Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৫ অক্টোবর, ২০২৪ ০৭:৩৯ পূর্বাহ্ণ

মা ফাতিমার (র) জীবন কাহিনি নবী নন্দিনী খাতুনে জান্নাত মা ফাতিমা (র,) এর জীবন কাহিনি

মা ফাতেমার জীবন কাহিনি

নবী নন্দিনী খাতুনে জান্নাত মা ফাতেমা (عليه السلام) এঁর জীবন কাহিনি-১ম পর্ব [1-3]

⏹⏹হযরত ফাতিমার শৈশবকাল⏹⏹

★১. সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল (ﷺ) ও বেহেশতী নারী হযরত খাদীজার গৃহে হযরত ফাতিমা জন্মগ্রহণ করলেন। সবচেয়ে সম্মানিত গৃহ।অথচ পার্থিব দিক থেকে খুব কষ্টকর একটি গৃহে তিঁনি জন্ম নিলেন।যখন হযরত খাদীজার সাথে রাসূলের বিয়ে হয় তখন হযরত খাদীজা ছিলেন আরবের অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তিত্ব। কিন্তু অসহায় মানুষদের সেবা ও নিপীড়িত মুসলমানদের পেছনে ব্যয় করতে গিয়ে তিঁনি শোচনীয় অবস্থায় নিপতিত হন।

★ধর্ম প্রচারের কারণে রাসূলের ওপর কুরাইশরা নানাভাবে নির্যাতন শুরু করে। এভাবে হযরত ফাতিমার দুই বছর অতিক্রান্ত হয়।হযরত ফাতিমার জন্মের মাত্র দুই বছর পর তাঁরা সবচেয়ে কঠিন অবস্থায় পড়েন।বনু হাশিমের সাথে কুরাইশরা সকল সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়।তখন বনু হাশিমের নেতা ছিলেন হযরত আবু তালিব।তিনি বনু হাশিমকে নিয়ে শেবে আবি তালিবে (আবু তালিবের গিরিগুহা) আশ্রয় নেন।

★দিনের পর দিন তাঁদেরকে না খেয়ে থাকতে হত।এতে মহিলাদের বুকের দুধ শুকিয়ে যায়।সন্তানরা দুধ না পেয়ে কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে যেত।হযরত ফাতিমা শিশু বয়সেই এমন এক অবস্থার মধ্যে পড়েন। দীর্ঘ তিন বছর তাঁরা এ অবস্থার মধ্যে কাটান।অবশেষে তিন বছর পর তাঁরা এ অবরোধ থেকে বেরিয়ে আসেন।কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে এতো  কষ্ট সহ্য করার পর সেই বছরই হযরত ফাতিমার প্রাণপ্রিয় মা ইন্তেকাল করেন।যে বয়সে তাঁর মাতৃস্নেহের প্রয়োজন,যে বয়সে তাঁর লালিত-পালিত হওয়ার কথা সে বয়সেই তাঁর ওপর রাসূলের দেখাশুনার গুরুদায়িত্ব এসে পড়ে।তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র পাঁচ।তিঁনি রাসূলকে মায়ের মতোই যত্ন করতেন, তাঁর দিকে খেয়াল রাখতেন।শুধু ঘরের মধ্যে নয়,ঘরের বাইরেও তিঁনি রাসূলের বিষয়াদির প্রতি লক্ষ্য রাখতেন।অন্যান্য শিশুর মতো তিনি খেলাধুলা করতেন না।সেই ছোট বেলাতেই তিঁনি একজন দায়িত্বশীল নারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।যখনই তিঁনি জেনেছেন যে, কাফির-মুশরিকরা রাসূলকে নির্যাতন করছে,তখনই তিনি সেখানে ছুটে গেছেন এবং পিতাকে উদ্ধার করে এনেছেন। একবার আবু জেহেল ও তার সঙ্গীরা রাসূলের সিজদাবনত অবস্থায় মাথার ওপর উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দেয়।যখন হযরত ফাতিমা এ ঘটনার কথা শোনেন তখনই তিঁনি দৌড়ে সেখানে চলে যান এবং পিতার মাথার ওপর থেকে সেগুলো সরিয়ে ফেলেন।তিনি আবু জেহেলকে এজন্য তিরস্কার করতে থাকেন।তিনি রাসূলের প্রতি এতটাই যত্নশীল ছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে ‘উম্মু আবিহা’ (তার পিতার মা) বলে আখ্যায়িত করেন।
[উসদুল গাবাহ,৫ম খণ্ড,পৃঃ ৫২০]

