সহকারী শিক্ষক
০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০১:৫৯ পূর্বাহ্ণ
আমরা হেরে যাওয়া লোকের প্রতিনিধিত্বকারী
আমরা হেরে যাওয়া লোকের প্রতিনিধিত্বকারী
এই ধরণীর বুকে অসংখ্য মানুষ আছে যারা "হেরে যাওয়া লোকের" প্রতিনিধিত্ব করে।এই লোকগুলো বারংবার জীবনের কাছে পরাজিত হয়। বোবা মনের সেই হেরে যাওয়ার গল্পগুলো হয়নি বলা কারো কাছে। তাদের জীবনের দুঃখ -বেদনা বরফগলা নদীর মতো হু হু করে ভেসে আসে আর বুকফাটা দীর্ঘশ্বাসের দমকা হাওয়া জেগে উঠে যা ধূসর করে তোলে এক একটি সবুজ জীবন।
আপনারা যারা ষাঁড়ের লড়াই দেখেছেন তারা হয়তো জানেন। লড়াইয়ে হেরে যাওয়া ষাঁড়টি থাকে রক্তে রঞ্জিত। আহত হয়, ক্ষত-বিক্ষত হয়। হেরে যাওয়া সেই ষাঁড়টিকে বাজারে বিক্রি করে দিতে হয় কম দামে কিংবা জবাই করে বিক্রি করে দিতে হয় তার মাংস। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, হেরে যাওয়া মানুষগুলোর মানসিক অবস্থা ষাঁড়ের চেয়েও করুণ।ক্ষত-বিক্ষত তাদের হৃদয়।
কিন্তু আমরা স্তুতি গাই সফলদের। জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত মানুষগুলো পর্দার আড়ালেই থেকে যায়। কেউ খুঁজে না তাদের। আমাদের দেশের মোটিভেশনাল স্পিকাররা তাদের লেকচারে বারংবার জপতে থাকেন -"জীবন মানে অর্জন।" যে জীবনে অর্জন নেই সে জীবন অর্থহীন। তাদের লেকচারে একটা বিষয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে-জীবন মানে টাকা, পদ-পদবী, বাড়ি-গাড়ি ইত্যাদি। কিন্তু তারা ভুলে যান পৃথিবীতে সবাই জয়ী হতে আসেনি। সবার জয়ী হওয়ার দরকারও নেই। এই পৃথিবীর খুব কম মানুষই জয়ীদের তালিকায় থাকবে অধিকাংশই হেরে যাওয়ার তালিকায় স্থান পাবে। শিবখেরা, ডেল কার্নেগী থেকে শুরু করে শিক্ষক, বাবা-মা সবাই বারবার আমাদের একটা কথাই বলে - "তুমিও জিতবে।" কিন্তু কেউ কখনও বলে না- "তুমিও হারবে।" তুমি রক্ত-মাংসের মানুষ।তোমারও ক্লান্ত লাগবে। একটু বসো। সব সময় উঠে দাঁড়ানো দরকার নেই।
আমরা আমাদের বাচ্চাদের শিখায় না - "জিতে যাওয়া মানেই জীবন না, হেরে যাওয়ার মধ্যেও থাকে বেঁচে থাকার আনন্দ।"
আমরা এগুলো শেখায় না বলেই- "কত রাতের চোখ ছল ছল জলের কাব্য লিখে পরিশ্রান্ত হয়ে, "রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সোহাগ খন্দকারের মতো" অনেকেই মৃত্যুতেই খুঁজে নেয় শেষ আশ্রয়।
বলাবাহুল্য, ২০২১ সালে ১৪ হাজার ৪৩৬ জন নারী-পুরুষ আত্মহত্যা করেছে। তার পেছনে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে পারিবারিক জটিলতা, সম্পর্কের অবনতি, পড়াশোনা নিয়ে হতাশা, আর্থিক সংকট। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।
কেন এই আত্মহত্যার প্রবণতা? যদি আপনি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেন তাহলে দেখতে পাবেন- "আমরা হেরে যাওয়াকে মেনে নিতে পারি না।" যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে এটিকফোবিয়া।
আপনারা জেনে অবাক হবেন- জাপানে "সি অফ ট্রি " নামে একটা বন আছে। যেখানে মানুষ আত্মহত্যা করতে আসে। মৃত্যুর এই জায়গাটা বেছে নেয় কেন জানেন ??? যেন কেউ খুঁজে না পায়। মানুষ বড় অভিমানী প্রাণী।
হেরে যাওয়া মানে সব শেষ নয়।
হেরে যাওয়া মানে একটু থেমে, নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার আরেকটু প্রশ্রয়। আমাদেরকে আমাদের শিক্ষক তথা গুরুজন ও বাবা- মা এটা শেখায় না। আমরা আমাদের বাচ্চাদের শিখায় জীবন মানে যুদ্ধ। যেখানে জিততেই হবে।
এটা সত্যি যে, যুদ্ধে জিত হয়, না হয় হার। আর তাই যুদ্ধ কখনো উপভোগ্য হয়না। জীবন মানে যে সহযোগিতা, আমরা বনী-আদম তা ভুলতে বসেছি। তাইতো জনৈক ব্যক্তি বলেছেন -
When competition turns into contribution, life becomes a celebration.
