প্রভাষক
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০৯:৩৬ পূর্বাহ্ণ
প্রভাষক
মানবিক, সামাজিক ও আর্থিকসহ নানা সংকটের মধ্যেও নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাতি গঠনে নিরলস ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন শিক্ষকরা। পূর্বের তুলনায় শিক্ষকতা পেশা এখন অনেকটা চ্যালেঞ্জিং। প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাচ্ছে বৈশি^ক প্রেক্ষাপট ততই পরিবর্তন হচ্ছে, সেই সাথে শিক্ষকদের সামনে চ্যালেঞ্জের পরিধিও বাড়ছে।
গ্লোবালিজমের এ যুগে একজন শিক্ষককে তাঁর শিক্ষার্থীদের তুলনায় অনেক বেশি তথ্য সমৃদ্ধ হতে হচ্ছে। তাঁকে মুখোমুখী হতে হচ্ছে নির্দিষ্ট বিষয়ের বাইরেও বহুমুখী প্রশ্নের। বিষয়টি চ্যালেঞ্জিং হলেও একজন আদর্শ শিক্ষকের জন্য তা অবশ্যই আনন্দের। তবে এক্ষেত্রে একজন শিক্ষককে আরো তথ্যসমৃদ্ধ হতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতার হাত সম্প্রসারণ করতে হবে। এক্ষেত্রে ‘ইনহাউজ ট্রেনিং’ বৃদ্ধির পাশাপাশি ইন্টারনেট সংযোগসহ কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে হবে। কারণ একজন শিক্ষক যত বেশি জানবেন তিনি ততবেশি জ্ঞান বিতরণ করতে পারবেন।
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. এ পি জে আবুল কালাম বলেছেন, ‘শিক্ষকরাই আলোকিত মানব সমাজ বিনির্মাণ করতে পারেন। তাই একজন শিক্ষককে হতে হবে সৃজনশীল মনের অধিকারী।’ কোনো জাতির মান নির্ভর করে সমাজের প্রতিটি নাগরিকের মানের উপর। আর নাগরিকের মান বহুলাংশে নির্ভর করে শিক্ষার মানের উপর, আর শিক্ষার মান সম্পূর্ণই নির্ভর করে শিক্ষকের যোগ্যতা ও গুণাবলীর উপর। আদর্শ শিক্ষকই জাতিকে উপহার দিতে পারেন- সৎ, যোগ্য, আদর্শ ও চরিত্রবান নাগরিক। মানব সন্তানকে মনুষ্যত্ববোধে জাগিয়ে তুলতে হয় একজন শিক্ষককে। এজন্য সকল স্তরের শিক্ষকদের করতে হয় অক্লান্ত পরিশ্রম। নরম কোমল হাতে চক-খড়ির মাধ্যমে শ্লেটে বর্ণ লিখতে শেখানো থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান দান করতে শিক্ষকদের অনেক বেশি কষ্ট ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী হতে হয়।
বলাবাহুল্য যে, মানসম্মত শিক্ষার মূল উপাদান হলো তিনটি। যেমন- মানসম্মত শিক্ষক, মানসম্মত শিক্ষা উপকরণ ও মানসম্মত শিক্ষা পরিবেশ। এই তিনটি উপাদানের মধ্যে শিক্ষকই একমাত্র নিয়ামক যার উপর অন্যান্য উপাদানের তথা শিক্ষার ভালো খারাপ দিক নির্ভর করে। এটা মানতেই হবে যে, শিক্ষকদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। শিক্ষকতার উদ্দেশ্য আয়-উপার্জনের অনেক উর্ধ্বে। পাশপাশি তাকে জ্ঞান আহরণের লক্ষ্যে সবসময় সচেষ্ট থাকতে হয়। শিক্ষীর্থীদের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও উপকরণ সরবরাহ করার ক্ষেত্রে শিক্ষকের অবদানের উপর অনেক কিছুই নির্ভর করে। এছাড়া শিক্ষককে হতে হয় দূরদর্শী জ্ঞান ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গী সম্পন্ন। শিক্ষক তাঁর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সাথে অভিযোজনে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করেন। শিক্ষা, উন্নয়ন, অর্থনীতি, রাজনীতি ও প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান বিকাশ সম্পর্কে তাঁকে সম্যক ধারণা রাখতে হয়। সেই জ্ঞান দিয়েই তিনি তাঁর শিক্ষার্থীদেরকে ভবিষ্যত পরিকল্পনা গ্রহণে সক্ষম করে তোলেন। একজন শিক্ষককে সবসময় পড়াশোনার মধ্যে থাকতে হয়। প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন জ্ঞানভা-ারে নিজেকে সমৃদ্ধ রাখেন একজন ভালো শিক্ষক। এছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চলমান প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিনি শিক্ষার্থীদের জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ করেন।
শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষক হবেন অনুকরণীয়। চিন্তা-চেতনায়, সহনশীলতায়, আত্মবিশ্বাসে, আন্তরিকতায় ও সহজগম্যতায় একজন শিক্ষককে বহু শিক্ষার্থী জীবনের আদর্শ হিসেবে বেছে নেয়। তাই শিক্ষার্থীদেরকে ভবিষ্যত সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষককে নিজেকে একজন রোল মডেল বা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করতে হয়। পাশাপাশি একজন শিক্ষককে একজন নেতার ভূমিকায় অবতীর্ন হতে হয়। বাস্তব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নানা পরিসরে একজন শিক্ষককে নেতৃত্ব দিতে হয়। সেই নেতৃত্বের দক্ষতা ও গুণ শিক্ষার্থীরা অর্জন করে শিক্ষকের কাছ থেকে। তাই শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বের ইতিবাচক গুণাবলি অর্জনের পথ তরান্বিত করার জন্য শিক্ষককে প্রগতিশীল মূল্যবোধ সৃষ্টিতে অত্যন্ত পারদর্শী হতে হয়। পাশাপাশি একজন শিক্ষককে শিখন প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীর সাথে মেলবন্ধন হিসেবে কাজ করতে হয়। তিনি নিজের সাথে শিক্ষার্থীদের এবং শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষার্থীদের মাঝে ত্রিমাত্রিক মেলবন্ধন রচনা করেন। এই মেলবন্ধনের ফলে শিক্ষার্থীরা কোনো সমস্যায় পড়লে সহজেই শিক্ষকের সাথে তা আলোচনা করতে পারে এবং উভয়ে মিলে সমাধানের একটি উত্তম পথ বের করতে সক্ষম হন।