Advertisement

 খন্দকের যুদ্ধের পূর্বে রাসূল ﷺ একদিন পরিখা খননের কাজে ব্যস্ত ছিলেন,হযরত ফাতিমা একটি রুটি তাঁর জন্য নিয়ে আসেন।রাসূল (ﷺ) জিজ্ঞাসা করেন,এটি কি? ফাতিমা বলেন, সন্তানদের জন্য কয়েকটি রুটি বানিয়েছিলাম।সেখান থেকে একটি আপনার জন্য নিয়ে এসেছি।রাসূল বলেন, হে ফাতিমা! এটাই প্রথম খাদ্য যা তিন দিন পর তোঁমার পিতার নিকট পৌঁছেছে।তিঁনি তাঁর ছোট ছোট সন্তানদের ওপরও রাসূলকে প্রাধান্য দিতেন।প্রতিবেশীরা খাবার পাঠালে তিনি রাসূলকে সঙ্গে না নিয়ে তাদরেকে সে খাবার খেতে দিতেন না।এভাবে রাসূলের ওফাত পর্যন্ত আমরা তাঁকে একজন মমতাময়ী মায়ের ভূমিকায় পাই যিনি সত্যিই ‘উম্মু আবিহা’(স্বীয় পিতার মাতা-এ উপাধি তিনি পিতার ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা পালনের কারণে পেয়েছিলেন।কারণ রাসূল (ﷺ) যখনই তাঁর নিকট আসতেন যেন মাতার সান্নিধ্য পেতেন ও তাঁর সকল কষ্ট দূরীভু’ত হত। রাসূল (ﷺ) এঁর ওপর ইসলাম প্রচারের যে গুরু দায়িত্ব ছিল ও এ পথে যত চাপ অনুভব করতেন ফাতিমার মাতৃস্নেহে  রাসূল (ﷺ) তা ভুলে যেতেন।বিশেষত হযরত আবু তালিব ও খাদীজার মৃত্যুর পর রাসূলের একাকিত্বে তিনি ছিলেন তাঁর পিতার সবচেয়ে বড় মানসিক প্রশান্তি।

★২. হযরত ফাতিমা (রাঃ) এর বাল্য জীবনের আর একটি স্মরণীয়  হৃদয় বিদারক ঘটনা আমাদের সবার হৃদয়কে স্পর্শ করে।ইতিহাসে এই বছরকে বলা হয় আম্বল হুযন বা শোকের বছর।রাসূলে পাক (ﷺ) কাবাশরীফে নামায আদায় করছিলেন এমন সময় একদল খোদাদ্রোহী কুরাইশ অদূরে দন্ডায়মান হয়ে হযরত (ﷺ) কে অকথ্য ভাষায় গালি  গালাজ ও উপহাস করছে।প্রিয় নবী (ﷺ) নামাযরত অবস্থায় সেজদায় গেলেন এমনি সময় নরপিশাচ খোদাদ্রোহী কুরাইশরা একটি উটের পচাঁ নাড়িভূড়ি এনে সিজদারত রাসূল (ﷺ) এঁর ঘাড়ের উপর চাপিয়ে দিল।

★উকরাহ বিন আবু মুঈত নামে এক নরাধমের নেতেৃত্বে এ গর্হিত কাজটি করা হয়।শিশু ফাতেমার কানে এ কথা পৌঁছতেই তিঁনি পাগলের মত কাবা ঘরে ছুটে এলেন এবং কারো পরওয়া না করে পিতার গর্দান থেকে ময়লা সরিয়ে ফেললেন।কাফিররা এ সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছিল আর হাতে তালি দিচ্ছিল। ৮/৯ বছর বয়সের ফাতিমা (রাঃ) এ দৃশ্য দেখে কাফিরদের দিকে ঘৃণার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন,হতভাগারা! আহকামুল হাকীমিন তোমাদের অপকর্মের অবশ্যই শাস্তি দিবেন।
[আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াঃ ৩/৪৪, হায়াত আমসাহাবাঃ ১/২৭]

