Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৪ অক্টোবর, ২০২৪ ১২:০৩ পূর্বাহ্ণ

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড ও বাস্তবতা

প্রাথমিক শিক্ষা। একটি জাতির ভবিষ্যৎ। বর্তমান পৃথিবীতে প্রাথমিক শিক্ষার বিকল্প কোনো কিছু নেই।


শিক্ষকগণের গ্রেড/জীবনমান উন্নয়ন প্রয়োজন কেন??

সম্পূর্ণটা পড়ার পর কমেন্ট করার অনুরোধ রইলো......


জার্মানিতে একবার ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারগণ আন্দোলন করছিলেন শিক্ষকগণের চেয়ে বেশি বেতন নেওয়ার জন্য। তৎকালীন চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল বলেছিলেন, যে শিক্ষকগণ আপনাদের পড়িয়েছে তাঁদের থেকে বেশি বেতন আপনাদের কিভাবে দিব.....


✅ যে দেশ শিক্ষাকে যত বেশি গুরুত্ব দিয়েছে সে দেশ ততই উন্নত হয়েছে। শিক্ষাকে বাদ দিয়ে একটা দেশের সার্বিক উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। আর শিক্ষার মূলভিত্তিই প্রাথমিক শিক্ষা। এই ডিপার্টমেন্টকে অন্ধকারে রেখে দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। আমাদের প্রয়োজন স্মার্ট ও মানসম্মত শিক্ষক। স্মার্ট শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার পাশাপাশি ম্যানার, নেতৃত্ব দেওয়া, সৃজনশীলতা, জীবন দক্ষতা শেখাবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। তার প্রথম ধাপ হচ্ছে শিক্ষকগণের জীবনমান তথা আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন করা যাতে সবচেয়ে মেধাবীরা এই পেশায় আসে। অথচ প্রাথমিকের শিক্ষকগণ তৃতীয় শেণির কর্মচারী! আর মাধ্যমিকের শিক্ষকগণের শুরুতে বেতন ১২,৫০০ টাকা, ভাবতে পারেন!!

✅ প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ক প্রথম সংস্কার হওয়া উচিত এর নিয়োগ পদ্ধতি পরিবর্তন করা। পিএসসি বা আলাদা কমিশনের মাধ্যমে প্রিলি, রিটেন, ভাইভার মাধ্যমে নিয়োগ সম্পন্ন করা। কোটা পদ্ধতির সংস্কার, নিয়োগ পদ্ধতির পরিবর্তন, প্রশ্নফাঁস ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে, করতেই হবে। স্বচ্ছ নিয়োগের মাধ্যেমে সবচেয়ে মেধাবীরা যেন এই পেশায় আসে রাষ্ট্রকে এটা নিশ্চিত করতে হবে।

✅ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকের জন্য বিভাগীয় পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হোক, যাঁরা পাশ করবে তাঁরা ১০ম গ্রেড পাবে। আমরা অনেকেই ভাবতেছি ১০ম গ্রেড হলে আগের এসএসসি পাশ করা শিক্ষকগণের বেতনও অনেক বেড়ে যাবে, কিন্তু এটা ভুল ধারনা। তাঁদের বেতন বাড়বে না কিন্তু এই পেশাটা আকর্ষণীয় হবে এবং অসংখ্য মেধাবী শিক্ষক আসবে। হয়তো এই ডিপার্টমেন্টের আমূল পরিবর্তন হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতই কারিকুলাম, একই পাঠ্যপুস্তক পড়ানো হয় পিটিআই সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ে এবং তাদের সহকারী শিক্ষকগণ ১০ম গ্রেড।

✅ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ১৬ গ্রেড থেকে ১০ম/৯ম গ্রেডে প্রমোশন হয়। আর সহকারী শিক্ষকগণ একই পদে ২০-২৫ বছর চাকরি করে, ভাবা যায়!! ইউনিয়ন সচিবও ১৩ গ্রেড ছিল কিন্তু তাদেরও ১০ম গ্রেড প্রায় হয়ে গেছে। এসএসসি/এইচএসসি পাশ কৃষি ডিপ্লোমা, নার্স ১০ম গ্রেড। এইচএসসি পাশ কনস্টেবল বিভাগীয় পরীক্ষা দিয়ে কয়েক ধাপে প্রমোশন পেয়ে এসআই (১০ম গ্রেড) হয়। প্রাথমিকের শিক্ষকগণের জন্যও বিভাগীয় পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হোক। পাশ করলে প্রমোশন পাবে, না করলে পাবে না।


কিছু প্রশ্নের উওর-

✅ এটিইও/টিইও কত গ্রেড: মাধ্যমিকের সহকারী শিক্ষা অফিসারগণ ১০ম গ্রেড, সহকারী শিক্ষকগণও ১০ম গ্রেড। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ৯ম গ্রেড, সিনিয়র সহকারী শিক্ষকগণও ৯ম গ্রেড। তাঁদের কোন সমস্যা না হলে প্রাথমিকের ক্ষেএে কেন সমস্যা হবে??

