সহকারী অধ্যাপক
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০৬:২৯ অপরাহ্ণ
সহকারী অধ্যাপক
স্বপ্নের দেশ কোরিয়ায় যাত্রা: কুরিয়ার অভিজ্ঞতা
সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ, সকাল ১০টায় আমরা ২০ জন হাজির হলাম হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। বিমানবন্দরের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত মনোরম। ১৩.১৫ মিনিটে আমরা থাই এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে ব্যাংকক Suvarnabhumi আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালাম, যেখানে থাইল্যান্ডের স্থানীয় সময় ছিল ১৭.০০।
Suvarnabhumi বিমানবন্দর ছিল অত্যন্ত সুন্দর এবং গোছানো, যা ব্যাংককের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিত। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর, যার স্থাপত্যশৈলী এবং পরিষেবাগুলো বেশ প্রশংসনীয়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার জন্য আমরা এখানে বিমানবন্দরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখার সুযোগ পাই।
পরবর্তী ফ্লাইট ছিল কোরিয়ান এয়ারলাইন্সের, রাত ২১.৪০ মিনিটে। আমাদের গন্তব্য ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার Incheon আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রায় ৬ ঘণ্টার ফ্লাইট শেষে আমরা অবতরণ করি Incheon International Terminal 2-এ, যা কোরিয়ার অন্যতম বৃহত্তম ও আধুনিক বিমানবন্দর। বিশ্বমানের সেবার জন্য পরিচিত এই বিমানবন্দরটি দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম ব্যস্ত কেন্দ্র এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও পরিষেবার মিশেলে ভ্রমণকারীদের জন্য একটি অনন্য অভিজ্ঞতা প্রদান করে।
আগে থেকে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন দেগু মেট্রোপলিটন অফিস অব এডুকেশনের দুজন কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশি প্রতিনিধি দীপ্ত বিশ্বাস।
কোরিয়ার ইনচন বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর, আমাদের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন দেগু মেট্রোপলিটন অফিস অব এডুকেশন-এর কর্মকর্তারা—কিম হানসু, সং ইউ ডংউক এবং আমাদের বাংলাদেশী গাইড দীপ্ত বিশ্বাস। সকাল ৭টায় বিমানবন্দরের একটি ফ্রেঞ্চ রেস্টুরেন্টে নাস্তা সেরে যখন বাইরে আসলাম, তখন দেখি আমাদের এলাকার প্রিয় জসিম ভাই উপস্থিত। দীর্ঘ ৩০-৩১ বছর পর তার সাথে পুনর্মিলন হলো, এবং তিনি আমাদের জন্য একটি উপহারও নিয়ে এসেছিলেন।
নাস্তার পর, গাইড দীপ্ত বিশ্বাস আমাদের দিনটির সিডিউল সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি জানান, আজ আমরা শিউল শহরের দুটি ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন করব। দুপুরের খাবার শেষ করে, শিউল থেকে দেগু যাওয়ার পথে প্রায় ৫ ঘণ্টার যাত্রা হবে। আমাদের জন্য একটি ৫০ আসনের বিলাসবহুল গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেখানে মোবাইল চার্জিং ও কফি খাওয়ার সুবিধাও রয়েছে।
এটি ছিল আমাদের দিনের সূচনা—একদিকে ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ, অন্যদিকে স্মৃতির মোড়ানো এক পুনর্মিলন।
আমাদের দক্ষিণ কোরিয়া প্রথম পরিদর্শন ছিল Gyeongbokgung palace
Gyeongbokgung Palace (경복궁) দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে অবস্থিত সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদ। এটি কোরিয়ার **Joseon Dynasty** (1392-1910) এর সময় নির্মিত পাঁচটি প্রধান প্রাসাদের মধ্যে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রাসাদটি কোরিয়ার রাজকীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি, এবং স্থাপত্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
