Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০৭:০৯ পূর্বাহ্ণ

ছেলেরা_ঘুমিয়ে_আছে_এই_মাটিতে_কীভাবে_জুতা_পায়ে_হাঁটি’ #বীরাঙ্গনা #রমা_চৌধুরী

#ছেলেরা_ঘুমিয়ে_আছে_এই_মাটিতে_কীভাবে_জুতা_পায়ে_হাঁটি’

   

#বীরাঙ্গনা #রমা_চৌধুরী


জন্ম - ১৪ই অক্টোবর, ১৯৪১

মৃত্যু- ৩রা সেপ্টেম্বর, ২০১৮


আজ প্রয়াণ দিবসে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই।

?????????????


‘একাত্তরের জননী’ বইয়ের মুখবন্ধে বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী লিখেছেন, ‘সবদিক ভেবে দেখলে একাত্তরের জননী আমি নিজেই। 

পাক হানাদার বাহিনী আমাকে প্রাণে না মারলেও আমার আত্মার অপমৃত্যু ঘটিয়েছে, যার ফলে নেমে এসেছে জীবনে শোচনীয় পরিণতি। আমার দুটি মুক্তিপাগল অবোধ শিশুর সাধ স্বপ্ন আশা আকাঙ্ক্ষা ভরা জীবন কেড়ে নিয়েছে বাংলার মুক্তিসংগ্রাম...।’


১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে সারা দেশ যখন বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত, তখন বোয়ালখালীর পোড়া ভিটের এক কোণে কোলের শিশুকে বাঁচাতে লড়ছেন রমা চৌধুরী। পারেননি তিনি। নিউমোনিয়া আক্রান্ত বড় ছেলে সাগর ২০ ডিসেম্বর মারা গেল। এরপর ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মারা যায় রমা চৌধুরীর মেজ ছেলে টগরও। পুত্রশোকে উন্মাদ রমা চৌধুরী সেই থেকে আর পায়ে জুতা পরেননি।


সন্তানহারা মা রমা চৌধুরী বলেন, ‘আমার ছেলেদের আমি পোড়াতে দিইনি। এই মাটিতে তারা শুয়ে আছে। আমি কীভাবে জুতা পায়ে হাঁটি। পারলে তো বুক দিয়ে চলতাম–ফিরতাম। তারা কষ্ট পাবে।’


১৯৭১ সালের বিভীষিকা কিংবা সন্তানদের মৃত্যুর ক্ষণগুলো এখনো ঝলমলে রমা চৌধুরীর মনে। ‘আমার ছেলে সাগর ৭১–এ সাড়ে পাঁচ বছর বয়সী। মিছিলের পেছন পেছন জয় বাংলা জয় বাংলা বলে ছুটত। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে অসুস্থ হয়ে পড়ে। অনেক চেষ্টা করেও বুকে আগলে রাখতে পারিনি। সাগর আমার মারা যায় ১৯৭১ –এর ২০ ডিসেম্বর। ১ মাস ২৮ দিনের মাথায় মারা যায় টগরও।’—গলা ধরে আসে রমা চৌধুরীর।


রমা চৌধুরীর বিভীষিকার শুরু প্রথম ছেলের মৃত্যুর সাত মাস আগে যুদ্ধদিনে। একাত্তরের ১৩ মে, ২৯ বৈশাখ। তাঁর মনে দগদগে ক্ষত হয়ে আছে ওই একটি দিন। ওই দিনে তিনি হারিয়েছেন সম্ভ্রম, বাড়িঘর। ওই বিভীষিকার বর্ণনাও রয়েছে ‘একাত্তরের জননী’ বইতে: ‘যখন আমাকে নির্যাতন করতে উদ্যত হলো পাক সেনা, তখন জানালার পাশে দাঁড়ানো আমার মা ও দুই ছেলে বারবার আকুতি করছিলেন। ছিল আমার পোষা বিড়াল কনুও। তখন আমি মাকে আমার সন্তানদের নিয়ে সরে যেতে বলেছিলাম।’


১৯৭১ সালে রমা চৌধুরী ছিলেন বোয়ালখালী বিদু গ্রাম উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। লেখালেখিও করতেন ছোটবেলা থেকে। যুদ্ধ শুরু হলে তাঁর স্বামী স্ত্রী ও তিন সন্তানকে রেখে ভারতে চলে যান। এরপর তাঁর দুঃখের দিন শুরু।


দুই ছেলেকে হারিয়ে উন্মাদের মতো জীবনযাপন তখন রমা চৌধুরীর। পাড়াপ্রতিবেশীদের কাছ থেকে জোটে অনেক অপবাদও। সন্তান হারিয়ে খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে একসময় পায়ে ঘা হয়ে যায়। তখন অনেক অনুনয়–বিনয়ের পর অনিয়মিতভাবে জুতা পায়ে দিতে শুরু করেন রমা চৌধুরী। দ্বিতীয় বিয়ে করে নতুন করে বাঁচতে চেয়েছিলেন।


কিন্তু সেই সুখ সইল না। ১৯৯৮ সালের আরেক বিজয় দিবসে রমা চৌধুরীর চতুর্থ ছেলে টুনু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। আবার পাগলপ্রায় তিনি। আবার জুতা পরা ছেড়ে দিলেন এই মহীয়সী নারী। খালি পায়ে নিজের লেখা বই ফেরি করে বেড়ান। কারও দয়া–দাক্ষিণ্য নেন না। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকেও কোনো সাহায্য নেননি তিনি।


রমা চৌধুরীর ১৮টি বই বের হয়েছে। তাঁর ‘ছায়াসঙ্গী’ বইয়ের প্রকাশক আলাউদ্দিন খোকন। খোকন মায়ের মতো সেবাশুশ্রূষা করেন রমা চৌধুরীর। আলাউদ্দিন খোকন বলেন, বই বিক্রি করেই তিনি চলেন। কারও দাক্ষিণ্য নেন না। চেরাগী পাহাড়ের লুসাই ভবনের চারতলার একটি কক্ষে তিনি থাকেন।


রমা চৌধুরী পুত্রশোক ভুলে থাকেন পোষা বিড়ালগুলোকে কোলে নিয়ে। তিন–চারটি বিড়াল পোষেন তিনি। এগুলোকে নিয়েই সন্তানহারা এই মায়ের সংসার। বয়সের ভারে ক্লান্ত রমা চৌধুরী। শরীর ভালো থাকলে নগ্ন পায়ে কাঁধের ঝোলা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।


তিনি বলেন, ‘আমার সন্তানেরা শহীদের মর্যাদা পায়নি। কিন্তু তারা আমার কাছে শহীদ। কারণ একাত্তর আমাকে দিয়েছে ‘পোড়া ভিটে, কাঁধের ঝোলা, ছেলের শোক আর খালি পা।’

                        --------------

(প্রতিবেদনটি ২০১৭ সালের ১২ মে রমা চৌধুরীর নেওয়া সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে লেখা)

'প্রথম আলোর' পেজ হইতে সংগৃহীত।

মন্তব্য করুন

ব্লগ