সহকারী শিক্ষক
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০৫:২৪ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
" আমার ছেলের জন্য আমি কখনোই ব্রান্ডের জিনিস ছাড়া ব্যবহার করি না।"
স্কুলের ওয়েটিং রুমে অপেক্ষমান মায়েরা গল্প করছিল। সবার কন্ঠ ছাপিয়ে মিথিলা বেশ দম্ভভরে কথাগুলো বলল। কথাগুলো উপস্থিত অনেকের মতো হিমেলেরও ভালো লাগল না। তবুও সবার মতো সেও চুপ থাকল। আসলেই মিথিলা এবং তার ছেলে মিথুন সবসময়ই দামি ব্র্যান্ডের জামা, জুতা, ব্যাগ ব্যবহার করে। যা সত্য তা সবাই মেনেই নেয়। কিন্তু সেটা নিয়ে দাম্ভিকতা মেনে নিতে সবারই একটু বাঁধে।
ছুটির ঘন্টা বাজতেই সবাই যার যার বাচ্চাদের রিসিভ করল। হিমেলের ছেলে শান্ত তাকে বলল,
– মামনি আজ মিথুন নতুন একটা কালার পেন্সিলের সেট নিয়ে এসেছে। অনেকগুলো কালার। আমাকে ওরকম কিনে দেবে?
মিথুন এবং শান্ত একই ক্লাসে পড়ে। প্রায়দিনই শান্তর কাছে মিথুনের নতুন নতুন জিনিসের গল্প শুনতে হয়। সবসময়ের মতো আজও শান্তর কাছে মিথুনের নতুন কালার সেটের কথা শুনে হিমেল তার ছেলেকে বোঝাতে লাগল,
– অন্যের জিনিস সুন্দর হলেই যে সেটা নিজেরও কিনতে হবে এমনটা কিন্তু ঠিক না। নিজের যা আছে তাতেই খুশি থাকতে হয়।
– তাইতো, তুমি তো সেদিন বাবুই আর চড়ুই পাখির কবিতাটা বলেছিলে– " নিজ হাতে গড়া মোর কাচা ঘরই খাসা।"
– ঠিক তাই। চলো আমরা মা-ছেলে আজ মন ভরে ফুচকা খাব।
হিমেল ফুচকা খেতে খেতে শুনতে পেল মিথিলা তার ছেলেকে বলছে,
– ওকে সোনা, তোমার বাবাকে বলব কালই যেন তোমাকে প্লে স্টেশন কিনে দেয়। আমার ছেলে একটা জিনিস চেয়েছে আর আমি তা দেব না তা কি হয়?
পনেরো বছর পর,
ভারি বাজারের ব্যাগটা বয়ে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে মিথিলার। বয়স বেড়েছে, সেই সাথে অর্থনৈতিক দুরবস্থা, দুঃশ্চিন্তার পাশাপাশি বিভিন্ন রোগেও আক্রান্ত হয়েছে সে।
মিথিলাদের এখন আর আগের মতো অর্থ-বিত্ত নেই। মিথিলার স্বামী রিহান বেশ কয়েকবার ব্যবসায় লস খেয়েছে। অতিরিক্ত খরুচে স্বভাবের কারণে ব্যাংক ব্যালেন্সও তেমন ছিল না তাদের। বাড়িটা রেখে বাকি সম্পত্তি বিক্রি করতে হয়েছে দেনা পরিশোধ করতে। বর্তমানে রিহান ছোটো একটা ব্যবসা দাঁড় করেছে। সেখান থেকে প্রাপ্ত আয়ে মাস শেষে তাই একটু টানাটানিতেই পড়তে হয়।
আজ মাসের শেষ সপ্তাহে মিথিলার হাত প্রায় খালিই ছিল। কিন্তু নিত্য-প্রয়োজনীয় কিছু সদাইপাতি না কিনলেও চলছিল না। অতঃপর কয়টা টাকা বাঁচাতে রিক্সা না নিয়ে হেঁটেই বাড়ি ফিরছিল মিথিলা। কিন্তু দুপুরের কড়া রোদে মাথাটা ঘুরে উঠতেই ফুটপাতে বসে পড়ল।
– কী হয়েছে আন্টি আপনার? শরীর খারাপ লাগছে?
মিথিলা চোখ তুলে দেখল শান্ত দাঁড়িয়ে আছে। হাতে অ্যাপ্রোণ-স্টেথোস্কোপ, চোখে-মুখে নির্ভেজাল উৎকন্ঠা।
– তেমন কিছু না, বাবা। এই একটু মাথাটা ঘুরে উঠেছিল।
– আন্টি আপনার বাজারের ব্যাগ আমাকে দিন। আমি পৌঁছে দিচ্ছি।
– তোমার ক্লাসে দেরি হবে না?
