সহকারী শিক্ষক
১৪ অক্টোবর, ২০২৪ ১০:২৬ অপরাহ্ণ
প্রাথমিক বিদ্যালয় হোক শিশুদের শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলার প্রাথমিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান।
প্রাথমিক বিদ্যালয় হোক শিশুদের শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলার প্রাথমিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান।
প্রবন্ধ লেখকঃ তানজিনা বেগম।
আমরা বাঙালি, আমাদের আছে ইতিহাস গর্বের। পৃথিবীর বুকে আর কোনো জাতি ভাষার জন্য প্রাণ দেয়নি। ১৯৫২ সালে ভাষার দাবিতে এদেশের ছাত্ররা প্রাণ দিয়েছে, বাঁচিয়েছে মাতৃভাষার মান। প্রাণ দিয়ে অর্জিত মাতৃভাষার সম্মান কতটা রাখতে পেরেছি আমরা? তা আজ সত্যিই ভাবার বিষয়।
শুধু ভাষাবিশারদ বা ভাষা গবেষকরা উচ্চারণ নিয়ে কাজ করে গেলে বা চর্চা করে গেলে চলবে না। কাজ করতে হবে একদম রুট লেভেল থেকে অর্থাৎ স্কুল কলেজ থেকে। স্কুল-কলেজগুলোয় শুদ্ধ বাংলা বলার বা চর্চা করার তেমন কোনো সুযোগ নেই।
গ্রীষ্মকে বেশিরভাগ লোকেই উচ্চারণ করে গ্রীশমো, চুড়ি কে চুরি, পদ্মাকে পদমা, সমাজকে সোমাজ, কোটিকে কুটি, বিশ্বকে বিশবো, অন্ধ কে অনদো, বন্ধকে বনদো।
ভাষা আমাদের যোগাযোগের মাধ্যম। ভাষা শুদ্ধ না হলে যোগাযোগও হুমকির মুখে পড়ে। প্রাথমিক স্তর থেকেই শুদ্ধ উচ্চারণের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। ভিত্তিতেই ভাষার দখল মজবুত না হলে পরে গিয়ে তা হাজারো চেষ্টা করলেও সফল হয় না। প্রাথমিক শিক্ষা একটি লক্ষ্যে চলে, রয়েছে উদ্দেশ্য। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কে বলা হয়েছে—‘পাঁচ বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা যে চিহ্নিত অর্জনযোগ্য যোগ্যতাগুলো (জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি) অর্জন করবে বলে আশা করা যায়, সেগুলোকে প্রাথমিক শিক্ষার প্রান্তিক যোগ্যতা বলে।’
প্রান্তিক যোগ্যতা রয়েছে ২৯টি।
এর মধ্যে, ৯ নং প্রান্তিক যোগ্যতাটা তুলে ধরছি। এই দফায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বাংলা ভাষার দক্ষতা অর্জন এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা।’
এমন অসংখ্য শিখনফল রয়েছে যার সঙ্গে শুদ্ধ উচ্চারণ জড়িত। একজন ছাত্র যখন তার পরিবার বা শিক্ষকের কাছ থেকে শুদ্ধ উচ্চারণ শুনতে থাকে, তখন তার জন্য শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলাটা খুব সহজ হয়ে যায়, সহজ হয় বলা এবং লেখাও। আমাদের শুদ্ধ উচ্চারণ শোনার সুযোগ খুব কম রয়েছে। গ্রামের শিশুরা তো পরিবারে আঞ্চলিকতার বাইরে কোনো কিছু শোনার সুযোগ-ই পায় না। তারা স্কুলে শিক্ষকের কাছে যতটুকু সময় থাকে, ততটুকুই সুযোগ পাওয়ার কথা। কিন্তু আদৌ কি সে সুযোগ পায়? পায় না। আমাদের শিখনফল শুদ্ধ উচ্চারণকে ঘিরে থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ নেই বললেই চলে৷ বাংলা বিষয় পড়ান যে শিক্ষক তিনি পরিক্ষার সিলেবাস শেষ করতে, প্রশ্ন পদ্ধতি শিক্ষার্থীর সামনে তুলে ধরতে ব্যস্ত থাকেন। রিডিং পড়াতে গিয়ে শিক্ষক তার শিক্ষার্থীর উচ্চারণের দিকে খেয়াল দেওয়ার সুযোগ পান না। কিন্তু তার জন্য সময় কতটুকু বরাদ্দ, সেটা একটা বিষয়। এছাড়া একজন শিক্ষক যিনি শুদ্ধ উচ্চারণ শেখাবেন তার এ ব্যাপারে দখল কতটা, তাও কিন্তু আমাদের ভাবতে হবে। শিক্ষকের জন্য উচ্চারণ-বিষয়ক কোনো প্রশিক্ষণের আলাদা ব্যবস্থা হয়েছে কি?
শিক্ষকের যদি উচ্চারণ বিষয়ে জানার বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকে তাহলে তিনিও অশুদ্ধ উচ্চারণের বাইরে নয়, কারণ, তিনি ও মানুষ, তার ও আঞ্চলিকতা রয়েছে, রয়েছে শুদ্ধ উচ্চারণ শোনার সুযোগের অভাব। তাহলে মোট কথা দাঁড়াচ্ছে যে প্রাথমিক শিক্ষার শিখনফল অর্জিত হচ্ছে না। শিখনফল সম্পূর্ণভাবে বা সফলভাবে অর্জিত না হলে শেষ পর্যন্ত ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার উদ্দেশ্য। প্রাথমিক পর্যায় হচ্ছে একজন মানুষের ভিত্তি। ভিত্তিতেই যদি দুর্বলতা থেকে যায়, তাহলে তা কাটিয়ে উঠতে পার হয়ে যায় সারা জীবন। কেউ কেউ কাটিয়ে উঠতে পারেই না, কেউ কেউ হয়তো এর প্রয়োজনীয়তা বোঝার সুযোগই পায় না। এছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ে কেন, মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকেও উচ্চারণের ওপর তেমন কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
তাই প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া ভাষার মান বাঁচাতে আমাদের উচিত প্রাথমিক পর্যায় থেকেই উচ্চারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া। উচ্চারণের জন্য আলাদা শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া এবং শুদ্ধ উচ্চারণের চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করা। সরকারের পাশাপাশি দেশের সব সচেতন নাগরিকের উচিত এ ব্যাপারে যত্নবান হওয়া। তাহলেই আমাদের প্রাণের ভাষা তার মর্যাদা ফিরে পাবে, অশুদ্ধ বা ভুল উচ্চারণে প্রতিনিয়ত আমাদের ভাষাকে তার মর্যাদা হারানোর লজ্জা থেকে বাঁচানো যাবে।
১৩
১৮ মন্তব্য