**Gyeongbokgung Palace এর ইতিহাস**
- **নির্মাণকাল**: Gyeongbokgung প্রাসাদটি ১৩৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যখন Joseon রাজবংশ তার রাজধানী হানিয়াং (বর্তমান সিউল) স্থানান্তর করে।
**আর্থিক উন্নতি এবং ক্ষতি** এটি বিভিন্ন সময়ে আগুনে পুড়ে যায় এবং ধ্বংস হয়, বিশেষ করে ১৫৯২ সালে জাপানি আক্রমণের সময়। তবে ১৮৬৭ সালে এটি নতুনভাবে পুনর্নির্মাণ করা হয়। এরপরেও জাপানের ঔপনিবেশিক শাসনের সময়, প্রাসাদের অনেক অংশ ধ্বংস বা পরিবর্তিত হয়েছিল।
- **পুনঃনির্মাণ**: কোরিয়ার স্বাধীনতার পরে, প্রাসাদটির কিছু অংশ পুনঃনির্মাণ করা হয় এবং ধীরে ধীরে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে এটিকে সংরক্ষণ করা হয়।
**প্রাসাদের স্থাপত্য ও প্রধান অংশ**:
1. **Geunjeongjeon Hall (근정전)**:
এটি Gyeongbokgung প্রাসাদের প্রধান এবং সবচেয়ে বড় হল, যেখানে রাজা আনুষ্ঠানিক সভা করতেন এবং বিদেশি অতিথিদের স্বাগত জানাতেন। এটি Joseon স্থাপত্যের অন্যতম সুন্দর উদাহরণ। এখানে রাজা সিংহাসনে বসতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিতেন।
2. **Gyeonghoeru Pavilion (경회루)**:
এটি প্রাসাদের পাশের একটি পুকুরের মাঝখানে অবস্থিত একটি উন্মুক্ত প্যাভিলিয়ন, যেখানে রাজা ও তার মন্ত্রীরা বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠান উদযাপন করতেন। এটি একটি সুন্দর স্থাপত্য এবং প্রকৃতির সাথে সংযোগস্থাপনকারী একটি জায়গা, যা প্রাসাদের সবচেয়ে চমৎকার অংশগুলির মধ্যে একটি।
3. **Hyangwonjeong Pavilion (향원정)**:
Hyangwonjeong একটি শান্ত প্যাভিলিয়ন, যা একটি ছোট দ্বীপে অবস্থিত এবং একটি কাঠের সেতু দিয়ে মূল প্রাসাদে সংযুক্ত। এটি রাজপরিবারের বিনোদনের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হত। এর মনোরম পরিবেশ এবং শান্ত জলাশয়টি পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত।
4. **Gangnyeongjeon Hall (강녕전)**:
এটি ছিল রাজা ও রাণীর ব্যক্তিগত আবাসস্থল। প্রাসাদের অন্যান্য অংশের তুলনায় এটি কিছুটা ব্যক্তিগত এবং ছোট আকারের হলেও এর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অনেক।
5. **Donggung এবং Jagyeongjeon**:
প্রাসাদে কিশোর বয়সের রাজকুমার ও রাজকুমারীদের বসবাসের জন্য বিশেষ ভবন নির্মিত হয়েছিল। Donggung এবং Jagyeongjeon সেই ধরনের ভবন, যা প্রাসাদের পূর্ব দিকে অবস্থিত।
**চলমান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ঐতিহাসিক পুনঃনির্মাণ**:
প্রাসাদটি কেবলমাত্র ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়, এটি একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক স্থানও। প্রতি বছর এখানে পর্যটকদের জন্য নানা রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী এবং ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানের পুনঃনির্মাণ করা হয়, যেমন রাজকীয় গার্ডের পরিবর্তন অনুষ্ঠান (Changing of the Guard ceremony)।
**প্রাসাদের চারপাশের অন্যান্য আকর্ষণ**:
- **National Palace Museum of Korea**: এই জাদুঘরটি প্রাসাদের অভ্যন্তরে অবস্থিত এবং Joseon রাজবংশের বিভিন্ন রাজকীয় নিদর্শন সংরক্ষণ করা হয়।
**National Folk Museum of Korea**: এখানে কোরিয়ার ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ রয়েছে।
**পরিদর্শনের সময়**:
Gyeongbokgung Palace বছরের সব ঋতুতেই সুন্দর, তবে বসন্তে চেরি ফুল ফোটার সময় এবং শরতে রঙিন পাতার সময় এটি বিশেষভাবে মনোরম। এছাড়াও, ঐতিহ্যবাহী পোশাক "Hanbok" পরে প্রবেশ করলে পর্যটকদের জন্য প্রবেশ ফ্রি থাকে।
Gyeongbokgung Palace কেবল একটি প্রাসাদ নয়, এটি কোরিয়ার গৌরবময় ইতিহাস এবং সংস্কৃতির প্রতীক, যা কোরিয়ান স্থাপত্যের সৌন্দর্য এবং রাজপরিবারের ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।
