Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ

Definitions belong to the definers, not the defined.

Definitions belong to the definers, not the defined.

 

 

কে কাকে কি নামে আখ্যায়িত বা উপস্থাপন করে এটারও রাজনীতি আছে যেটাকে স্টুয়ার্ট হলের ভাষা ব্যবহার করে "উপস্থাপনের রাজনীতি" politics of representation বলা যেতে পারে। টনি মরিসনের "Beloved" উপন্যাসে একটা লাইন এখানে উল্লেখ করা প্রণিধানযোগ্য -Definitions belong to the definers, not the defined. সাম্প্রতিককালে শিক্ষার্থী কর্তৃক প্রতিষ্ঠান প্রধানদের স্বেচ্ছায় অবসরে পাঠানোর ঘটনাকে অনেকে অনেক ভাবেই দেখছেন। কেউ ইতিবাচকভাবে আবার কেউ নেতিবাচকভাবে দেখছেন। দেখার ভিন্নতা কেন হয় সেটা আগে একটু বলি। আমাদের চোখের সাথে মস্তিষ্ক রয়েছে অর্থাৎ আমরা যা দেখি তা আমাদেরকে ভাবায়। দেখা ভাবা এত সুক্ষ্ম সময়ের ব্যবধানে ঘটে যে আমরা মনে করি একই সময়ে একই সাথে ঘটেছে। ফলে আমরা ভেবে বসি যে আমরা যা দেখলাম আলাদাভাবে চিন্তা করলেও তার বেশি দেখতে পারতাম না। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে তা নয়। আপনার দেখা ভাবার মধ্যে পার্থক্য হওয়াটা অবাস্তব কিছু নয়।

শিক্ষার্থী কর্তৃক প্রতিষ্ঠান প্রধানকে স্বেচ্ছায় অবসরে পাঠানোর এই ঘটনাগুলোর সাথে শেক্সপিয়ারের সেই বিখ্যাত কথাটির গভীর মিল পাওয়া যায় - Fair is foul and foul is fair. সমাজের মোরাল এনার্কির প্রতিচ্ছবি হলো এই ঘটনাগুলো। আপনি মানুন আর নাই মানুন।

শিক্ষার্থী কর্তৃক শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনা এটা প্রথম নয়। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ গুলোতে এই প্র্যাক্টিস আমরা বিগত দশক দেখে আসতেছি।শিক্ষার্থী কর্তৃক বেদম প্রহার, কান ধরে উঠবস করানো, কক্ষে তালা মেরে বন্দি করে রাখা ইত্যাদি আমাদের চোখ সয়ে গেছে। আপনি ভাববেন না শিক্ষক নির্যাতনকে আমি জাস্টিফাই করতেছি।

তাই আমি আদম শিক্ষার্থী কর্তৃক বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান প্রধানদেরকে অপসারণের পক্ষে। এটা অবিশ্মম্ভাবী। পরাজিতরা মাঠ ছেড়ে দেয়, বা মাঠ ছাড়তে বাধ্য করা হয় এবং জয়ীরা মাঠ দখল করবে এটাই পাওয়ার ট্রান্সফারের নিয়ম। আপনি একটু চিন্তা করুন, যদি ছাত্র বিপ্লব ব্যর্থ হইত আজকের সিনারিওটা কেমন হইতো? এই শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের উপরে জুলুম করতো, তাদেরকে শাস্তির মুখোমুখি করত, তাদের একাডেমিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিত। আপনি ভাববেন না এটা আমার হাইফোদিসিস। এর যথেষ্ট ইভিডেন্স আপনি অনলাইনে দেখতে পাবেন। একটা ভিডিও ক্লিপ আপনি সার্চ করলে পেতে পারেন। MIST ( Military Institute of Science and Technology) - এর একজন প্রফেসর শিক্ষার্থীর থ্রেট দিচ্ছে এই বলে- "যারা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করবে উনি তাদের সবাইকে ফেল করাবেন তাদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিবেন।"

তারা ছিল নিকৃষ্ট স্বৈরশাসকের পাচাটা গোলাম। আপনি ভালো করেই জানেন আওয়ামী শাসনে এই - দ্বীপে দালালি ছাড়া ফুল ফুটতো না, মেঘও নামতো না।তাই ছাত্র বিপ্লব সফল হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা দলবাজ দালালদেরকে তাদের পদ থেকে অপসারণ করতে বাধ্য করবে এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু আজ আমরা মানবতার ফেরিওয়ালাদেরকে দেখতে পাচ্ছি। তারা হই হই রই রই করতেছেন। শিক্ষার্থীরা কেন শিক্ষককে অবসরে যেতে বাধ্য করবে! এটা কর্তৃপক্ষের কাজ,শিক্ষার্থীদের কাজ না।

