Loading..

ব্লগ

রিসেট

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০৬:৩২ অপরাহ্ণ

শিক্ষার ভবিষ্যৎ: সংকটের গল্প ও সমাধানের খোঁজ

শিক্ষার ভবিষ্যৎ: সংকটের গল্প ও সমাধানের খোঁজ


শিক্ষা হলো জাতির মেরুদণ্ড—এই অমোঘ সত্যটি আমরা বহুবার শুনেছি। শিক্ষা যদি সঠিক পথে পরিচালিত না হয়, তবে জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। সুতরাং, সবার আগে শিক্ষা কমিশন গঠন করা জরুরি ছিল, কারণ এটি সঠিক শিক্ষানীতির মাধ্যমে জাতির অন্যান্য সমস্যা সমাধানে সহায়ক হতে পারত। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ইতিমধ্যে ছয়টি কমিশন গঠিত হয়েছে, কিন্তু শিক্ষা কমিশন নিয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ এখনো দেখা যায়নি। 


সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে লাইক, শেয়ার, আর কমেন্টস পাওয়া খুব সহজ। তবে, তরুণ শিক্ষকদের উদ্যেম এবং সমন্বিত উদ্যোগই পারে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে। কারণ, বাস্তবতা হলো—বয়স্ক শিক্ষকেরা অনেক ক্ষেত্রেই বিভিন্ন রঙ্গে রঙ্গিন, তাদের বেশিরভাগ নিজেদের স্বার্থের কথা ভাবেন। তাই, শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নতি করতে হলে, তরুণ শিক্ষকদের একজোট হয়ে কাজ করা প্রয়োজন।


সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজের এক সাক্ষাৎকারে দেখলাম তিনি তুলে ধরেছেন, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০—১৫ বছর; তারপরে ১৯৯১ থেকে ২০০৬—১৫ বছর; এবং ২০০৯ থেকে ২০২৪—আরও ১৫ বছর, এই তিনটি সময়সীমায় ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটেছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, আমাদের সম্মানিত শিক্ষক সমাজ গত ৫৩ বছরে শিক্ষাকে জাতীয়করণ বা স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে পারেননি। এর প্রধান কারণ হলো শিক্ষকদের মধ্যকার বিভক্তি। যখনই যে  সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারা শিক্ষকদের একটি গোষ্ঠীকে নিজেদের দোসর বানিয়ে নিয়েছে এবং তাদেরকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। আর ঐ নেতারাই ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন।


এখন সময় এসেছে বেসরকারি এবং সরকারি সকল স্তরের শিক্ষকদের জন্য একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার। শিক্ষকদের উচিত গভীরভাবে চিন্তা করা যে কিভাবে বেসরকারি শিক্ষাকে জাতীয়করণ এবং স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন সম্ভব। এ জন্য মাননীয় শিক্ষা উপদেষ্টার সাথে আলোচনা করতে হবে, মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার সাথে কথা বলতে হবে, এবং একটি শিক্ষা সংস্কার কমিশন অবশ্যই গঠন করতে হবে। 


ভবিষ্যতে যারা ক্ষমতায় যাবে, তারা নির্বাচনের আগে বলবে যে, "আমরা ক্ষমতায় গেলে সকল স্তরের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করব।" কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা বা তাদের ভবিষ্যৎ শিক্ষা মন্ত্রীরা কেন এখনই এই প্রস্তাবটি বর্তমান সরকারের কাছে উপস্থাপন করছেন না?

রাজনৈতিক দলসমূহ যদি এখনই বর্তমান সরকারের কাছে জোরালো দাবি তুলে ধরে, তাহলে এটি শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জাতীয়করণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। নির্বাচনের আগেই এই দাবি উত্থাপন করা মানে হবে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি একটি ইতিবাচক মনোভাব।


শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন হলে শিক্ষকদের জন্য একটি স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে, বেতন গ্রেড ৯ম থেকে শুরু হবে, না ৮ম থেকে? যেহেতু এটি একটি স্বতন্ত্র বেতন স্কেল হবে, তা শিক্ষকদের জন্য একটি নিশ্চিত ভবিষ্যৎ তৈরির পাশাপাশি তাদের মর্যাদা ও প্রেরণা বৃদ্ধি করবে। এছাড়া, উপজেলা থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর পর্যন্ত শিক্ষা প্রশাসন কিভাবে চলবে, এই বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিবে, শিক্ষা প্রশাসনের কাঠামো কেমন হবে, এবং এর পরিচালনার দায়িত্বে কারা থাকবে,  যেমন, এনসিটিবি, নায়েম, এবং অন্যান্য অধিদপ্তরগুলোর কার্যক্রম কিভাবে সমন্বয় হবে, সেসব বিষয়ও পরিষ্কার হবে। অর্থাৎ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থাগুলো কেমন চলবে সব কিছু নির্ধারণ করবে ।