– লাইব্রেরীতে যাওয়ার জন্য একটু আগেই বের হয়েছিলাম। সমস্যা হবে না।
মিথিলাকে একদম বাসায় পৌঁছে দিয়ে তবেই ফিরে গেল শান্ত।
মিথিলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ছোটোবেলা থেকেই ভীষণ ভদ্র, নম্র ছেলে শান্ত। ওর জন্য ওর মা-বাবা কখনও প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ করেনি। এখন সে ঢাকা মেডিকেলে পড়ছে। বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে ক্লাস নিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচের অনেকটাই নিজে ম্যানেজ করে।
অথচ মিথুন জেদ করে কোনো পাবলিক ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষাই দেয়নি। তার একটাই কথা ছিল দেশসেরা প্রাইভেট ভার্সিটিতে ভর্তি না করালে সে লেখাপড়াই করবে না। তখন অবস্থা ভালো ছিল বলে মিথিলা-রিহানও সহজেই মেনে নিয়েছিল। কিন্তু এখন ছেলের ভার্সিটির খরচ সামলাতে রীতিমত হিমশিম খেতে হয়। তাও যদি ঠিকমতো পড়াশোনা করত তাহলেও হতো। সারাদিন সে আড্ডাবাজি করে বেড়ায়।
– মম, তুমি কিন্তু প্রমিস করেছিলে এবার জন্মদিনে আইফোন কিনে দেবে। এখন কিনে না দিলে চলবে না। আমার বন্ধুদের বলে ফেলেছি। এখন ওদের সামনে যেতে পারি না। আমি কিন্তু কোনো অযুহাত শুনব না।
রাতে বাসায় ঢুকেই বেশ জোরে কথাগুলো বলল মিথুন।
– তোর বাবার ব্যবসা আগের মতো যাচ্ছে না। তার উপর তোর ভার্সিটির কত খরচ! দুই মাস আগেই ল্যাপটপ কিনেছিস। এখন আবার আইফোন! রোজরোজ এত বায়না কেমন করে পূরণ করব?
– দিতে পারবে না যখন তখন কথা দিয়েছিলে কেন?
আরও কিছুক্ষণ বাক-বিতন্ডার পরে রুমে ঢুকে শব্দ করে দরজা লাগিয়ে দিল মিথুন। রাতে আর বেরই হলো না রুম থেকে। পরদিন সকালেও যখন দরজা খুলছিল না তখন দরজা ভেঙে দেখা গেল হাই ডোজের ড্রাগ নিয়ে ততক্ষণে অন্য জগতে সে পাড়ি জমিয়েছে।
রিহান পুত্রশোকে মাইল্ড স্ট্রোক করে হাসপাতালে ভর্তি হলো। প্রতিবেশী এবং ছেলের বন্ধুর মাকে স্বান্তনা দিতে অনেকদিন পরে হিমেল আসল মিথিলার বাসায়। অনেক বছর আগে হিমেলের নিয়ে আসা জন্মদিনের উপহার দেখিয়ে সবার সামনেই হিমেলকে উপহাস করেছিল মিথিলা। তারপর থেকে হিমেল আর আসেনি এ বাসায়। আজ হিমেলকে দেখে মিথিলা তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল। বারবার শুধু একটা কথাই সে বলছে,
– ছোটোবেলা থেকেই যা চেয়েছে তাই ওঁকে দিয়েছি, জীবনের সুবিধা-অসুবিধাগুলো কখনও বুঝতে দেইনি। সেটাই আমার চরম ভুল হয়েছে। সামান্য ফোনের জন্য ছেলেটা সুইসাইড করল। মা-বাবার কথা একটাবার ভাবল না। নিজের পেটের সন্তানকে নিজে চিনতে ভুল করেছি। কবে থেকে যে ছেলেটা বিপথে গেছে, নেশায় ডুবেছে মা হয়ে বুঝতেই পারিনি। সবার সাথে আমি অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি। আজ তার শাস্তি পাচ্ছি।
স্বান্তনা দেওয়ার কোনো ভাষা খুঁজে পেল না হিমেল। একটা সময় মিথিলার কথা ও আচরণে হিমেল অনেক কষ্ট পেয়েছে। অর্থের দম্ভে মিথিলা তার ছেলেকেও বরাবর উস্কে দিয়েছে। আশেপাশের সবার মাঝে নিজেদের অর্থ-প্রতিপত্তি জাহির করতে চেষ্টা করেছে, ছোটো করেছে বাকি সবাইকে। তাদের নিজেদের দম্ভের অজগর তাদেরকেই ধীরে ধীরে গিলে খেয়েছে।
যদিও আজকে ওদের যে পরিণতি তা হিমেল কখনোই চায়নি। তবুও প্রকৃতির বিচার কাউকে ছাড় দেয় না। সবাইকেই যার যার কর্মফল ভোগ করতেই হয়।
( সমাপ্ত)
গল্প- দম্ভ "
লেখা- তুনা ফেরদৌস
৫৩
৯১ মন্তব্য