Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ

কবিয়াল এন্টনি ফিরিঙ্গি-র নাম অনেকেই জানেন তাঁর আসল নাম ছিল হ্যান্সম্যান এন্টনি, এক ভারতীয় পোর্তুগীজ।

কবিয়াল এন্টনি ফিরিঙ্গি-র নাম অনেকেই জানেন তাঁর  আসল নাম ছিল হ্যান্সম্যান এন্টনি, এক ভারতীয় পোর্তুগীজ। লোকমুখে প্রচলন আছে যে তিনি বাংলা ভাষায় এতো দক্ষতা অর্জন করেছিলেন যে, তাৎক্ষণিক কবিতা লিখে কবিগান গাইতে পারতেন, তাঁর বাবা পোর্তুগীজ এবং মা বাঙালী ছিলেন,


এন্টনি ফিরিঙ্গি বা "বিদেশী অ্যান্টনি" (জন্ম:১৭৮৬ - মৃত্যু:১৮৩৬), বাংলা ভাষার কবিগান গায়ক-লেখক এবং পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত লোককবি ছিলেন যা বাঙালি ভক্তিতে তাঁর অসাধারণ প্রতিভার জন্য পরিচিত ছিল ১৯ শতকের গোড়ার দিকে তিনি কবিগান রচয়িতা নামে পরিচিত সাহিত্যিক ও  যাত্রা অভিনেতাদের মধ্যেও খ্যাতি পেয়েছিলেন। কবিগানের মাধমে সমাজের নানাবিধ অসমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। 


বহুকাল আগের কথা, সারা ভারত জুড়ে চলছে ভক্তি আন্দোলনের জোয়ার। মা কালী তখন স্থাপিত শ্মশানে। তখন তিনি শ্মশান কালীরূপে পরিচিতা। সে সময় গঙ্গা বয়ে চলত আজকের সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের ওপর দিয়ে। গঙ্গার পাশেই গা ছমছমে গভীর অরণ্য। দিনেও যেতে ভয় পেত মানুষ। অরণ্যের মধ্যেই এক মহাশ্মশান। সেই মহাশ্মশানে একটা ছোট্ট চালাঘর। চালাঘরেই শিবলিঙ্গের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন দেবী কালিকা। শ্মশানকালী হলেও দেবীর নাম সিদ্ধেশ্বরী।

কালের বিবর্তনে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ছেড়ে গঙ্গা গেল সরে। জব চার্নক এলেন। গোড়াপত্তন হল কোলকাতা নগরীর। নির্জনতা কমতে লাগল। যানবাহন চলল শহরের বুকে চিরে। গড়ে উঠল বসতি। বাড়তে লাগল ফিরিঙ্গিদের বসবাস। আবির্ভাব ঘটল খ্রিস্টান কবিয়াল এন্টনি। জাতিতে পর্তুগিজ ছিলেন তিনি। প্রায়ই আসতেন শ্মশানের চালাঘরে। প্রাণ উজাড় করে গাইতেন।


এন্টনির বাবা অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বাংলায় আগমন করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গের চন্দননগর শহরে ফারাশডাঙ্গায় বসতি স্থাপন করেন। পুত্র এন্টনি বাংলা ভাষায় পারদর্শীতা অর্জন করেন। 


ফিরিঙ্গি এন্টনি নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে, ভারতবর্ষের প্রথম কলোনিয়াল ঔপনিবেশিক দের কথা জানলাম। বৃটিশদেরও বহু আগে ১৪৯২ সালে একদল পোর্তুগীজ এসেছিলো ভারতে, তাই হয়তো কলোম্বাস ভারত জয়ের উদ্দেশ্যেই স্প্যানিস রাজাকে অনুরোধ করেছিলো তিনটি জাহাজ দিতে যেনো ভারত থেকে সোনা দানা লুটকরে নিয়ে যেতে পারে। তবে এখানে ফিরিঙ্গি এন্টনির গল্প, ইতিহাস হিসেবে নয় বরং প্রচলিত লোকজ গল্প থেকে তুলে ধরি।