★ইতিহাস থেকে জানা যায়,বদরের যুদ্ধে এই নরপিশাচগুলো মুসলমানদের হাতে অত্যন্ত করুণভাবে মৃত্যুবরণ করে। 

রাসূল (ﷺ) নামাজ  শেষ করে দু’হাত উঠিয়ে দু’আ করলেন হে আল্লাহ! তুমি শায়রা ইবনে রাবিয়াকে পাকড়াও কর,হে আল্লাহ তুমি উকবা ইবনে আবী মুঈতকে সামাল দাও হে আল্লাহ তুমি উমাইয়া ইবন খালাফের খবর নাও।হে আল্লাহ! তুমি জাহল ইবনে হিসামকে ধর।রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে হাত উঠিয়ে এভাবে দু’আ করতে দেখে পাষন্ডদের হাসি থেমে যায়।তারা ভয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে।আল্লাহ তার প্রিয় নবীর কথা কবুল করেন। উল্লেখিত চার দুর্বৃত্তের সবাই বদরে নিহত হন।
[আল বায়হাকী,দালাযিল আননবুয়াহঃ ২/২৭৮,২৮০,আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩/৪৪]

উল্লেখ্য যে,উকবা বদরে মুসলমানদের হাতে বন্দী হন।রাসূল (ﷺ) তাকে হত্যার নির্দেশ দেন।তখন সে বলে মুহাম্মদ! আমার ছোট্ট মেয়েগুলোর জন্য কে থাকবে? জাহান্নাম! তারপর সে বলে, আমি কুরাইশ হওয়াও সত্বেও আমাকে তুমি হত্যা করবে? বললেন,হ্যাঁ।তারপর নবী (ﷺ) সাহাবীদের দিকে ফিরে বললেন, তোমরা কি জান এই লোকটি আঁমার সাথে কিরূপ আচরণ করেছিল? একদিন আঁমি মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে সিজদারত ছিলাম।এমন সময় সে এসে আঁমার ঘাড়ের উপর পা উঠিয়ে এত জোরে চাপ দেয় যে, আঁমার চোখ দুটি বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। আরেকবার আঁমি সিজদায় আছি এমন সময় সে কোথা থেকে ছাগলের বর্জ্য এনে আঁমার মাথায় ঢেলে দেয়।ফাতেমা দৌড়ে এসে তা সরিয়ে আঁমার মাথা ধুইয়ে দেয়। এভাবে মুসলমানদের হাতে পাপিষ্ঠ উকবার জীবনের সমাপ্তি ঘটে।
[আল বিদায়া ওয়ান নিছায়াঃ ৩/৪৪, হায়াত আমসাহাবাঃ ১/২৭১,মুবাশশরাত বিন জান্নাহঃ ২০৫]

⏹আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত: “একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বায়তুল্লাহর কাছে নামায আদায় করছিলেন।সেখানে আবু জেহেল ও তার সঙ্গীরা বসা ছিল।গতদিন উট জবাই করা হয়েছিল।এমন সময় আবু জেহেল বলে উঠল, ‘তোমাদের মধ্যে কে অমুক গোত্রের উটনীর নাড়ীভুঁড়ি এনে মুহাম্মদ যখন সিজদা করবে তখন তার পিঠের উপর রাখতে পারবে?

