Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ

অতঃপর বিশ্বের ইতিহাসে নতুন একটি নাম যোগ করলেন তিনি, ‘জুনকো তাবেই, প্রথম নারী ও ৩৬তম এভারেস্ট জয়ী।’

বোধহয় জ্ঞান হারাচ্ছেন...

কোনোমতে গলার কাছে বেঁধে রাখা পকেট ছুরিটা হ্যাঁচকা টানে বের করলেন। হাত বাড়িয়ে দিলেন বরফ ভেদ করে। জ্ঞান হারালেন তিনি।

জুনকোর শেরপা তাকে বরফের নিচ থেকে উদ্ধার করেন। জ্ঞান ফিরলো বটে কিন্তু পায়ের গোড়ালি তাকে একদমই সঙ্গ দিচ্ছে না। কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্রী নন তিনি। তাকে যে এভারেস্টের দর্প চূর্ণ করতেই হবে। অতঃপর বিশ্বের ইতিহাসে নতুন একটি নাম যোগ করলেন তিনি, ‘জুনকো তাবেই, প্রথম নারী ও ৩৬তম এভারেস্ট জয়ী।’

তার ভাষ্য- 

পাহাড় আমাকে অনেক শিখিয়েছে, আমি বুঝতে পেরেছি আমার ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো কতটা নগণ্য’-কথাটি জুনকো তাবেইর। পাহাড়ের সঙ্গে যার আত্মার আত্মীয়তা। এভারেস্টজয়ী বিশ্বের প্রথম নারী তিনি। প্রথম নারী হিসেবে সাত মহাদেশের সাত সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ আরোহণের অনন্য বিশ্ব রেকর্ডও তার দখলে। শুধু কি তাই, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জয় করেছেন বিশ্বের অন্তত ৭০টি দেশের সর্বোচ্চ চূড়া। 

১৯৩৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জাপানে জন্মগ্রহণ জুনকো তাবেই ছোটবেলায় ছিলেন খুবই দুর্বল প্রকৃতির। কে জানতো এ মেয়েটিই নিজের মধ্যে নিরন্তর প্রাণশক্তি তিনি লুকিয়ে রেখেছিলেন। ১৯৭৫ সালের মে মাসে প্রথমবারের মতো এভারেস্টকে নিয়ে আসেন নারীর পায়ের নিচে। সেটি করতে গিয়ে শুধু রক্ষণশীল সমাজের বাধার মুখেই পড়েননি, আক্ষরিক অর্থেই পড়েছিলেন মৃত্যুর মুখে। কিন্তু জুনকো তাবেইর অভিধানে যে বাতিল বলে কোনো শব্দ নেই! 

১৯৫৩ সালে স্যার এডমুন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগে যে রুট ধরে এভারেস্ট জয় করেছিলেন সে রাস্তাতেই ১৯৭৫ সালে যাত্রা শুরু করলেন তাবেই ও তার সঙ্গীরা। দিনটি ছিল ৪ মে, ঘড়ির কাটায় রাত ১২টা ৩০ মিনিট। সারা দিনের ক্লান্তিকর পদভ্রমণ শেষে অভিযাত্রীরা ঘুমিয়ে আছেন ২১ হাজার ৩২৬ ফুটের বরফ শীতল উচ্চতায় ক্যাম্প ২-এ। আচমকা দানবের মতো পাহাড় বেয়ে নেমে এলো তুষারের দল। জুনকো আর তার সঙ্গীরা ডুবে গেলেন বরফের নিচে। বেঁচে গেলেন শেষতক! 


এভারেস্ট জয়ের সময়টা কেমন ছিল? জুনকো তাবেইয়ের ভাষায়, ‘আমার সন্তানের বয়স তখন তিন বছরের কিছু বেশি, ওই সময়ে জাপানের সমাজে নারীদের ঘরের বাইরে যাওয়াই নিষেধ। তারা ঘরে রান্না করবে আর স্বামী-মেহমানদের চা এগিয়ে দেবে। এ তাদের কাজ। ভিনদেশের পাহাড়চূড়ায় উঠতে যাব শুনে ফুকুশিমা উপত্যকায় ঢি ঢি পড়ে গেল। পাড়া-প্রতিবেশীদের না হয় সামলানো গেল, কিন্তু এত ছোট্ট বাচ্চা রেখে কীভাবে যাব? আমার চার বোন ও স্বামী মাসানুভো তাবেই সাহস দিলেন। স্বামী নিজেও পাহাড়ে উঠতে পছন্দ করতেন। স্বামীর ভরসায় বোনের কাছে বাচ্চাকে রেখে রওনা হলাম এভারেস্ট প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে।’

২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ১২ দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন জুনকো। এক সাক্ষাৎকারে জুনকো সেই অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন, ‘বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড়চূড়া কেওক্রাডাং ওঠার সময় আমার ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা হয়েছে। পৃথিবীর খুব কম পাহাড়ি এলাকায় এত মানুষের বসতি আমি দেখেছি। 

পথে পথে অনেক আদিবাসীর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। আমার সঙ্গে তাদের অনেকের চেহারা মিল দেখে তারা আমাকে আরও বেশি আপন করে নিয়েছে।’ 

জুনকোর আরেক মুগ্ধতার নাম আমাদের সুন্দরবন। ‘সুন্দরবন আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে। আমি পাহাড় চষে বেড়ানো মানুষ। বনবাদাড় আমাকে খুব বেশি টানে না। কিন্তু সুন্দরবন দেখে মনে হয়েছে, এখানে আমাকে বারবার আসতে হবে। একমাত্র এ বনটি দেখে আমার মনে স্বাদ জেগেছে, শুধু পাহাড়চূড়া জয় না করে বনে বনে ঘুরে বেড়ালেও পারতাম। এ বনের শ্বাসমূল, জোয়ার-ভাটার খেলা, সূর্যডোবা-সূর্যোদয় বড়ই রহস্যময়। এ রহস্য এভারেস্ট চূড়ার চেয়েও কম নয়।’

২০১২ সালে তাবেইয়ের শরীরে ক্যান্সার ধরা পড়ে। আজীবন এ অভিযাত্রী তারপরও থেমে থাকেননি। ২০১৬ সালের ২০ অক্টোবর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যুক্ত ছিলেন সমাজসেবায়। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় আর পর্বতপ্রেমীদের জন্য উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবেন জুনকো তাবেই।


প্রথম নারী এভারেস্ট বিজয়ী জুনকো তাবেই!            


✍️ Satya Dam 

(সংগৃহীত ও পরিমার্জিত)

মন্তব্য করুন