ফিরিঙ্গি এন্টনি 'সৌদামিনী' নামে এক হিন্দু ব্রাহ্মণ বিধবার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন এবং তিনি হিন্দু ধর্মের পাশাপাশি বাঙালি সংস্কৃতি ও ভাষা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তবে, অ্যান্টনি বাংলা ভাষা শিখতে আগ্রহ থাকায়, কালী ও দুর্গার দেবদেবীর প্রতি ভক্তদের জন্য প্রচুর উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় সংগীত রচনা করেছিলেন। দুর্গাপূজার বাঙালি শারদীয় উত্সব উপলক্ষে দেবী দুর্গার তাঁর বাবা-মায়ের বাড়িতে ফিরে আসার উদযাপনে তিনি তাঁর আগমনী গানের জন্য খ্যাতিমান হয়েছেন। এন্টনি কবিগান বা বার্ডের দ্বৈত দ্বন্দ্বের জন্য তাঁর সাহিত্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন, ভোলা মায়রা, রাম বসু এবং ঠাকুর সিংহ সহ বেশ কয়েকজন নামকরা বাঙালি সুরকার তাঁকে অনুপ্রেরণা যুগিয়ে ছিলেন। অ্যান্টনি মধ্য কলকাতার বোবাজার এলাকায় 'ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি' নামে পরিচিত কালী দেবীর মন্দির নির্মাণে সহায়তা করেছিলেন, সেখানেই সৌদামিনীর সাথে এন্টনির পরিচয় হয় ও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, সৌদামিনী বিধবা হওয়ার কারণে এবং বিদেশী এন্টনিকে পুনরায় বিবাহ করার কারণে তাঁর স্ত্রী সৌদামিনীকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। 


বৃটিশ, ফরাসি ও ওলোন্দাজ দের ও বহু আগে পর্তুগীজরা ভারতবর্ষে এসেছে প্রথমে ব্যবসা ও পরে পর্তুগাল ওপনিবেশকতার ক্ষমতায় দখলকৃত স্থানসমূহ নিয়ে গড়ে উঠা ভারতীয় এলাকায়। এই এলাকার নাম করণ হয়েছে 'পর্তুগীজ ভাইসরয়াল্টি অব ইন্ডিয়া', পর্তুগীজ ভাষাতে এই এলাকার নাম হচ্ছে ভাইস-রেইনো দ্য ইন্ডিয়া পর্তুগীজ' পরবর্তীতে এই এলাকার নাম সরাসরি পর্তুগীজ ষ্টেট অব ইন্ডিয়া বা Estado Portuguesa da Índia নামকরণ করা হয়

১৪৯৮ সালে ভারতবর্ষে পর্তুগিজরা আসে। ২০শে মে, ১৪৯৮ সালে পর্তুগীজ নাবিক ভাস্কো ডা গামার নেতৃত্বে পর্তুগিজ জাহাজ বহর কালিকটের (বর্তমান কোজিকোড়ে) কাপ্পাড় এলাকাতে অবতরন করে। ১৫০৫ সালে পর্তুগিজ ভারতের সরকার গঠিত হয়। পর্তুগিজ শাসকদের ভাইসরয় উপাধিতে ডাকা হত। ভারতবর্ষে নিযুক্ত প্রথম ভাইসরয়ের নাম ফ্রান্সিসকো দ্য আলমেইদা। ভারতবর্ষে পর্তুগীজ শাসনের কেন্দ্র বিন্দু ছিল কোচি। ১৭৫২ সাল পর্যন্ত ভারত মহাসাগরের সকল পর্তুগীজ অভিযান এই কোচি থেকেই পরিচালিত হত।

সেই পর্তুগীজ পরিবারেরই একজন এন্টনি ফিরিঙ্গি, বাংলা ভাষার উপর অসম্ভব দখল ছিলো। সারা বাংলায় এন্টনি ফিরিঙ্গির নাম কবিয়াল হিসেবে খ্যাত। 


১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত বর্ষ ছেড়ে গেলে পর্তুগিজরা ভারতে রয়ে যায়। পর্তুগিজ ছিটমহল হিসেবে গোয়া দমন দিউ সহ কিছু এলাকা ভারত ভূখন্ডে রয়ে যায়। ১৯৫৪ সালে ভারত গোয়া সহ আরও কয়েকটি জায়গা পুনরুদ্ধার করে নেয়। ডিসেম্বর ১৯৬১ সালের মধ্যে সকল পর্তুগিজ এলাকা ভারত শাসনে চলে যায়। ১৯৭৫ সালে পর্তুগিজ সরকার ভারতবর্ষ থেকে তাদের দাবি অধিকার সম্পূর্ণরুপে সরিয়ে নেয়।


পরবর্তীতে ওলোন্দাজরা কিভাবে ভারতবর্ষে এলো এবং 'মার্থান্দা ভার্মা এবং কোলাচেলের যুদ্ধ' কিভাবে ডাচ ওলোন্দাজরা জিতে যায়, তা নিয়ে লিখবো।


তথ্যসুত্রঃ ভারতের ইতিহাস ও নীলকন্ঠ

মন্তব্য করুন

ব্লগ