মানব ইতিহাসের সবটা সংরক্ষণ করা যায় নি। এর বহুবিধ কারণ রয়েছে, সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে কেউ কেউ সবটা তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। তবে সেখানে ইসলামের ইতিহাস এতোটা বিস্তৃতভাবে দেখানো হয়নি। এইচ জি ওয়েলসের বহুল আলোচিত গ্রন্থ "পৃথিবীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস " পড়লে আমরা যে কোরআন অনুযায়ী পৃথিবীকে জানি তার ছিটেফোঁটাও নেই। বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর লিখিত বিশাল আকৃতির অটোবায়োগ্রাফি "GLIMPSES OF WORLD HISTORY " বই যা তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে পত্রাকারে লিখেছিলেন, সে বইয়ের কোথাও সেমেটিক জাতির কথা নেই। ইতিহাস লেখক ফিলিপ হিট্টি, মাইকেল মূর পর্যন্ত নবিদের কাহিনি উল্লেখ করেননি।
আমাদের মানব ইতিহাসের সবটা জানার জন্য কোরআন আমাদের সহায়তা করেছে। প্রাচীন যুগের একটা চিত্র কোরআনের মাধ্যমে জানা যায়। সেমেটিক, হিব্রু জাতির কথা এই গ্রন্থটি আমাদের বলে। পৃথিবী গড়ার সম্মক ইতিহাস গ্রন্থটিতে রয়েছে। মিশরে কীভাবে শ্রমিকদের কাজ করানো হতো, কীভাবে নীলনদ কৃষিভূমিকে উর্বর করেছে, কীভাবে দ্বিতীয় নেমেসিস শিল্পচর্চা করতেন, কীভাবে ইব্রাহিম নবি একত্ববাদের শিক্ষা দিতেন, কীভাবে মুসা নবি শিরকের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, কীভাবে ঈসা নবি মানুষকে এক সুতোয় বেঁধেছিলেন এসব ইতিহাস প্রচলিত ইতিহাস গ্রন্থগুলোতে নেই।
বিশ্বের প্রতিপালক মানুষের প্রতি রহম করেছেন মানুষ নবি, প্রতিনিধি পাঠিয়ে। যুগে যুগে নানা নবি,রাসূল এসেছেন। তাদের প্রধান কাজ ছিলো আকাশের প্রতিপালকের রাজ্যসীমা, একত্ববাদ বিস্তার করা। এটা করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে দমে যাননি প্রতিনিধিরা। এই প্রতিনিধিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন হযরত মুহম্মদ (স)। তিনি মানুষের নবি, মানুষ নবি। তাঁর জন্ম, তাঁর কর্ম, অবস্থান নিয়ে ইতিহাস লেখকদের মধ্যে দ্বিমত নেই। আর এটা ইসলাম ও মুসলমানদের জন্যে স্বস্তির বিষয়। বিশ্বের অন্যসব ধর্মের অবতার কিংবা ধর্ম প্রচারকদের ইতিহাস সংরক্ষণ করা হয়নি বা তাদের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে আমরা অবগত নই।
হযরত মুহম্মদ (স) এর জন্ম ৫৭০ কিংবা ৫৭১ খ্রিস্টাব্দে মক্কায়। তাঁর মৃত্যু ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায়। ৬৩ বছরের ঘটনাবহুল জীবনী প্রথম লিখেন ইবনে ইসহাক। উনি একজন সিরাত লেখক। আরবদের মধ্যে তাঁর পরিবার কুনিয়াত লেখায় পারদর্শী ছিলেন। ইবনে ইসহাক জন্মেছিলেন নবির মৃত্যুর ৭২ বছর পরে অর্থাৎ ৭০৪ খ্রিস্টাব্দে। অর্থাৎ মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স) এর মৃত্যুর এক শতাব্দীর কাছাকাছি সময়ে ইবনে ইসহাক "সিরাতে রাসূলুল্লাহ(স) লিখেছেন। তবে দু:খের বিষয় তাঁর সিরাত গ্রন্থটি পুরোপুরি সংরক্ষণ করা যায়নি। তাঁর অন্যতম শিষ্য ইবনে হিসাম পরবর্তীতে চার খণ্ডে " সিরাতুন্নবী" লিখেন।ইবনে ইসহাকের বইয়ের লুপ্ত কিছু অংশ উদ্ধার করেন ইতিহাসবিদ আল তাবারি। আলফ্রেড গিয়োম এই সিরাতের ইংরেজি ভাষান্তর করেন। সিরাতে রাসুলুল্লাহ (স) বইটির প্রথম অনুবাদ বেরোয় জার্মানিতে ১৮৬৪ সালে, হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গুস্তাভ ভেইলের হাতে।
