Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০৫:৩০ অপরাহ্ণ

কেবলই আলোচনা -ওমর ফারুক

" কেবলই আলোচনা "

ওমর ফারুক 


সাহিত্যের নানা শাখার মধ্যে আলোচনা - সমালোচনা যে শাখা হতে পারে এ ধারণা বাঙালির জন্মেছিল উনিশ শতকের দিকে। বলা হয়ে থাকে মোহিতলাল মজুমদার এ ধারাটি সচল করার কিছু কাজ করেছিলেন। তবে তা বেশিদূর এগোতে পারেনি। রজনী কান্ত "শনিবারের চিঠি " র মাধ্যমে আরও একটা চেষ্টা করেছিলেন, তবে সেগুলো সবই এখন মনে হবে ব্যক্তিগত চর্চা। শনিবারের চিঠিতে মোহিতলাল মজুমদার ছাড়াও কাজী নজরুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফা, রজনী কান্ত সেন প্রমুখ লিখতেন। বলা যায় রীতিমতো কবিদের যুদ্ধ হতো তাতে।


আলোচনা আর সমালোচনায় কিছু তফাৎ আছে। আমার কাজ সমালোচনা নয়। বাংলা সাহিত্যে ঈশ্বর গুপ্তের কবিতা কেউ পড়ত না। কারণ তাতে অশ্লীলতা রয়েছে। তিনি ব্যাঙ্গাত্মক, হাস্যরসাত্মক পয়ার লিখতেন। তবে তার সমগ্র রচনা অশ্লীলতার দোষে দুষ্ট নয়। এখন হয়েছে কি লোকে না পড়ে কোথাও পেয়ে কিছু অশ্লীলতা খুঁজে তাকে বয়কট করছে। তিনি যে সময় লিখেছেন, যে পরিবেশে লিখেছেন সেটা আমলে নিতে হবে। ব্রিটিশ যুগের একজন কবির দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন করাও অবান্তর। ব্রিটিশ শাসককে উদ্দ্যেশ করে কবি বলেছিলেন, 


তুমি মা কল্পতরু

আমরা সব পোষ্য গরু।


সে সময়ের সামাজিক অবস্থার কথা বিবেচনায় নিয়ে তিনি বলেছিলেন, 


রেতে মশা, দিনে মাছি

এই নিয়ে কলকেতে আছি।


 তারপর সমালোচনায় আটকে গেলেন বঙ্কিমচন্দ্র। তাকে নিয়ে সমালোচনার শেষ নেই। তার রচনাকে সম্প্রদায়ের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। কপালকুণ্ডলা, আনন্দমঠ, দুর্গেশনন্দিনীসহ নানা সাহিত্যকর্ম সাম্প্রদায়িক বিবেচনায় পড়া হয় না। সমাজের সবার তিনি নন। তবে তিনি সাম্প্রদায়িক ছিলেন, তিনি অতিবেশি সাম্প্রদায়িক ছিলেন এটাই বাস্তবতা। আহমদ ছফার "ফেরারি বঙ্কিম " পড়লে কিছুটা আঁচ করা যাবে। উনিশ শতকে যারা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যের মুসলিম ছাত্র ছিলেন তাদের সংগৃহীত বঙ্কিমচন্দ্রের বইতে নানা গালাগাল লেখা থাকত। বঙ্কিম চন্দ্রের মত হিন্দু সাহিত্যিকেরা মুসলমানদের যবন, শ্লেষ বলে কটাক্ষ করতেন। তারা মুসলমানদের বিজাতীয়, ভীনদেশী বলেই মনে করতেন।


বঙ্কিমচন্দ্র গত হলে সবটা আলোচনায় উঠে আসেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি শুধু বড় কবি নন, বড় মানুষও বটে। জমিদার মানুষ। বাঙালি, ইন্ডিয়ান হলেও তার বেড়ে ওঠা কলোনিয়াল শাসনে। তিনি জাতীয়তায় অবশ্যই ব্রিটিশ। এর কারণ তখনও মহারানী ভিক্টোরিয়ার শাসন ভারতবর্ষে বলবৎ ছিলো। রবীন্দ্রনাথ জমিদার মানুষ। জমিদারির প্রয়োজনে পূর্ববঙ্গে নানা সময় এসেছেন, থেকেছেন। তার নানা রচনা এই পূর্ববঙ্গে। এ দেশের মাটি, মানুষ তার অপরিচিত নয়। তিনি কবি। নানা দেশের সুর তার জানা। তিনি জানেন সাহিত্যের সুর একটাই। সে সুরে অন্য দেশের রচনা বাধা পড়বে, মিলবে এটাই স্বাভাবিক। তার বিরুদ্ধে রচনা নকল করার অভিযোগ আছে। আর এ অভিযোগ নতুন নয়। ১৯০৯ সাল পর্যন্ত তিনি কোন বড় কবি হিসেবে নাম-পরিচয় দাড় করাতে পারেননি। সে সময় অনেক সাহিত্যিক তাকে নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে লেখা লিখেছে। রবীন্দ্রনাথ তার দাদার স্মৃতি রক্ষার্থে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করেন।


