সহকারী প্রধান শিক্ষক
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০৯:৩২ অপরাহ্ণ
সহকারী প্রধান শিক্ষক
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া কোনো জাতির পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন সম্ভব নয়। বর্তমান সময়ে আমাদের কাছে এই পরিবর্তন আনার বিশেষ সুযোগ রয়েছে, কেননা এখন প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে একজন শিক্ষক রয়েছেন। তার কাছে বিষয়টি সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হলে আমাদের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। এই উদ্যোগ আমাদের হাতে না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ হয়ে পড়বে।
আমাদের দেশের স্বৈরাচারী সরকারগুলো দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে আসছে। তারা চায় মানুষ তাদের বশ্যতা মেনে চলুক এবং চিন্তার ক্ষেত্রে নির্ভরশীল হয়ে থাকুক। তাই শিক্ষার প্রকৃত মানোন্নয়নের দিকে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। সরকারের মুখে সবসময় শুনতে পাই যে "শিক্ষা হলো সর্বোৎকৃষ্ট বিনিয়োগ", কিন্তু বাস্তবে বাজেটে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। শিক্ষার উন্নয়ন মানে কেবল নতুন বিল্ডিং, স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা নয়। বাজেটের সিংহভাগই ব্যবহার হয় অবকাঠামো তৈরিতে, যেখানে মুনাফা করার সুযোগ থাকে। শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য প্রয়োজন অন্তর্গত কাঠামোগত পরিবর্তন যা শিক্ষার্থীদের মনন, নৈতিকতা, জ্ঞান ও সৃজনশীলতাকে বৃদ্ধি করে। অথচ এ ব্যাপারে সরকারের কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।
এই স্বার্থান্বেষী সরকারগুলো নিজেদের সন্তানদের কখনোই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত করে না। তারা তাদের সন্তানদের বিদেশে শিক্ষার জন্য পাঠায় এবং সেই শিক্ষার মাধ্যমে বিদেশে তাদের অবস্থান আরও মজবুত করে। এ থেকে পরিষ্কার যে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি তাদের আস্থা নেই। তারা নিজেরাই জানে যে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এমন একটি ব্যবস্থা যা প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে ব্যর্থ।
শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য হলো একজন সচেতন ও সৃজনশীল নাগরিক তৈরি করা, কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা শুধুমাত্র পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন এবং চাকরি পাওয়ার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এটি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা, এবং নৈতিকতার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে শিক্ষিত হয়ে বের হওয়া নাগরিকরা সমাজে তেমন কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে না।
আমাদের উচিত পাশ্চাত্য ও পূর্ব এশিয়ার কিছু উন্নত দেশের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শিক্ষা নেওয়া। জাপান, যাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আণবিক বোমায় ধ্বংস করা হয়েছিল, আজ পৃথিবীর অন্যতম সেরা দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে তাদের শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের ফলে। জাপানিরা শিক্ষাকে কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান হিসেবে নয়, বরং বাস্তব জীবন এবং মানসিক বিকাশের একটি উপায় হিসেবে গ্রহণ করেছে।
জাপানের মতো দেশগুলোতে শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল কর্মসংস্থান নয়, বরং প্রতিটি শিক্ষার্থীকে একটি পরিপূর্ণ, সচেতন ও সৃজনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। শুধুমাত্র বইয়ের পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার্থীদের ব্যতিক্রমী চিন্তা, সামাজিক দায়িত্ব, নৈতিক মূল্যবোধ এবং ব্যক্তিত্বের বিকাশে গুরুত্ব দিতে হবে।
তাছাড়া, আমাদের শিক্ষাক্রম এবং পাঠ্যবইগুলো এমনভাবে গঠন করা উচিত যেখানে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধানে দক্ষতা অর্জন করতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষাদানের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত একজন শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা, মেধা ও নৈতিকতার পূর্ণ বিকাশ ঘটানো।
এখনই সময় শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন আনার। সরকারের দৃষ্টি শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়নের দিকে না দিলে, আমাদের দেশ বিশ্বপর্যায়ে পিছিয়ে পড়তে থাকবে।
@ মোমিন আহমেদ, সহকারী প্রধান শিক্ষক, সৃজনী উচ্চ বিদ্যালয়,সদর,জয়পুরহাট।
১৬
২৬ মন্তব্য