সহকারী শিক্ষক
০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০৭:১৫ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
হলিউডের বহুদিন ধরে চলে আসা গ্রীষ্মকালীন ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রের ধারা শুরু হয়েছিল মি. ক্যারিয়ারের মাধ্যমে, অনেকটা বিপণি বিতান চালু হওয়ার মতো।
কিন্তু শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিছক সুবিধার চাইতেও বেশি কিছু হয়ে ওঠে। বলতে গেলে এটি ছিল রূপান্তরকারী প্রযুক্তি, যা আমরা কোথায় থাকছি এবং কীভাবে বসবাস করছি তার উপর গভীর প্রভাব ফেলে।
আবহাওয়া খুব গরম বা স্যাঁতসেঁতে হলে কম্পিউটার ঠিকঠাক মতো কাজ করতে পারে না। কিন্তু এয়ার কন্ডিশনারের বদৌলতে ইন্টারনেট সরবরাহকারী সার্ভার ফার্মগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে।
প্রকৃতপক্ষে, যদি কারখানাগুলো তাদের বায়ুর গুণমান নিয়ন্ত্রণ করতে না পারতো তাহলে আমাদের সিলিকন চিপগুলো তৈরি করতে বেশ কষ্ট করতে হতো।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা স্থাপত্য শিল্পেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
ঐতিহাসিকভাবে, গরম জলবায়ুতে ভবনের ভেতরের পরিবেশ শীতল রাখতে পুরু দেয়াল, উঁচু ছাদ, বারান্দা, উঠান এবং জানালা সূর্যের বিপরীত দিকে বসানো হয়ে থাকে।
আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে বসবাস করার জন্য ডগট্রট হাউস বেশ জনপ্রিয়।
একই ছাদের নিচে দুই পাশে দুটি কক্ষ থাকে তার মাঝ বরাবর থাকে উন্মুক্ত করিডোর, যাতে বাতাস চলাচল করতে পারে। অর্থাৎ করিডোরের একপাশ থেকে আরেক পাশের বাইরের দৃশ্য দেখা যায়।
এয়ার কন্ডিশনার উদ্ভাবনের আগে, কাচ দিয়ে তৈরি আকাশচুম্বী অট্টালিকা তৈরির কথা ভাবাই যেতো না। কেননা এয়ার কন্ডিশনার ছাড়া ওইসব ভবনের ওপরের তলায় যে কেউ গরমে সেদ্ধ হয়ে যেতো।
এয়ার কন্ডিশনার একটি অঞ্চলের জনসংখ্যার ওপরেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া দুবাই বা সিঙ্গাপুরের মতো উষ্ণ শহরের উত্থান কল্পনা করাই কঠিন ছিল।
বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মানুষের বসবাসের জন্য আমেরিকা জুড়ে আবাসিক ইউনিট নির্মাণ করা হয় যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
সেইসাথে দেশটির সান বেল্ট অর্থাৎ ফ্লোরিডা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত গরম প্রবণ দক্ষিণাঞ্চলে আমেরিকানদের জনসংখ্যা ২৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশে ঠেকেছে।
বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণের দিকে যাওয়ায় জন্য ওই অঞ্চলের রাজনৈতিক ভারসাম্যও বদলে দিয়েছে।

ছবির উৎস,Alamy
লেখক স্টিভেন জনসন যুক্তি দিয়ে বলেছেন যে এয়ার কন্ডিশনারের ফলশ্রুতিতে রোনাল্ড রিগ্যান নির্বাচিত হয়েছেন।
রিগান ১৯৮০ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন, এটি এমন এক সময় যখন আমেরিকা বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার করেছিল।
তখন থেকেই উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো দ্রুত এগিয়ে যেতে শুরু করে। চীন দ্রুত বিশ্বনেতা হয়ে ওঠে।
চীনের শহরগুলোয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাড়ির অনুপাত আগে যেখানে ১০ ভাগের এক ভাগ ছিল সেটি বাড়তে বাড়তে মাত্র ১০ বছরের মাথায় দুই-তৃতীয়াংশ ছাড়িয়ে গিয়েছে।
ভারত, ব্রাজিল এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোয় এয়ার কন্ডিশনারের বাজার দুই অঙ্কে প্রসার লাভ করে।