সমালোচনা রবীন্দ্রনাথকে ছাড়েনি। পাকিস্তান আমলে তার গান-কবিতার উপর শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। রেডিওতে রবীন্দ্রনাথের গান বাজানো হতো না।কেবল রবীন্দ্রনাথ নয়, কাজী নজরুল ইসলামও বাদ যাননি। নজরুলের কবিতায় যেসব হিন্দুয়ানী শব্দ ছিলো সেগুলো বাদ দিয়ে নতুন করে লেখা হতো। সত্যি বলতে এ কাজে আইয়ুব খানকে সহায়তা করেছেন কবি গোলাম মোস্তফা। শোনা যায় মোনায়েম খান নাকি আব্দুল হাই স্যারকে বলেছিলেন, কি সব রবীন্দ্র সংগীত শোন।লিখতে পারো না। তখন হাই স্যার বলেছিলেন, সেটা ত রবীন্দ্র সংগীত হবে না, হবে হাই সংগীত। সত্যি বলতে কি এতো কিছুর পরও কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে বাদ দেয়া যায় নি। তার কবিতা, গান আমাদের পাঠ্যসূচিতে। হুমায়ুন আজাদ বলতেন, তাকে কোথা থেকে বাদ দিবেন সেটা আগে চিন্তা করুন। আসলেই ত কোথায় নেই তিনি।


রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে হাল আমলে তর্কটায় জল ঢেলেছেন আহমদ ছফার চেলা ড. সলিমুল্লাহ খান। ওনার জ্ঞানের পরিধি নিয়ে কারও প্রশ্ন নেই। কিন্তু তিনি আহমদ ছফাকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে অন্যদের ছোট করছেন এটা বুঝতে পারা যায় ওনার স্বাধীনতায় ব্যবসা , ছফা সঞ্জীবনী, বেহাত বিপ্লব, আদমবোমা পড়ে। ছফা ছেড়ে অনেকে সলিমুল্লাহ খানকে আদর্শ মানছেন। কিন্তু কিছুকাল আগে এদেরই আদর্শ ছিলেন আহমদ শরীফ, আর তাদের গুরু অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক। রবীন্দ্রনাথকে হালে যে সমালোচনা ডালপালা বেড়েছে সেটা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে একটা কমিটি কাজ করেছে।আর একটা দল তখন বড় লাটকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অপ্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করে বিভিন্ন সময় চিঠি লিখেছে। 


আসলে কবিদের দেশ নেই, কবিতার দেশ নেই। আল্লামা ইকবাল তার সেরা লেখাটা পাকিস্তানকে নিয়ে লিখেন নি।


 সারে যাহা ছে আচ্ছা, 

হিন্দুস্তান হামারা,হামারা


অনেকদিন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠিত হয়েছে। গতবছর ইকবালকে ঝেটিয়ে বিদায়ের সুর চাউর হয়।এভাবে সবকিছু বদলে ফেলা যায় না। রবীন্দ্রনাথের গান জাতীয় সংগীত হিসেবে লিখিত হয়নি। কবি গগন হরকরার সুর বাঁচিয়ে রাখতে এ গান লিখেছেন। এ গানে মাটির কথা আছে। এলিগরি আছে। কত দেশের নাম, রাজধানী, জাতীয় পতাকা, সংগীত কতকিছু বদলে গেছে। প্রয়োজন মনে হলে সেটা বদলে ফেলতে দোষ কি? তবে তার জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জরুরি। জনমত জরুরি। বিদেশি, ভীনদেশী আখ্যা দিয়ে তার সমগ্র রচনা কি বাদ দেয়া যাবে? 


মূল কথায় আসি, মানুষ চেতনায় ভাসছে। না পড়ে, না জেনে, অমুকে বলেছে, তমুকে বলেছে এই করে ত আর বাণিজ্য করা যায় না। রবীন্দ্রনাথকে প্রতিরোধ করতে হলে আরেক রবীন্দ্রনাথ দাড় করতে হবে। উনি যে ৩০ খণ্ডের রচনাবলি রেখে গেছেন সেগুলো পড়ুন। তাকে জানুন। তাকে ধারণ করা এক জীবনে সম্ভব নয়। রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের শেষ গল্পটি হলো "মুসলমানীর গল্প"। বলা হয়ে থাকে এটা তার লেখা শেষ গল্প। পড়ে দেখুন কি ইঙ্গিত করে গেছেন!

মন্তব্য করুন