সিরাতে ইবনে হিশাম ও সিরাতে ইবনে ইসহাক অবলম্বনে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ডজনখানেক সিরাতগ্রন্থ লেখা হয়েছে। তাঁর জীবনী নিয়ে এতোবেশি আলোচনা, গবেষণা হয়েছে যে পৃথিবীর কোনো মানুষকে নিয়ে এতো বেশি আলোচনা হয়নি। নবি মুহাম্মদ (স) কে নিয়ে গবেষণামূলক যে সিরাতগ্রন্থগুলো লেখা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো, মুহাম্মদ ইবনে উমর আল-ওয়াকিদীর 'কিতাবুল মগাযী', ইবনে সা'দের 'আৎ -তবাকাতুল কুররা'', আল্লামা হাফিজ ইবন কাইয়িম রচিত " যাদুল মায়াদ"(২ খণ্ডে) আল্লামা বালাজুরির" ফতহুল বুলদান", ইবনে কাসির রচিত " আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া (১৪ খণ্ড) ড. স্প্রেঙ্গার রচিত 'মুহম্মদ', ওয়াশিংটন আয়ারভিং রচিত 'দি লাইফ অব মুহাম্মদ ', সৈয়দ আমীর আলীর " স্প্রিরিট অব ইসলাম ", উর্দু ভাষার রচিত মাওলানা শিবলী নোমানির " সিরাতুন্নবি(স), সৈয়দ সুলতানের " নবি বংশ', 'রসুল বিজয়', আল্লামা শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভীর "মাদারিজুন নুবুওয়াত" (২ খণ্ডে),। মাওলানা আবুল কালাম আজাদের " রাসুলে রহমত", কবি গোলাম মোস্তফা রচিত "বিশ্বনবী " মাওলানা সফিউর রহমান মোবারকপুরী রচিত " আর রাহীকুল মাখতুম", রেইনড্রপ প্রকাশিত "সীরাহ (দুই খণ্ড) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
মানুষের নবিকে জানতে কোরআনই যথেষ্ট। কারণ কোরআনের আক্ষরিক প্রতিচ্ছবি হলেন হযরত মুহম্মদ (স)। তবুও তাঁকে জানতে উপরে বইগুলোর সহায়তা নেয়া যেতে পারে। এর কারণ সিরাত আর মিলাদ এক নয়। নবির জন্মের ইতিহাস, তাঁর কর্ম, তাঁর বিশাল মক্কী ও মাদানী জিন্দেগী জানার জন্য ইতিহাসের আশ্রয়ে যেতেই হবে। ঠিক কোন পরিস্থিতিতে তিনি ধর্ম প্রচার করেছেন, তখনকার সামাজিক -রাজনৈতিক অবস্থা সবটা জানা জরুরি। একটা মানুষ কি করে একটা রাষ্ট্র নির্মাণ করলেন যেখানে মানুষে -মানুষে ভেদাভেদ ছিলো না, মানুষের মাঝে সাম্য ছিলো। মানুষের অধিকার তিনি কীভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার সবটা জানার জন্য ইতিহাসের আশ্রয়ে যেতেই হবে।
নবি মুহম্মদ মানুষের সন্তান। আরবের একটা সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম।জন্মের আগে যার বাবা মারা যায়। অনাথ, এতিম একটা শিশু কি করে, কোন মন্ত্রবলে তখনকার বিশ্বের ক্ষমতারধর সাম্রাজ্য কিসরা,পারস্য, রোম, আবিসিনিয়া জয় করেছিলেন সে এক পরম বিস্ময়। নবি মুহম্মদের কোনো সামরিক প্রশিক্ষণ ছিলো না, তাঁর ছিলো না কোনো বিশাল অশ্বারোহী বাহিনী, বিশাল সম্পদশালী ছিলেন না। তাঁর যে সম্পদ ছিলো সেটা হলো মহাবিশ্বের পালনকর্তার উপর একনিষ্ঠ বিশ্বাস, ভরসা। যার কারণে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বহুল আলোচিত এবং মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সফল রাষ্ট্রনায়ক।
৭১
১৪৫ মন্তব্য