সহকারী শিক্ষক
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০২:৫৭ অপরাহ্ণ
একা লাগে কেন? একাকিত্ব কেন ভালো লাগে না? |
কক্ষনো একা লাগেনি এমন কেউ কি আছেন? একা কমবেশি সবারই লাগে, এটা সার্বজনীন, মানবীয় এক অনুভূতি। তবে আমরা প্রায়ই একা থাকার সাথে একাকিত্বে ভোগা বা একা লাগাকে মিলিয়ে ফেলি। এ-দুটো কি এক?একাকিত্ব সারা পৃথিবী জুড়ে আজ মহামারীর রূপ নিচ্ছে। বৃটেনের এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সের মানুষদের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগই প্রায়ই একাকিত্বে ভোগেন। ২০১৮ সালে আমেরিকায় আরেক সার্ভে বলছে, ১৮ বছরের ওপরের প্রায় অর্ধেক মানুষ একাকিত্বে ভুগছেন। আত্মহত্যার প্রবণতা। গবেষকেরা দেখিয়েছেন খাবারের মতই সামাজিক সান্নিধ্যও একটি জৈবিক চাহিদা। বিচ্ছিন্নতা বা নিঃসঙ্গতা মানুষের মধ্যে ক্ষুধার মতই সামাজিক সম্পর্কের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবারের ছবি দেখালে যেমন তাদের মিড-ব্রেইন পুরস্কারের আশায় সক্রিয় হয়ে ওঠে, তেমনি সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন কাউকে হাস্যোজ্জ্বল মানুষের ছবি দেখালে তাদের মিডব্রেইন একইভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। একে নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার ডোপামিন, যা কোনো কিছু থেকে পুরস্কার পাওয়ার মত একটা খুশির অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।
আমাদের এই সমাজবদ্ধ জীবনযাপন সম্পূর্ণভাবে বদলে গেছে গত কয়েক শতাব্দীতে। একদিকে পুঁজিবাদের বিকাশ, শিল্প বিপ্লব, প্রযুক্তির উন্নতি, নগরায়ণ এবং অন্যদিকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং ব্যক্তি-অধিকারের উপর অত্যধিক গুরুত্বের ফলে আমরা এখন অনেক বেশি একা বাস করি। আমরা এখন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে বা শুধু বাবা-মা ছেলেমেয়ে নিয়ে বাস করি। খেলার মাঠ হারিয়ে গেছে, ছেলেমেয়েরা অন্যদের সাথে আড্ডা বা খেলাধুলোর চেয়ে ফ্ল্যাটে একা বসে ভিডিও গেম বা সোশ্যাল মিডিয়াতেই সময় কাটায়। মন খুলে মেলামেশা করা বা নিবিড়ভাবে আস্থার সম্পর্কগুলো আর গড়েই উঠছে না। অনেকে বিশেষজ্ঞই দেখিয়েছেন, উনিশ শতাব্দীর আগে মানবসমাজে একাকিত্বের এরকম প্রাদুর্ভাব ছিল না।
শুধু পাশ্চাত্যেই নয়, বাংলাদেশ, ভারত, চীনের মত দেশগুলোতেও এই একাকিত্ব ক্রমশ বেড়ে চলেছে। আমাদের একটা ভুল ধারণা যে, বয়স বাড়লে নিঃসঙ্গতা বাড়ে। অথচ আজ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই একাকিত্ব দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি। বিবিসির ২০১৮ সালে আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়ার মহাদেশের বিভিন্ন দেশে করা জরিপে দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীজুড়ে সব দেশেই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্রায় ৪০% একাকিত্বে ভুগছেন। জেনারেশন Z এবং মিলেনিয়ালদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে নিঃসঙ্গতার অনুভূতি এবং সেই সাথে বিষণ্ণতা, ভিডিও গেম বা মাদকের আসক্তি। এখানেই হয়তো আইরনিটা一আমরা এখন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে কানেক্টেড সময়ে বাস করছি, তারপরেও এত একাকিত্ব! এর কারণ কী? আমাদের একা লাগেই বা কেন? এর কি ঐতিহাসিক বা বিবর্তনীয় ভিত্তি বা প্রয়োজন আছে? একা থাকা এবং একাকিত্বের মধ্যে পার্থক্যই বা কী?
আজকে নিউরোসাইন্সের গবেষণায় নিয়োজিত জওশান আরা শাতিলের সাথে আমরা বোঝার চেষ্টা করব এই প্রশ্নগুলোর উত্তর। প্রথমেই দেখা যাক, একা থাকার সাথে একা লাগার পার্থক্যটা কোথায়। খুব সোজাভাবে বলতে গেলে, একা থাকার অর্থ হচ্ছে আপনি শারীরিকভাবে একা আছেন, অন্য মানুষের থেকে দূরে। অনেকেই কম বেশি একা থাকতে পছন্দও করেন। একা যদি না-লাগে তাহলে আপনি একাকিত্বে ভুগছেন না। অন্যদিকে একাকিত্বে ভোগাটা হচ্ছে একটি মানসিক অবস্থা, যখন কেউ একা লাগার কারণে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন বা অর্থপূর্ণ, গভীর সম্পর্কের অভাব বোধ করে। বহু মানুষের ভিড়েও হয়তো আস্থা রেখে মন খুলে কথা বলার, ভরসা করার বা ভালোবাসার কাউকে খুঁজে পায় না।
১
১ মন্তব্য