তাদের মনোবেদনা আমি বুঝতে পারি কারন মানুষের সাইকোলজিটাই এমন। মানব হৃদয় স্বভাবতই কারো দুঃখ দেখলে তার প্রতি ঝুঁকে পড়ে। তার পূর্বের সকল জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন সে হালকা করে দেখে। জালেম মজলুমের উপর জুলুম করতে করতে, একটা পর্যায়ে গিয়ে জালেম দুই ফোঁটা পানি খাওয়াইলেই অভুক্ত পিপাসার্ত মজলুম জালিমকে ত্রাতা মনে করে বসে। অথচ মজলুম বুঝেনা তাকে দু ফোঁটা পানি দিতেছে যেন মজলুম জিন্দা থাকে আর জুলুমের প্রহার আরো লম্বা হয়। মানুষের এই সাইকোলজি টাকে ব্যবহার করেই রাজনৈতিক দলগুলো আমাদেরকে বিগত ৫২ বছর শোষণ করে গেছে।

পোষা মুরগি যে বাড়িতে পোষ মানে সেই বাড়িতে ডিম দেয় কারণ সে পশু বলে। গরু যে বাড়ির গোয়ালে থাকে সেই বাড়িতেই দুধ দেয় কারণ সে পশু বলে।

কিন্তু মানুষ? মানুষ এমন নয়। স্থান বা গোত্রভিত্তিক চিন্তার উর্ধ্বে উঠতে পেরেছে বলেই মানুষ সেরা। আজকে আপনি শিক্ষক বলে আরেক দালাল শিক্ষকের পাশে দাঁড়াবেন আর এটাকে পূর্ণের কাজ ভাববেন। এবং সেটাকে প্রশ্ন করা হবে না এটা কি হতে পারে?

একজন ডাক্তারের অবহেলার কারণে আপনার সন্তানের জীবন বিপন্ন হল অথবা বড় কোন সমস্যায় পতিত হলো। এক্ষেত্রে আপনি যখন বিচার চাইতে গেলেন তখন সকল ডাক্তার একসাথে হয়ে গেল। বলা শুরু করল ওতো আমার গোত্রের। আমার মতো একজন ডাক্তার ওকে শাস্তি থেকে বাঁচাতেই হবে যেভাবেই হোক। তাহলে আপনার তখন কেমন লাগবে? আপনি কি ন্যায় বিচার পাবেন? তাই দয়া করে গোত্রপ্রীতি ছাড়ুন জালেমকে তার শাস্তি পেতে দিন। যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কোন শিক্ষক এই ধরনের নিকৃষ্ট দালালি করতে সাহস না পায়।

আমার মত উনপাঁজুরে হওয়ার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নাই বরং ব্লাশফেমি আছে। বিচারপতি মানিকের করুণ দশা দেখে আমার হৃদয়ে সহানুভূতি জাগলো কিন্তু পরক্ষণেই ভেবে দেখলাম জালিমের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে আমি বহু মাজলুমের ন্যায়বিচার আকাক্ষার প্রতিই অসম্মান করলাম। আজ এক ভিডিওতে দেখলাম এক মাজলুম কেঁদে কেঁদে বলছে আমি এক ব্যাগ রক্ত বিক্রি করে আদালতে হাজিরা দিতে গেলাম। এই বিপ্লবে প্রায় ১০০০ মা তাদের সন্তান হারিয়েছে তাদের রক্তের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান দেখান। আপনার গোত্রের লোক বলে দালাল, জালিমদের পক্ষ নিয়ে নিজেকে ফেরেশতা ভাববেন না, প্লিজ।

প্রাচীন গ্রিসের ডেলফি নগরিতে একটি ভবিষ্যৎবাণী মন্দির ছিল। মন্দির ফটোকে মূল মন্ত্র লিপিবদ্ধ ছিল: "medan agan"- কোন কিছুতেই বাড়াবাড়ি করবে না তাই যেসব শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠান প্রধানকে স্বেচ্ছায় অবসরের বাধ্য করার সময় লাঞ্ছিত করছেন, গায়ে হাত দিচ্ছেন, জুতার মালা গলায় দিচ্ছেন আমি তাদেরকে ধিক্কার জানাই। আপনাদের এহেন কার্যকলাপ আপনাদের পারিবারিক শিক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। পাওয়ার ট্রান্সফার সিস্টেমটা অহিংস করুন, ভদ্র ভাষায় তাদেরকে পদ থেকে অপসারণ করাই তাদের জন্য লজ্জাজনক হবে বলে আমার বিশ্বাস।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলো দেখে আমার এইটা মনে হয়েছে, শুধু শিক্ষার্থীরা নয়, কিছু অভিভাবক এবং অত্র প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাও প্রতিষ্ঠান প্রধানের অপসারণের সাথে জড়িত আছে।

প্রতিটি মানুষের চরিত্রের একটি নয় তিনটি রূপ আছে। একটি রূপ তিনি বাহিরে দেখান। একটি রূপ তার আসল চরিত্র। আরেকটি হল তিনি নিজে তার চরিত্র সম্পর্কে যা ভাবেন। কিন্তু আমি আদম মনে করি, বাঙালির এই তিনটি রূপের বাইরেও আরো অনেকগুলো রুপ আছে, এক কথায় বহুরূপী। আমাদের কিছু ভাইকে দেখি তরল পদার্থের ন্যায়, যখন যে পাত্রে যায় সেই পাত্রের আকার ধারন করে।

আল্লাহ আমাদের বহুরূপী হওয়া থেকে রক্ষা করুন।

 

      মো: মানিক হোসে

সহকারী শিক্ষক

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