আপনি ভাবতে পারেন- আমি জয়ীদের গুণকীর্তনে ঈর্ষান্বিত, আমি মোটিভেশন এর বিপক্ষে। কিন্তু আমার হৃদয় বলে জয়ের মালা জয়ীদের গলায় থাকুক কিন্তু হেরে যাওয়া মানুষগুলোর বসে থাকার স্বস্তি থাকুক। জয়ী মানুষগুলোর বাহবা বা শীষ শোনার যেমন অধিকার আছে ঠিক তেমনি হেরে যাওয়া মানুষগুলোর একফোঁটা বৃষ্টি পাওয়ার অধিকার আছে, একটি ঘাসফুল পাওয়ার অধিকার আছে।
বাস্তবতার মস্ত কলে
হয়নি যারা নিষ্পেষিত
কেমনে করে বুঝবে তারা
বাস্তবতা বড়ই তিতো।
হেরে যাওয়া মানুষগুলোর মননে জড়তার দেয়ালগুলোর নীড় তাদের সমস্ত জীবনের নিস্ফফলতা ও অন্তঃসারশূন্যতা কে জাগ্রত করে। তাইতো অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে কবি হেলাল হাফিজ বলেছেন-
একলা পথিক!!!
দুপুর রোদে গাছের নিচে একটু বসে জিরিয়ে নিও।
পরিশেষে, বাবা-মা, শিক্ষক ও অভিভাবক, আপনাদের সবার কাছে একটাই অনুরোধ - জিতে যাওয়ার মোটিভেশন দেন; কোন সমস্যা নাই কিন্তু হেরে যাওয়া লোকদের কথাও একটু বলেন। উঠে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণার দরকার আছে সেটা আমিও মানি। কিন্তু একটা ক্লান্ত ছেলে বা মেয়ের বসে পড়ার স্বস্তিটুকুও দরকারী। পৃথিবীতে সবাই জিততে আসে নাই। সবার জিতার দরকারও নাই। পৃথিবীতে সবাই বাঁচতে আসছে। বাঁচার অধিকার সবার আছে, তাই সবাইকে বাঁচার অধিকার দিন। এই পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ একটা স্বপ্ন ডিজার্ভ করে। একটুখানি বা এক ছটাক আলো ডিজার্ভ করে। এই পৃথিবীর জল, বাতাস, জ্যোৎস্নার আলোতে যেমন সবার অধিকার আছে ঠিক তেমনি হেরে যাওয়া মানুষের মাথার উপর থেকে এক টুকরো মেঘের ছায়া কেড়ে নেয়ার অধিকার কারো নেই।
তাই আসুন,জাগ্রত করি হেরে যাওয়া লোকগুলোর বিশ্বাসকে, ভেঙে ফেলি জড়তার দেওয়ালগুলো। যে বিশ্বাসে ভর করে উড়ে যাবে সব হতাশা, সৃষ্টি হবে উল্লেসিত জীবন।
মোহাম্মদ মানিক হোসেন
সহকারী শিক্ষক
খলিশাটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
সদর,নোয়াখালী।
২
৫ মন্তব্য