Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০৯:২০ পূর্বাহ্ণ

তড়িৎ কোষ সম্পর্কে জানি

তড়িৎকোষ হল বহিঃস্থ সংযোগ সমন্বিত এক বা একাধিক তড়িৎ-রাসায়নিক কোষ দিয়ে গঠিত একটি বিশেষ যন্ত্র; যা ফ্ল্যাশলাইটমোবাইল ফোন এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো বৈদ্যুতিক যন্ত্রকে সচল রাখতে প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক শক্তি সরবরাহ করার জন্য ব্যবহৃত হয়। একে ইংরেজি পরিভাষায় সাধারণভাবে ব্যাটারি (Battery) বলে। যখন কোনও তড়িৎকোষ বৈদ্যুতিক শক্তি সরবরাহ করে, তখন এর ধনাত্মক প্রান্তটিকে ধনাত্মক তড়িৎদ্বার বা ক্যাথোড এবং এর ঋণাত্মক প্রান্তটিকে ঋণাত্মক তড়িৎদ্বার বা অ্যানোড বলে। ঋণাত্মক চিহ্নিত প্রান্তটি হল ইলেকট্রনের উৎস যেখান থেকে ইলেকট্রনগুলি বহিঃস্থ একটি বৈদ্যুতিক বর্তনী দিয়ে ধনাত্মক প্রান্তে প্রবাহিত হয়। যখন কোনও তড়িৎকোষ কোনও বাহ্যিক বৈদ্যুতিক ভার বা লোডের সাথে সংযুক্ত থাকে, তখন এর ভেতরে একটি জারণ-বিজারণ বিক্রিয়া উচ্চ-শক্তির বিক্রিয়ককে কম-শক্তিসম্পন্ন উৎপাদে রূপান্তর করে আর মুক্ত-শক্তির পার্থক্যটি বৈদ্যুতিক শক্তি হিসাবে বহিঃস্থ বর্তনীতে সরবরাহ করা হয়।  ঐতিহাসিকভাবে ইংরেজিতে "ব্যাটারি" শব্দটি দিয়ে নির্দিষ্টভাবে একাধিক তড়িৎ-রাসায়নিক কোষ দ্বারা গঠিত একটি যন্ত্রকে বোঝানো হয়, তবে প্রয়োগের বিবর্তনের কারণে "ব্যাটারি" শব্দটি দিয়ে একটি মাত্র তড়িৎ-রাসায়নিক কোষ দ্বারা গঠিত যন্ত্রকেও নির্দেশ করা হয়।[]

প্রাথমিক (একবার ব্যবহারযোগ্য বা "পরিত্যাজ্য") তড়িৎকোষগুলি একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়, কারণ এগুলির তড়িৎদ্বারের পদার্থগুলি ক্ষরণের সময় অপ্রতিবর্তনযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়; এর একটি সাধারণ উদাহরণ হল ফ্ল্যাশলাইটে ব্যবহৃত ক্ষারধর্মী তড়িৎকোষ এবং বহনযোগ্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রসমূহ। গৌণ (পুনর্ভরণযোগ্য) তড়িৎকোষগুলি বৈদ্যুতিক প্রবাহ ব্যবহার করে একাধিকবার ক্ষরণ এবং পুনর্ভরণ করা যায়; তড়িৎদ্বারগুলির প্রকৃত গঠন বিপরীত তড়িৎপ্রবাহের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা যায়। এর উদাহরণ হল যানবাহনে ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড তড়িৎকোষ এবং ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোনের মতো বহনযোগ্য ইলেকট্রনীয় যন্ত্রপাতিতে ব্যবহৃত লিথিয়াম-আয়ন তড়িৎকোষ

তড়িৎকোষ অনেক আকার ও আকৃতির হতে পারে। শ্রবণ সহায়ক যন্ত্র বা হাতঘড়ির জন্য ব্যবহৃত অতি ক্ষুদ্র তড়িৎকোষ থেকে শুরু করে স্মার্টফোনের জন্য ছোট ও পাতলা লিথিয়াম-আয়ন তড়িৎকোষ ও যানবাহনে ব্যবহৃত বৃহত সীসা অ্যাসিড তড়িৎকোষ বা লিথিয়াম-আয়ন তড়িৎকোষ থেকে একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ের, ঘরের সমান বিশাল তড়িৎকোষ ভাণ্ডার (ব্যাটারি ব্যাঙ্ক) রয়েছে, যা টেলিফোন এক্সচেঞ্জ এবং কম্পিউটার উপাত্ত কেন্দ্রগুলিকে সচল রাখতে বা জরুরী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে ব্যবহার করা হয়।