**Mungyeong Saejae Provincial Park** দক্ষিণ কোরিয়ার একটি ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা পার্ক, যা Mungyeong শহরের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। পার্কটি কোরিয়ার ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি প্রাচীন Joseon Dynasty (1392-1910) এর সময় ব্যবহৃত একটি প্রধান পর্বতগামী পথ ছিল। পার্কের প্রধান আকর্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:
১. **ইতিহাসিক গুরুত্ব**:
Mungyeong Saejae ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বতগামী পথ যা দক্ষিণ কোরিয়ার সানমাকসান পর্বতমালার মধ্য দিয়ে যায়। এটি মূলত রাজধানী হানিয়াং (বর্তমানে সিউল) থেকে দক্ষিণের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে বুসান ও দেগু, পর্যন্ত সংযোগ স্থাপনের জন্য ব্যবহৃত হত। Joseon Dynasty এর সময় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বাণিজ্যিক পথ ছিল।
২. **Mungyeong Saejae Gate**:
পার্কের ভেতরে তিনটি ঐতিহাসিক প্রবেশদ্বার রয়েছে, যেগুলো পার্বত্য পথের অংশ ছিল। এই প্রবেশদ্বারগুলি ছিল প্রাচীনকালে সামরিক ও বাণিজ্যিক ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্মিত, এবং এগুলো এখন কোরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে গণ্য হয়।
- **১ম গেট (জুয়ামগুয়ান)**: এটি সবচেয়ে দক্ষিণের প্রবেশদ্বার এবং প্রথম যেখানে আগত পর্যটকরা প্রবেশ করে।
- **২য় গেট (জুসাংগুয়ান)**: এটি একটি মধ্যবর্তী প্রবেশদ্বার যা প্রাচীনকালে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল।
- **৩য় গেট (জুয়াংগুয়ান)**: এটি শেষ প্রবেশদ্বার এবং এই পথের শেষ স্টপ হিসেবে পরিচিত।
৩. **প্রাকৃতিক সৌন্দর্য**:
পার্কটি তার প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য বিখ্যাত। এখানে গ্রীষ্মে সবুজ গাছপালা এবং শরতে রঙিন পাতা দেখার জন্য অনেক পর্যটক আসে। এছাড়াও, পার্কটি বিভিন্ন পায়ে হাঁটার পথ, হাইকিং ট্রেইল এবং লেকের জন্য পরিচিত।
৪. **উন্নত পরিকাঠামো**:
এই পার্কে দর্শনার্থীদের জন্য বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে, যেমন ট্রেইলস, দর্শনীয় স্থান, বিশ্রামের জায়গা, এবং ঐতিহাসিক সাইনবোর্ড যা পর্যটকদের ঐতিহাসিক দিক সম্পর্কে ধারণা দেয়। এছাড়া এখানে বার্ষিক ভিত্তিতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও উৎসব আয়োজন করা হয়।
৫. **চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শুটিং লোকেশন**:
Mungyeong Saejae পার্কটি দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় নাটক এবং চলচ্চিত্রের শুটিং লোকেশন হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে ঐতিহাসিক নাটক ও সিনেমার দৃশ্যায়নের জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান।
**যাওয়ার সেরা সময়**:
Mungyeong Saejae Provincial Park সব ঋতুতেই সুন্দর, তবে শরতের সময় রঙিন পাতার কারণে এটি বিশেষভাবে মনোমুগ্ধকর। এছাড়া বসন্তেও ফুল ফোটা দেখে আসা যেতে পারে।
এটি ঐতিহাসিক এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মিশ্রণে ঘেরা একটি জায়গা, যা কোরিয়ার ইতিহাস এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে ইচ্ছুক যেকোনো পর্যটকের জন্য উপযুক্ত।
এইখানে ঘুরে দেখার পর, বিকেল ৫টায় রাতের খাবার সেরে আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম আমাদের জন্য নির্ধারিত হোটেল **Hotel Laonzena**, 73, Beomeocheon-ro, Suseong, Daegu, Korea-র উদ্দেশ্যে। প্রায় রাত ৯টায় হোটেলের লবিতে পৌঁছে গ্রুপ মিটিং এবং রুম বরাদ্দের কাজ সম্পন্ন হয়। আমি পেয়েছি রুম ১০০১, আর আমার রুমমেট হলেন ঢাকা কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক **ড. মোমিনুল ইসলাম স্যার**। তিনি অসম্ভব ভালো মনের একজন মানুষ, অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী, এবং অত্যন্ত মিশুক একজন শিক্ষক।
এভাবেই কোরিয়ায় কাটল আমাদের প্রথম দিন।
দ্বিতীয় দিনের গল্প আরেকদিন ---!
৭১
১৪৫ মন্তব্য