শিক্ষক হচ্ছেন সভ্যতার ধারক-বাহক। শিক্ষক শুধু শিক্ষাদানই করেন না; তিনি মানুষ গড়ার কারিগরও। মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের সর্বপ্রথম বাণী ‘পড়! তোমার রবের নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন’। শিক্ষার গুরুত্ব যে কত অপরিসীম তা মহান আল্লাহ ঐশী গ্রন্থের মাধ্যমে মানব জাতিকে অবহিত করেছেন বহুকাল পূর্বে। প্রিয়নবী (দ.) বলেছেন- ‘আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে শিক্ষক হিসেবে’। রাসূল (দ.) হচ্ছেন মানব জাতির সর্বোত্তম শিক্ষক।
এখানে শিক্ষা ও শিক্ষক শব্দদ্বয় একটি অপরটির সঙ্গে ওতোপ্রতভাবে জড়িত। শিক্ষাগ্রহণ করতে হলে শিক্ষক প্রয়োজন। নৈতিক মূল্যেবোধসম্পন্ন শিক্ষক ও শিক্ষাই পারে একজন মানুষকে সঠিক ও সুন্দর পথ দেখাতে। এজন্যই প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করতে হলে প্রকৃত খোদাভীরু, আদর্শ ও নৈতিকতাধারী শিক্ষকের বিকল্প নেই। শিক্ষার লক্ষ্য হলো ভালো মানুষ তৈরি করা। শিক্ষক নিজে মানুষ হিসেবে কতটা আদর্শবান ও ভালো তাঁর ওপর নির্ভর করে শিক্ষার্থীরা ভালো মানুষ হয়ে উঠবে কিনা। শিক্ষকতার পেশায় নৈতিকতা খুবই জরুরি। নীতি-নৈতিকতা বোধ জাগ্রত না হলে কারো পক্ষে এ মহান পেশায় থাকা ঠিক নয়। আসলে ছাত্র ও শিক্ষকের সম্পর্কটা হলো আত্মিক। শিক্ষার্থীর মন ও আত্মার বিকাশ সাধনে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শিক্ষকতা পেশা ও বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজকে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার অঙ্গীকার নিয়ে এবছর (২০০৩ সাল) থেকে প্রতিবছরের ১৯ জানুয়ারি পালিত হবে ‘জাতীয় শিক্ষক দিবস’। এবছর দিবসটি উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী ডা দীপু মনি বলেন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য পরিকল্পনামাফিক এগোতে হবে। শিক্ষায় বড় সাফল্য রয়েছে। সেগুলো ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়াই একমাত্র লক্ষ্য। তিনি আরো বলেন, শিক্ষকতা কেবল একটি চাকরি নয়; এটি মানুষ গড়ার মহৎ কাজ। তাই এবিষয়ে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কেবল ভালো ফল নয়; সন্তানদের ভালো মানুষ হয়ে গড়ে ওঠা প্রত্যাশা করতে হবে।
শিক্ষক ও মা-বাবার অবদান অস্বীকার করে- এমন একজনকেও পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। মা-বাবা যেমন সন্তানদের ভালোবাসা, স্নেহ, মমতা দিয়ে বড় করেন; ঠিক তেমনি শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার আলো দিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ে দেয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করেন। স্নেহ, মমতা, ভালবাসা তো বটেই; তাঁদের শিক্ষার আলো যেমন শিক্ষার্থীদের সামনের পথ চলাকে সুদৃঢ় করে, তেমনি তাঁদের স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করে।
এসডিজির লক্ষ্যমাত্রাপূরণ এবং ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্ট অর্জনে শিক্ষক কেবল দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার কারিগরই নন; বরং অন্য সকল পেশারও মূল উৎস। মোমবাতি যেমন নিজে পুড়ে ছাই হয়ে অন্যকে আলোকিত করে, তেমনি শিক্ষকরাও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে নিজের জীবনের সুবর্ণ সময়গুলো বিনিয়োগ করে মানুষকে আলোকিত করেন এবং জাতিকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে তৈরি করেন। তার বিপরীতে শিক্ষক সমাজের একটিই চাওয়া- সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁদের অবদানের যথাযোগ্য স্বীকৃতি ও সম্মান। অথচ, পরিতাপের বিষয় হলো- বেসরকারি শিক্ষকদের বিভিন্ন দাবি আদায়ে রাজপথে লড়তে হচ্ছে। সুতারাং তাদের অধিকার আদায় এবং মর্যাদা ও স্বীকৃতি বৃদ্ধি পেলে তবেই এই মহান পেশাটি আগামী প্রজন্মের নিকট আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে এবং শিক্ষকরাও এতে আত্মনিবেদনে ব্রতী হতে উৎসাহী হবেন। আর নিবেদিত শিক্ষকই পারেন প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তোলে সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে। (12/03/2023)
১৪
২৪ মন্তব্য