সহকারী শিক্ষক
০৩ অক্টোবর, ২০২৪ ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ড. মুহাম্মদ ইউনুসের বই “A World of Three Zeros” বা "৩ শুন্যের পৃথিবী" একটি ভিশনারি ধারণার বই, যেখানে তিনি বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যাগুলোর সমাধানে নতুন অর্থনৈতিক মডেল নিয়ে আলোকপাত করেছেন। বইটির মূল ফোকাস তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানের দিকে—দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং কার্বন নিঃসরণ। এই তিনটি সমস্যাকে সম্পূর্ণভাবে শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য তিনি সামাজিক ব্যবসা এবং উদ্যোক্তাবান্ধব অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রস্তাব দেন।
ড. ইউনুসের মতে, দারিদ্র্য একদিনেই দূর হবে না, কিন্তু তার সমাধান অবশ্যই সম্ভব। তার মতে, দারিদ্র্যের মূল কারণ হলো অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব এবং প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার অসামঞ্জস্য।
তিনি যে পদ্ধতি প্রস্তাব করেন তা হলো:
গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ড. ইউনুস ক্ষুদ্র ঋণের একটি সফল মডেল উপস্থাপন করেছেন। তার মতে, দরিদ্রদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাদেরকে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হলে দারিদ্র্য দূর হতে পারে। এই মডেলে নারীদের ক্ষমতায়ন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টির গুরুত্ব তিনি তুলে ধরেন।
সামাজিক ব্যবসার মূল লক্ষ্য সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করা, লাভ করা নয়। ড. ইউনুসের মতে, ব্যবসার মুনাফা নয়, বরং সামাজিক উন্নতি হতে হবে মূল উদ্দেশ্য। দারিদ্র্য দূর করতে, এমন ব্যবসাগুলো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উপকারে আসে এবং তাদের জীবনমান উন্নত করে।
ড. ইউনুস মনে করেন, প্রচলিত চাকরির ধারণাটি পরিবর্তন করতে হবে। তার মতে, প্রত্যেক মানুষই উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষমতা রাখে।
তিনি তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সামাজিক ব্যবসা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ দিলে, তারা নিজেরাই কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। এতে চাকরি প্রার্থী না হয়ে, চাকরি সৃষ্টিকারী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
ড. ইউনুস মনে করেন, প্রত্যেক মানুষ নিজস্ব উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে নিজের জীবনমান উন্নয়ন করতে পারে। ক্ষুদ্র ঋণ এবং বিনিয়োগের সুযোগ দিলে এই উদ্যোক্তা সংস্কৃতি গড়ে ওঠা সম্ভব, যা শেষ পর্যন্ত বেকারত্বের সমাধান দিতে পারে।
ড. ইউনুসের মতে, বর্তমান বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হলো জলবায়ু পরিবর্তন এবং কার্বন নিঃসরণ। তিনি পরিবেশগত সুরক্ষা এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য বিভিন্ন উপায় প্রস্তাব করেছেন।
নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, যেমন সৌরশক্তি, পवनশক্তি এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক উৎসের উপর নির্ভরশীল হতে হবে। তার মতে, সামাজিক ব্যবসাগুলো এই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নিতে পারে।
কার্বন নিঃসরণের শূন্যকরণ সম্ভব, যদি সামাজিক ব্যবসাগুলো পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল হয়। সামাজিক ব্যবসার মূলমন্ত্র হলো টেকসই উন্নয়ন, যেখানে পরিবেশের ক্ষতি না করে ব্যবসা পরিচালনা করা হয়।
ড. ইউনুসের সামাজিক ব্যবসার মডেল হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে:
- ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য হবে "সামাজিক সমস্যা সমাধান"।
- বিনিয়োগকারীরা তাদের প্রাথমিক বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাবে, কিন্তু লাভের অর্থ পুনঃবিনিয়োগ করা হবে ব্যবসার মাধ্যমে।
- লাভের লক্ষ্য নয়, বরং মানুষের কল্যাণ হবে এই ব্যবসার মূল লক্ষ্য।
এই মডেলটি বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার তুলনায় এক বিপ্লবী চিন্তাধারা। যেখানে বর্তমান ব্যবস্থায় মুনাফা সর্বোচ্চ লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে, ড. ইউনুস সেখানে মানবকল্যাণকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে নতুন ধরনের অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছেন।
ড. ইউনুসের এই তত্ত্ব বৈশ্বিক স্তরে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তবে, এর কার্যকারিতা নিয়ে কিছু বিতর্কও রয়েছে। মূলত:
- সামাজিক ব্যবসার মডেলটি কীভাবে সব ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে, তা নিয়ে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়।
- প্রচলিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং বড় বড় কর্পোরেশনগুলোর সাথে এই মডেলটি কীভাবে টেকসইভাবে প্রতিযোগিতা করবে, সেটিও একটি চ্যালেঞ্জ।
ড. ইউনুসের “৩ শুন্যের পৃথিবী” হলো একটি ভবিষ্যতপন্থী ধারণা যা দারিদ্র্য, বেকারত্ব, এবং পরিবেশের সমস্যাগুলোকে সমাধান করার জন্য একটি টেকসই এবং মানবিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রস্তাব করে। তার প্রস্তাবিত মডেলটি ব্যবসা এবং সমাজের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে পারে, যেখানে ব্যবসার উদ্দেশ্য হবে সামাজিক উন্নয়ন এবং পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা।
এই নতুন মডেল বিশ্বকে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শেখায় এবং একটি মানবিক, টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যতের জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে উঠতে পারে।
১৩
১৮ মন্তব্য