ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় কয়েক দিন ধরে বিপর্যস্ত ছিল ময়মনসিংহ, শেরপুর ও নেত্রকোনা। এসব অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দি। টানা তিনদিন রোদ থাকায় শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার চারটি ইউনিয়নে পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। ভোগাই ও চেল্লাখালী নদীর পানিও কমে গেছে। যদিও বৃহস্পতিবার রাতে বৃষ্টি হওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছে পানিবন্দি পরিবারগুলো।
শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য বলছে, বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় দিকে ভোগাই নদের পানি বিপৎসীমার ২২০ সেন্টিমিটার এবং চেল্লাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ১১৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
বন্যার্তরা জানান, বাড়িঘরে এখনো পানি। বৃহস্পতিবার রাতে বৃষ্টি হয়েছে। তিনদিনে পানি কিছুটা কমেছে। আবার যদি বৃষ্টি হয়, তাহলে নতুন করে বন্যা দেখা দিতে পারে। উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের ২১টি গ্রামের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার পরিবার এখনো পানিবন্দি।
নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদ রানা জানান, উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ২৯ হাজার ৫৬০টি পরিবারকে শুকনো খাবার, স্যালাইন, মোমবাতি ও রান্না করা খিচুড়ি বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া বন্যার্তদের সহযোগিতায় সরকারি-বেসরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।
নেত্রকোনায় ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে বন্যার পানি। কংস, সোমেশ্বরী, ধনু, মগড়াসহ সবকটি নদ-নদীর পানি কমছে। তবে কলমাকান্দার উব্দাখালী নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সারওয়ার জাহান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নেত্রকোনার বিভিন্ন উপজেলায় অন্তত ২৭টি ইউনিয়নের দেড় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়ে দেড় লক্ষাধিক মানুষ। প্রায় ২৪ হাজার ৬৬৭ হেক্টর জমির আমন ধান পানিতে নিমজ্জিত। পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে দুই শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। প্রায় ৩১০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক এখনো পানির নিচে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, প্লাবিত গ্রামগুলোর অধিকাংশ সড়ক ভেঙে গেছে। নষ্ট হয়ে গেছে আমন ধান ও সবজি। ভেসে গেছে খামারের মাছ। বিধ্বস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি। খড় নষ্ট হওয়ায় গো-খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে।
জেলা প্রশাসক বনানী বিশ্বাস জানান, বন্যার পানি এখন দ্রুতই নেমে যাচ্ছে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অল্প সময়ের মধ্যে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। যাদের ফসলের ক্ষতি হয়েছে, যাদের ঘরবাড়ি নষ্ট হয়েছে, তাদের তালিকা তৈরি করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে। এ পর্যন্ত ১০০ টন চাল, শিশুখাদ্য ও গো-খাদ্যের জন্য নগদ ৫ লাখ টাকাসহ শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ আরো বাড়ানো হবে।
অন্যদিকে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া, হালুয়াঘাট ও ফুলপুরে এখনো কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি। সীমান্তবর্তী দুই উপজেলা ধোবাউড়া ও হালুয়াঘাটে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বন্যার কারণে ম্লান হয়েছে পূজার আনন্দ। বন্যায় অনেক মন্দিরে পানি উঠেছে। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অন্যবারের তুলনায় পূজায় আমেজ ও জৌলুস কিছুটা কমেছে। পানির কারণে পূজামণ্ডপ ও আঙিনা সজ্জিত করা যাচ্ছে না। তবে পূজাসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অনেক মণ্ডপে পানি থাকলেও নিয়ম মেনেই চলবে পূজার আনুষ্ঠানিকতা। জেলার বন্যাকবলিত তিন উপজেলায় ১২৫টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে।
কংস নদীর পাড়ঘেঁষে গড়ে ওঠা ধোবাউড়া উপজেলার আইলাতলী আশ্রয়ণ প্রকল্পে পানি ওঠায় দুর্ভোগ বেড়েছে সেখানকার বাসিন্দাদের। আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা মিনতি রানী পাল বলেন, ‘বন্যায় পূজার আনন্দ ম্লান হয়েছে। দুই বেলা খাবারই জুটছে না, পূজা কীভাবে করব? সরকার সহযোগিতা করলে অন্তত সন্তানদের নিয়ে চলতে পারতাম।’
হালুয়াঘাট উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুভাষ চন্দ্র সাহা বলেন, ‘গত বুধবার ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গা পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা হয়েছে। বন্যার কারণে পুরো উপজেলার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। পূজার আনন্দে ভাটা পড়েছে। এবার উপজেলায় ৫৯টি মণ্ডপে পূজা হবে। পানিবন্দি থাকায় সাতটি মণ্ডপে প্যান্ডেল ও আলোকসজ্জা হবে না। সেখানে শুধু নিয়ম মেনেই চলবে পূজার আনুষ্ঠানিকতা। এছাড়া বন্যার কারণে একটি মণ্ডপে পূজা করা সম্ভব হচ্ছে না। মণ্ডপটি স্থানান্তর করা হয়েছে।’
ফুলপুর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দেবল কুমার সাহা বলেন, ‘এবার উপজেলায় ৩৬টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এবং অর্থ সংকটের কারণে পূজার খরচ নামিয়ে আনতে হয়েছে। বন্যার কারণে অন্য বছরের মতো আনন্দ নেই। উপজেলার পাঁচটি মণ্ডপ এখনো জলাবদ্ধ।’
ধোবাউড়া পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘আকস্মিক বন্যায় পূজার আনন্দ একেবারে শেষ। এবার উপজেলায় ৩০টি মণ্ডপে পূজা হবে। চারদিকে পানি। বন্যার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে আয়-রোজগার। এ অবস্থায় পূজা আয়োজন বন্ধ না থাকলেও সাজসজ্জা অনেকটা সীমিত করা হয়েছে।’
৭
৬ মন্তব্য