বর্তমান সরকারের আমলে যদি এসব বিষয় নির্ধারণ করা না হয়, তাহলে কায়েমী স্বার্থবাদী শিক্ষক গোষ্ঠী তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষা করতে জাতির স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিবে, অতীত তাই বলে। তাই, শিক্ষাব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার জরুরি, যাতে করে শিক্ষক এবং ছাত্র—দু’পক্ষের স্বার্থ রক্ষা হয়। 


এখনই সময় বেসরকারি শিক্ষাকে জাতীয়করণের এবং শিক্ষা কমিশন গঠনের। শিক্ষক সমাজ, শিক্ষাকে যারা ভালোবাসেন, তারা সবাই মিলে সরকারের কাছে এই দাবিগুলি উত্থাপনের উপযুক্ত সময়। সরকারের কাছে এ বিষয়গুলো প্রস্তাব করার জন্য একটি সম্মিলিত আওয়াজ তুলতে হবে, যাতে তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে।


বর্তমানে কিছু গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে কাদা ছোড়াছুড়িতে লিপ্ত রয়েছে, যা শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের পথে অন্তরায়। এই ধরনের কার্যকলাপ দ্রুত বন্ধ করতে হবে, কারণ কাদা ছোড়াছুড়ি করে কোন লাভ হবে না। আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে যে, শিক্ষার উন্নয়নের জন্য সুস্থ আলোচনা ও সহযোগিতা প্রয়োজন। 


সম্মিলিতভাবে আমরা যদি আমাদের লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ করি, তাহলে আমাদের দাবিগুলো বাস্তবায়িত হতে সময় লাগবে না। শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের সুদৃঢ় পরিকল্পনা ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন, যাতে দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে আমরা সকলে অংশগ্রহণ করতে পারি।


গুণগত মানের শিক্ষা নিশ্চিত হলে রাষ্ট্রের নানা অনাচার, কুসংস্কার, এবং ধর্মান্ধতা স্বাভাবিকভাবেই দূর হবে বলে আশা করা যায়। পাশাপাশি, উদারতার প্রসার এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতিও বাস্তবায়িত হবে। এর জন্য বেসরকারি সকল স্তরের শিক্ষাকে জাতীয়করণ এবং একটি শক্তিশালী শিক্ষা কমিশন গঠন করা অত্যন্ত জরুরি।


জাতীয়করণের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থায় সমতা ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। এটি শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করার পাশাপাশি শিক্ষা সেক্টরে বৈষম্য ও অসমতা দূর করবে। শিক্ষা কমিশন গঠন করলে আমরা একটি সুসংগঠিত ও কার্যকর নীতিমালা তৈরি করতে পারব, যা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।


"বাজেট নাই" বলাটা আসলে এক ধরনের অজুহাত। বিগত সরকারগুলো কতগুলো অকাজে কোটি কোটি টাকা অপচয় করেছে—যেমন গণতন্ত্র রক্ষার নামে নির্বাচন, কৃত্রিম স্যাটেলাইটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বড়লোকী দেখানো, চট্টগ্রামের টানেল, এবং পদ্মার রেলসেতু—এসব প্রকল্প আসলে অনেক সময় জাতিকে পিছিয়ে দেয়।


এই লস প্রজেক্টগুলো বাস্তবায়নে প্রচুর টাকা ব্যয় হলেও তা দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনেনি, বরং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত এবং সমাজের মধ্যে বৈষম্য ও বিভাজন সৃষ্টি করেছে। বাজেটের অভাব আসলে সমস্যা নয়; মূল সমস্যা হল গোষ্ঠী বা কায়েমী স্বার্থের লোকজন, যারা এই পরিবর্তনগুলোর বিপক্ষে। তাদের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে, কারণ তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতেই বেশি আগ্রহী। 


যদি বিগত সরকারসমূহ সত্যিই শিক্ষা ও উন্নয়নের জন্য আন্তরিকতা দেখাত, তবে তারা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা ব্যবহার করে শিক্ষার উন্নয়নে গুরুত্ব দিত। আমাদের উচিত এখন থেকে সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করা, যাতে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়।


এখন সময় এসেছে সরকারি ও বেসরকারি সকল স্তরের শিক্ষকদের একজোট হয়ে ছাত্রজনতার সরকারের সাথে আলোচনা করার এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করার। আমাদের উচিত কোনো ধরনের হঠকারী পদক্ষেপ বা গোষ্ঠী বা দলীয় রাজনীতির ব্যানারে দাবি না করা। এ ধরনের কার্যকলাপ হলে ফলাফল হবে "যেই লাউ সেই কদুই।" 


মনে রাখতে হবে, আমরা সবাই শিক্ষক—তুমি কে, আমি কে—এই পরিচয়ের বাইরে আমাদের মূল লক্ষ্য শিক্ষার উন্নয়ন। আমাদের নেতৃত্ব নিতে হবে নিজেদের এবং একসাথে কাজ করে একটি শক্তিশালী ও কার্যকরী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এভাবেই আমরা শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি সাধন করতে পারব।

লেখক

মো: আবুল কালাম আজাদ 

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, নরসিংদী সদর, নরসিংদী।

মন্তব্য করুন

ব্লগ