✅ শুধু এমসিকিউ: মাধ্যমিকের সহকারী শিক্ষকের (১০ম গ্রেড) অনেক নিয়োগ শুধু ২০০ নম্বরের এমসিকিউ + ভাইভা দিয়ে হয়েছে। স্পেশাল বিসিএসে (ডাক্তারদের/৯ম গ্রেড) শুধু এমসিকিউ, ভাইভা হয়েছে। তাহলে সেই ডাক্তারগণের কোয়ালিটি কি খারাপ বলবেন?? স্বায়ত্তশাসিত অনেক প্রতিষ্ঠানের ৯ম গ্রেডের নিয়োগ শুধু এমসিকিউ, ভাইভা দিয়ে হয়।

✅ এসএসসি পাশ শিক্ষক: একটা পরিসংখ্যান বলে রাখি- প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখন এসএসসি পাশ শিক্ষক আছেন মাএ ১১ হাজার এবং স্নাতক পাশ শিক্ষক আছেন ৩ লক্ষ ২০ হাজার। তাঁরা যদি যোগ্যই না হয়ে থাকেন তাহলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ভিত্তি গঠনের দায়িত্ব রাষ্ট্র কেন তাঁদের দিয়েছিল??

✅ কোটা: কোটার সংস্কার আমি নিজেও চাই কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চাকরি প্রার্থীদের অন্যতম কাঙ্ক্ষিত পরীক্ষা বিসিএসেও ৫৬% কোটা ছিল। তাহলে যারা কোটায় নিয়োগ পেয়েছে তাদেরকে কি বাদ দিবেন নাকি কোটা ব্যবস্থার সংস্কার করবেন??

✅ সারা বছর ছুটি আর ছুটি: প্রাথমিক বিদ্যালয় ভ্যাকেশনাল প্রতিষ্ঠান তাই অনেক ছুটি থাকে এবং সেজন্য অবসরের পর নন-ভ্যাকেশনাল প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের তুলনায় অনেক টাকা কম পেয়ে থাকেন।

✅ কিন্ডারগার্টেন স্কুল ভাল: সচেতন অভিভাবকরা বাচ্চাদের কিন্ডারগার্টেনে পাঠানোর প্রধান কারণ হচ্ছে সময়। দুপুরের মধ্যেই স্কুল শেষ হয়ে যায়- তাদের বাচ্চারা ঘুমাতে, খেলতে এবং প্রাইভেট পড়তে পারে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিম্নবিত্ত শিশুরা ওরকম সচেতন অভিভাবক পেলে অনেক ভাল করতো।

✅ রিডিং পড়তে পারে না: করোনার কারণে শিক্ষার্থীদের অনেক ক্ষতি হয়েছে যেটা গত ২-৩ বছরেও কাটিয়ে উঠতে পারি নি। এছাড়াও আমাদের অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে- একদম নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে যাদের পুষ্টির অভাব, অভিভাবকরা অসচেতন, বিভিন্ন কাজের সময়ে বাবা-মার সাথে কাজ করে... তবে আগামী ১-২ বছরের মধ্যেই অনেকটা উন্নতি হবে আশা করা যায়।

✅ অন্য চাকরিতে চলে যান: প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাকরি অনেকেই অনেক কারণে করে। কেউ অন্য চাকরি না হওয়াতে, কেউ বাড়িতে থেকে চাকরি করতে চায়, কারও বাবা মা অসুস্থ, কারও বাবা নাই শুধু মা আছে, কারও স্ত্রীও প্রাথমিকে চাকরি করে তাই, কারো অন্য ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে। তাই সবার জন্য চলে যাওয়াটা সহজ নাও হতে পারে।


এর বাইরে কিছু কথা-

✅ অনেকেই মনে করেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ শুধু স্কুলে যায় আর আসে। এই জবটা কত কঠিন সেটা না আসলে বুঝবেন না। শিক্ষক সংকটের কারনে কখনও ৬-৭টা ক্লাসও নিতে হয়। ছোট ছোট শিশু যাদের বয়স ৫-১১ বছরের মধ্যে তাদের এত দীর্ঘ সময় ক্লাস নেওয়া কতটা চ্যালেঞ্জিং সেটা আপনি ক্লাস না নিলে কখনোই বুঝবেন না, আই রিপিট কখনোই না। এখন যারা বিরোধিতা করছেন তাদের মধ্যে থেকে কেউ শিক্ষক হলে তখন বুঝবেন।

✅ জিডিপির মিনিমাম ৪% শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হওয়া উচিত সেখানে গত বছর আমাদের বরাদ্দ ছিল ১.৬৯%। শিক্ষা ছাড়া একটা দেশকে এগিয়ে নেওয়ার আর কোন উপায় আছে বলেন?? উন্নত দেশের কারিকুলাম অনুসরণ করার চেয়ে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে, শিক্ষকগণের জীবনমান উন্নত করতে হবে। গত তিনটি নিয়োগের (২০, ২৩, ২৪) কারনে প্রাথমিকের চেহারা কিছুটা বদলে গেছে বলে আমার মনে হয়। ১০ম গ্রেড হওয়ার পরে স্বচ্ছ ৩-৪টা নিয়োগ হলে সম্পূর্ণ প্রাথমিক সেক্টরটাই বদলে যাবে।

✅ এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সকলকে জাতীয়করণের সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল। একটা পরীক্ষার মাধ্যমে বা অন্য কোন উপায়ে যাচাই বাছাইয়ের পরে সেটা হওয়া উচিত ছিল। আবার কিছু শিক্ষকের কোয়ালিটি খারাপ। কিন্তু তাই বলে সামগ্রিকভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার/শিশুর বুনিয়াদি শিক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত মহান পেশার এই মানুষগুলোর সামাজিক তথা অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ব্যতিরেকে দেশের সার্বিক উন্নতি কল্পনাতীত।

আসুন যুক্তি তর্ক দিয়ে সমাধানের পথ খুজি....

মন্তব্য করুন

ব্লগ