সাধারণ জ্বালানি যেমন পেট্রোলের তুলনায় ব্যাটারিতে বিশিষ্ট শক্তি (একক ভর প্রতি শক্তি) অনেক কম থাকে। তবে মোটরযানগুলিতে অন্তর্দহন ইঞ্জিনের তুলনায় বৈদ্যুতিক মোটরগুলি বৈদ্যুতিক শক্তিকে যান্ত্রিক কাজে রূপান্তরিত করতে উচ্চতর কর্মদক্ষতা প্রদর্শন করে বলে এই ঘাটতি কিছুটা পূরণ হয়।

ইতিহাস

[সম্পাদনা]
একটি ভোল্টায়িক পাইল, প্রথম তড়িৎকোষ
ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী আলেসান্দ্র ভোল্টা ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপোর্টে কে তার আবিষ্কৃত পাইলটি প্রদর্শন করছেন।

বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন "ব্যাটারি" শব্দটিকে একদল বৈদ্যুতিক যন্ত্রকে বোঝানোর ব্যবহার করেন। তিনি ১৭৪৮ সালে একাধিক লাইডেন জারকে সারিবন্দী কামান সাথে সাদৃশ্যের মাধ্যমে বর্ণনা করেন। (বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন "ব্যাটারি" পরিভাষাটি সামরিক বাহিনী থেকে নিয়েছিলেন, যেখানে এটি দিয়ে অনেকগুলি অস্ত্রের একসাথে কাজ করাকে নির্দেশ করা হয়।

ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী আলেসান্দ্রো ভোল্টা ১৮০০ সালে প্রথম তড়িৎরাসায়নিক কোষ বা ভোল্টার স্তুপ তৈরি ও বর্ণনা করেন। এটি ছিল তামা এবং দস্তার পাতের একটি স্তূপ, যা লবণ-জলের (ব্রাইন) দ্রবণে ভেজানো কাগজের চাকতি দ্বারা পৃথক করা থাকত এবং এটি যথেষ্ট সময়ের জন্য স্থির তড়িৎপ্রবাহ তৈরি করতে পারত। ভোল্টা বুঝতে পারেননি যে ভোল্টেজটি রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কারণে হয়েছিল। তিনি ভেবেছিলেন যে তার কোষগুলি অফুরন্ত শক্তির উৎস, এবং তড়িৎদ্বারগুলিতে ক্ষয়ের প্রভাব নিছক একটি উপদ্রব; অবশ্যই সেগুলির কার্যক্রমের একটি অনিবার্য পরিণতি, যেমনটি মাইকেল ফ্যারাডে ১৮৩৪ সালে দেখিয়েছিলেন।[]

যদিও প্রারম্ভিক সময়ের ব্যাটারিগুলি পরীক্ষামূলক কাজের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান ছিল, কিন্তু বাস্তবে তাদের ভোল্টেজ ওঠানামা করত এবং তারা অব্যাহত সময়ের জন্য বেশি তড়িৎপ্রবাহ সরবরাহ করতে পারত না। ১৮৩৬ সালে ব্রিটিশ রসায়নবিদ জন ফ্রেডেরিক ড্যানিয়েলের উদ্ভাবিত ড্যানিয়েল কোষটি শিল্পমানের হয়ে ওঠে এবং বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফ নেটওয়ার্কগুলির শক্তির উৎস হিসাবে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্যতা দেখা যাওয়ায় সেটি ছিল বিদ্যুতের প্রথম ব্যবহারিক উৎস। একটি কপার সালফেট দ্রবণে পরিপূর্ণ তামার পাত্র (যাতে সালফিউরিক অ্যাসিডে পূর্ণ একটি চিনামাটির পাত্রকে নিমজ্জিত করা হত) এবং একটি দস্তার তড়িৎদ্বার নিয়ে এটি গঠিত হত। []

এই আর্দ্র কোষগুলিতে তরল তড়িৎবিশ্লেষ্য পদার্থ ব্যবহার করা হত, যা সঠিকভাবে পরিচালনা না করলে সেগুলি ফুটো হয়ে ও ঝরার পড়ে যাওয়ার প্রবণতা ছিল। অনেকে তাদের উপাদানগুলি ধরে রাখতে কাঁচের পাত্র ব্যবহার করতেন, যা এগুলিকে ভঙ্গুর এবং ভীষণ বিপজ্জনক করে তুলেছিল। এই বৈশিষ্ট্যগুলি আর্দ্র কোষগুলিকে বহনযোগ্য যন্ত্রপাতিতে ব্যবহারের অনুপযোগী করে তোলে। উনিশ শতকের শেষের দিকে শুষ্ক কোষের ব্যাটারিগুলির আবিষ্কার হয়; যাতে তরল তড়িৎবিশ্লেষ্য পদার্থকে কাই এর মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করা হয় এবং এর ফলে বহনযোগ্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রগুলি ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে।

মন্তব্য করুন