে, কতটুকু ভার বহন করতে পারবে ইত্যাদি ইত্যাদি। যদি মনের ক্ষেত্রে এরকম সিমুলেশন ক্রিয়াটি প্রয়োগ করা যেত,তাহলেতো আজ আমাকে পাতাহীন সিন্দুল গাছটির মতো অসহায় হতে হতো না।
এখনতো এই প্রশ্নের উত্তর এতটাই দুর্ভেদ্য, যতটা না মোনালিসা ছবিটির অর্থ বোঝা।
তাই না পারার গ্লানি নিয়ে বললাম, তুমি বলো?
হারেমবাসিনী --" আপনার আর আমার বিয়ের দিনের ভিডিও দেখতেছি আর আপনার একটা পোজ দেখে হাসতেছি।"
এ কথা শোনার পর মনে হলো কেউ একজন পিছন দিক থেকে মাথায় ' পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী ধাতু ওসনিয়াম দিয়ে তৈরি' একটি হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করল। মানসিক এই পীড়াটা শুধু এই জন্য যে, আমার স্ত্রী আমাকে নিয়ে স্বপ্ন বুনছে আর ভালোবাসার সাম্রাজ্য বিনির্মান করছে ;সেখানে আমি সুলতান সুলেমানের মতো ভালোবাসায় গনতন্ত্র খুঁজছি।
কিছুক্ষণ নির্মোহভাবে চিন্তা করে দেখলাম,
"সত্যিই কি ভালোবাসায় গনতন্ত্র ভালো নাকি একনায়কতন্ত্র ভালো? "
আমার মতে ভালোবাসায় একনায়কতন্ত্রই ভালো। একনায়কতন্ত্র বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে ভালোবাসার মানুষকে নিজের করে রাখা, অন্যের সাথে ভাগ করতে আপত্তি করা বলতে পারেন সব সময় নিজের জন্য রিজার্ভ রাখা, এককথায় possessive হওয়া। অনেকে বলেন- ভালোবাসা রং বদলায়।
আমিও তা বিশ্বাস করি। ভালোবাসা হল পারদ থার্মোমিটারের ভিতরের পারদের মতো।যেটা উঠা-নামা করে তার পারিপার্শ্বিক আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে। ঠিক তেমনী আমাদের প্রিয়জনদের প্রতি ও আমাদের ভালোবাসা উঠানামা করে। তার আচার- ব্যবহার, যত্ন,আদর তথা তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উপর। অর্থাৎ ভালোবাসা কখনো সরলরেখায় চলে না, এর ups & down হয়।অর্থাৎ ভালোবাসা রং বদলায়।
অনেকে রেফারেন্স দিতে গিয়ে হুমায়ুন ফরিদী ও সুর্বণা মোস্তফা, হুমায়ন আহমেদ ও গুলতেকিন, জীবনানন্দ দাশ ও লাবণ্য এবং তাহসিন ও মিথিলার কথা বলে থাকেন। কিন্তু আমার কাছে আজিব লাগে যখন দেখি অনেকে ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে এদেরকে রেফারেন্স দেয়।নিষ্প্রাণ বাতাসে ঘুষি বাগিয়ে বীরত্বের আস্ফালন করা যতটা হাস্যকর, তারচেয়েও বেশি হাস্যকর এদের show off কে জাতির সামনে ভালোবাসার মডেল হিসাবে তুলে আনাকে।৷
একবার হুমায়ন ফরিদী ও সুবর্ণা মোস্তফার মধ্যে প্রবল ঝগড়া হলো। সুবর্ণা রুম ছেড়ে অন্য কক্ষে চলে গেলেন। আর সারারাত ফরিদী দেয়ালে লিখলেন - সুবর্ণা, আমি তোমায় ভালোবাসি? তারপরও তাদের বিচ্ছেদ হলো ২০০৮ সালে। কারন ভালোবাসা রং বদলায়।
এই যুক্তিটা আমি কেন যেন মেনে নিতে পারি না। আমি মনে করি, সত্যিকার ভালোবাসায় কেউ কাউকে ছেড়ে যেতে পারে না। প্রত্যেক দম্পতির জীবনে এরকম অনেক রোমান্টিক ঘটনা আছে যেটা আমরা অনেকেই জানি
না। তাই হুমায়ন - সুর্বণার এই একটা রোমান্টিক ঘটনা প্রমাণ করে না যে তাদের ভালোবসা সত্যিকার ভালোবাসা। তাই ভালোবাসাকে blame দেওয়ার কোনো যুক্তিকতা নেই।
আয়নার সামনে দাড়িয়ে আপনি হাসলে আয়না আপনার হাসিমাখা মুখখানা দেখাবে আবার সেই আয়নায় আপনার বিভৎস চেহারা দেখতে পাবেন যদি আপনি বিভৎস রুপ দেখতে চান। তার মানে আয়নার দোষ না। আপনি যে ছবি দেখতে চাইবেন সেই ছবি আয়না দেখাবে। দোষটা আয়নার নয়, দোষটা মানুষের।
সত্যিকার ভালোবাসায় রাগ, অভিমান হবে। ভালোবাসা তলানীতে গিয়ে ঠেকবে কিন্তু সময়ের ব্যবধানে reshuffle করার মাধ্যমে সেটা আবার প্রাণ ফিরে পাবে। যেটা আমরা আমাদের মা- বাবা, দাদা- দাদী, আত্নীয় স্বজনদের পরিবার দেখেই শিখেছি। সুবর্ণা- ফরিদী, তাহসিন- মিথিলা, এদের থেকে ভালোবাসা শেখার কোনো মানে হয় না, এরা কারো আদর্শ হতে পারে না। যারা ভালোবাসার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে এদের রেফারেন্স টানেন আসলে তারা আমাদের যুবক সম্প্রদায়কে live together এর দিকে ধাবিত করছেন। আসলে তারা ভালোবাসায় গণতন্ত্র খুঁজছিল তাই এই জুটিগুলো বিচ্ছেদ করেছিল।
ভালোবাসার আদর্শ বা মডেল তো " রিফাত" এর মতো পুরুষরাই হতে পারে যারা নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও গর্ববতী স্ত্রীকে ছেড়ে যায়নি।
ইংরেজিতে একটি কথা আছে- The real heroes are those whom the earth does not know.
সত্যিকার ভালোবাসায় সব সময় মনে হবে--
হায়, জীবন এত ছোট কেনে?
এ ভুবনে?
ভালোবেসে মিটল না আশ-
কুলাল না এ জীবনে।
সকল দম্পতির জীবনের প্রতিটি মহুর্ত হোক অনুপম রায় কিংবা জেমসের গানের লিরিকের মতো অনিন্দ্য সুন্দর। প্রতিটি সম্পর্ক টিকে থাকুক বছরের পর বছর " ঠোঁটের কোণে হাসি হয়ে।"
পরিশেষে এটাই বলতে চাই, ভালোবাসায় একনায়কতন্ত্রের জয় হোক।
মোঃ মানিক হোসেন
সহকারী শিক্ষক।
খলিশাটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
১৪
২৪ মন্তব্য