সেখানে প্রবৃদ্ধির আরও সুযোগ রয়েছে কারণ বিশ্বের ৩০টি বড় শহরের ১১টি এই গরম প্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত।
এয়ার কন্ডিশনারের বাজারের ব্যাপক প্রসার অনেক কারণেই একটি ভালো খবর।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, এটি তাপপ্রবাহের সময় মৃত্যুহার কমিয়ে দেয়। অতিরিক্ত গরম কারাগারের কয়েদিদের মেজাজ খিটখিটে করে তোলে।
কিন্তু এয়ার কন্ডিশনার বসানোর পর তাদের মারামারির হার কমে যায়। যা এ বাবদ বিনিয়োগকে অর্থবহুল করেছে।
পরীক্ষার হলগুলোয় তাপমাত্রা যখন ২১ ডিগ্রি থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায় তখন দেখা যায় শিক্ষার্থীরা গণিত পরীক্ষায় কম নম্বর পেতে শুরু করেছে।
অফিসে, এয়ার কন্ডিশনার আমাদের আরও বেশি উত্পাদনশীল করে তোলে। একটি প্রাথমিক গবেষণা অনুসারে, এয়ার কন্ডিশনারের কারণে মার্কিন সরকারের টাইপিস্টরা আগের চাইতে ২৪ শতাংশ বেশি কাজ করতে পারছিলেন।
তারপর থেকে অর্থনীতিবিদরা নিশ্চিত করেছেন যে উত্পাদনশীলতার সাথে ঠান্ডা পরিবেশের একটি সম্পর্ক আছে।

ছবির উৎস,Alamy
উইলিয়াম নর্ডহাউস অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমা রেখা দিয়ে বিশ্বকে কয়েকটি অংশে বিভক্ত করেছেন এবং প্রত্যেকের জলবায়ু, উৎপাদনশীলতা এবং জনসংখ্যার বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করেছেন।
তিনি জানতে পারেন, গড় তাপমাত্রা যত বেশি হবে, মানুষ তত কম উৎপাদনশীল হবে।
জিওফ্রে হিল এবং জিসুং পার্কের মতে, গরম দেশগুলোয় গড়ে যে গরম পড়ে তার চেয়ে বেশি গরম পড়লে সেটা উত্পাদনশীলতার ওপর প্রভাব ফেলে। ওই বছরে উৎপাদনের জন্য খারাপ বলে ধরা হয়।
তবে শীতল দেশে গড়ে যে গরম পড়ে তার চেয়ে বেশি গরম পড়লে সেটা ভালো লক্ষণ।
পরিশেষে তারা বলেছেন যে মানুষের উত্পাদনশীলতা সবচেয়ে বেশি থাকে ১৮ ডিগ্রি থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে।
তবে একটি অস্বস্তিকর বা তিক্ত সত্য রয়েছে। সেটি হলো আপনি ভেতরের পরিবেশ ঠান্ডা করতে গিয়ে বাইরের পরিবেশ গরম তুলছেন।
অ্যারিজোনার ফিনিক্স শহরের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ইউনিট থেকে পাম্প করা গরম বাতাস শহরের রাতের তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে।
ভূগর্ভস্থ মেট্রো সিস্টেমে, ট্রেনগুলো শীতল রাখার কারণে উত্তপ্ত প্ল্যাটফর্মগুলো আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।
যে বিদ্যুতের সাহায্যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চালানো হয় সেই বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় গ্যাস বা কয়লা জ্বালিয়ে। এবং এয়ার কন্ডিশনারগুলো ঘর ঠান্ডা করতে যে কুল্যান্ট ব্যবহার করে, তার মধ্যে অনেক ধরনের শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস থাকে। ফলে গ্যাসগুলো লিক হলে পরিবেশে মিশে যায়।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি দিন দিন পরিবেশ বান্ধব হয়ে উঠছে।
কিন্তু এই যন্ত্রের চাহিদা এত দ্রুত বাড়ছে যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি শক্তি খরচ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।
এটি জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য উদ্বেগজনক খবর। এখন প্রশ্ন উঠেছে আমরা কি কখনও বাইরের আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করার মতো কিছু উদ্ভাবন করতে পারবো?
১৬
২৬ মন্তব্য