প্রভাষক
০৫ অক্টোবর, ২০২৪ ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ
প্রভাষক
আজ ৫ই অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এ দিবসে আজকের প্রতিপাদ্য 'শিক্ষকের কণ্ঠস্বর: শিক্ষায় নতুন সামাজিক অঙ্গীকার'। এ দিবসে মানুষ গড়ার কারিগর গোটা বিশ্বের শিক্ষকসমাজের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জ্ঞাপন করি। প্রতিপাদ্যের প্রথম অংশ 'শিক্ষকের কণ্ঠস্বর'। শিক্ষকের কণ্ঠস্বরই যদি শিক্ষায় নতুন সামাজিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে সে কণ্ঠস্বরকে জোরালো ও শক্তিশালী করতে হবে সবার আগে। ক্ষুধার্ত মানুষের কণ্ঠস্বর কখনোই জোরালো হতে পারে না। আগে তাদের ক্ষুধা নিবারণ করতে হবে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকের মর্যাদা সবার আগে। ক্ষুধার্ত, হেয় প্রতিপন্ন মানুষ কখনোই তার পুরো সামর্থ্য বিনিয়োগ করে উঠতে পারে না। তবুও বাংলাদেশের শিক্ষকসমাজ ঐতিহ্যগতভাবে ন্যায়পরায়ন, নিষ্ঠাবান, নিজের কষ্টকে দমিয়ে রেখে অনেক মুখে হাসি ফুটাতে সতত নিয়োজিত। আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের শিক্ষকদের জীবনমান খুবই নিম্ন। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন-গ্রাফ অনেক নিচে।
যার কারণে ন্যুনতম জীবনমান বজায় রাখতে শিক্ষকদের বেছে নিতে হচ্ছে অন্য আয়ের উৎস। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধরাবাঁধা সময় কোনো রকমে অতিবাহিত করেই অন্য আয়ের উৎসের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। যার ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে পুরোপুরি আত্মনিয়োগের বিষয়টিতে ঘাটতি কিছুটা হলেও থেকেই যায়। সার্বিকভাবে দেখতে গেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই দৃশ্যই পরিলক্ষিত হবে। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সবার আগে দরকার শিক্ষকদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, আর্থসামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। বেতনবৈষম্য দূর করে নতুন গ্রহণযোগ্য বেতনকাঠামো প্রণয়ন ও প্রদান করা।
এ-তো গেল শিক্ষকদের কথা। এবার আসি শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গে। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যেক নাগরিকের সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরাও হচ্ছে নানা বৈষম্যের শিকার। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রসঙ্গ: ফান্ডামেন্টাল বা প্রাথমিক, মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মেধাবী আর মেধাহীন সংজ্ঞায় বিভক্ত করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। এসময় তাদের মেধার প্রামাণ দেওয়ার সময় নয়, মেধা বিকাশের সময়। তাই ভালো মানের বিদ্যালয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে পারবে, নাহলে নয়। মেধার বিকাশ যে সময় হবে সেসময় তাদের এমন মেধাযুদ্ধে অবতীর্ণ করানো মোটেই সুবোদ্ধাদের কাজ নয়। তাই একই সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থার সুযোগ পাওয়া প্রতিটি শিশুর মানবিক অধিকার। আর আমার দেশের শিশুরা স্বাধীনতার ৫৩ বছর অতিবাহিত হলেও এই বৈষম্য থেকে বের হতে পারছে না। আমার মনে হয় আজ নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। তারা পায় না সমান অবকাঠামোগত সুবিধা, টিফিনের কথাই যদি ধরা হয়, সরকারি স্কুলের বাচ্চাদের ক্ষুধা রয়েছে, কিন্তু বেসরকারি স্কুলের বাচ্চাদের ক্ষুধা নেই। কী প্রহসন! তাছাড়া বেসরকারি বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের ছোট চোখেও দেখা হয়, যা তাদের মানসিক বিকাশকে চরমভাবে ব্যাহত করে।আরও অনেকক্ষেত্রেই চরম বৈষম্য বিদ্যমান।
শিক্ষাক্ষেত্র- যাকে যেকোনো রাষ্ট্রের ভীত বলা যায়। এখানে এত বৈষম্য থাকলে কোনো রাষ্টেরই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এখানেই যদি পাওয়া না পাওয়ার হিসেব কষতে শিখে যায় শিক্ষার্থীরা, তবে তাদের হাতে রাষ্ট্র নিরাপদ হবে কী করে। কী করে নির্মুল হবে দুর্নীতি, অসাম্য।
শিক্ষাক্ষেত্রে এহেন বৈষম্য ও অসাম্য নির্মূল করতে সবার আগে প্রয়োজন সকল শিক্ষার্থী সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। আর তা সম্ভব সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের মাধ্যমে। তবে আমার মনে হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের না হওয়ার মূলে রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। কোনো এক মহল কেন যেন চায় না জাতীয়করণ হোক। শিক্ষাক্ষেত্রে এই বৈষম্য জিইয়ে রাখতে চায়। শিক্ষকদের হেয় করতে চায়। তার একটি বড় উদাহরণ - বেসরকারি কলেজের শিক্ষকদের সহকারী অধাপকের পদটিকে জেষ্ঠ্য প্রভাষক বানানো।
যাই হোক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন হলে শিক্ষার সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয়ে আত্মবিকাশ ঘটবে, মূল্যবোধ সম্পন্ন জাতি তৈরি হবে। দুর্নীতিমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথ সুগম হবে। আশা করছি, নীতিনির্ধারণী মহল জাতীয়করণের বিষয়টি আমলে নিয়ে সত্যিকার অর্থে দেশ সংস্কার করে দেশকে যে উন্নত দেশের কাতারে নিবেন তা প্রমাণ করবেন।
১৩
১৯ মন্তব্য