**তখন কওমের সবচেয়ে নিকৃষ্ট লোকটি দ্রুত গিয়ে উটনীর নাড়ী ভুঁড়ি নিয়ে এল এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সিজদায় গেলেন তখন এগুলো তাঁর দুই কাঁধের মাঝখানে রেখে দিল।বর্ণনাকারী বলেন: তারা নিজেরা হাসতে থাকলো; হাসতে হাসতে একে অন্যের ওপর হেলে পড়ল।আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। হায়! আমার যদি প্রতিরোধ করার ক্ষমতা থাকত তাহলে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিঠ মোবারক  থেকে এগুলো ফেলে দিতাম।রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিজদায় পড়ে থাকলেন; মাথা মোবারক উঠালেন না।এক পর্যায়ে এক লোক গিয়ে হযরত ফাতিমা (রাঃ) কে খবর দিলেন। খবর শুনে তিঁনি ছুটে এলেন।সে সময় ফাতেমা (রাঃ) ছিলেন ছোট বালিকা। তিঁনি এসে উটের নাড়ীভুঁড়ি তাঁর পিঠ মোবারক  থেকে ফেলে দিলেন।

**এরপর লোকদের দিকে মুখ করে তাদেরকে গালমন্দ করলেন।অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাঁর নামায শেষ করলেন তখন তিঁনি কণ্ঠস্বর উঁচু করলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে বদ দোয়া করলেন।রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দোয়া করতেন তখন তিনবার করতেন এবং যখন প্রার্থনা করতেন তখন তিনবার করতেন-এরপর বললেন: ইয়া আল্লাহ্! আঁপনি কুরাইশকে ধ্বংস করুন।এভাবে তিনবার বললেন।তারা যখন তাঁর কণ্ঠস্বর শুনতে পেল তাদের হাসি মিলিয়ে গেল এবং তারা তাঁর বদ দোয়াকে ভয় পেল।

**এরপর তিঁনি বললেনঃ ইয়া আল্লাহ! আবূ জেহেল ইবনে হিশাম,‘উতবা ইবনে রাবী’আ, শায়বা ইবনে রবী’আ,ওয়ালীদ ইবনে ‘উকবা,উমাইয়্যা ইবনে খালাফ ও ‘উকবা ইবনে আবু মু’আইতকে ধ্বংস করুন।রাবী বলেন,তিঁনি সপ্তম ব্যক্তির নামও বলেছিলেন কিন্তু আমি স্মরণ রাখতে পারিনি।

**সেই সত্তার কসম! যিঁনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন,রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদের নাম উচ্চারণ করেছিলেন,আমি বদর যুদ্ধের দিন তাদেরকে নিহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি।পরবর্তীতে তাদেরকে টেনেহিঁচড়ে বদরের কূপের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়।”
[সহিহ বুখারী ২৪০,সহিহ মুসলিম,১৭৯৪]

★এর পরের ঘটনা দেখে বালিকা ফাতিমার শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তিনি ভয়ে অসার হয়ে পড়েন। দেখেন তাদের একজন তার পিতার গায়ের চাদরটি তার গলায় পেঁচিয়ে জোরে টানতে শুরু করেছে। আর আবু বকর (রাঃ) তাদের সামনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত উত্তেজিত কন্ঠে কলছেন! তোমরা একটি লোককে শুধু এজন্য হত্যা করবে যে, তিনি বলেন! আল্লাহ আমার রব, প্রতিপালক?

লোকগুলো আগুনঝরা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো। তার দাড়ি ধরে টানলো, তারপর মাথা ফাটিয়ে রক্ত ঝরিয়ে ছাড়লো।
[ইবনে হিসান,আল সীরাহ আল নাবাজিয়াহ্ ১-৩১০]

★এভাবে আবু বকর (রাঃ) সেদিন নিজের জীবন বিপন্ন করে পাষন্ডদের হাত থেকে মুহাম্মদ (ﷺ) কে ছাড়ালেন। ছাড়া পেয়ে তিনি বাড়ীর পথ ধরলেন।মেয়ে ফাতিমা  পিছনে পিছনে চললেন। পথে স্বাধীন ও দাস যাদের সাথে দেখা হলো প্রত্যেকেই নানরকম অশালীন মন্তব্য ছুঁড়ে মেরে ভীষণ কষ্ট দিল।রাসূল (ﷺ) সোজা বাড়ীতে গেলেন এবং মারাত্মক রকম বিধ্বস্ত অবস্থায় বিছানায় এলিয়ে পড়লেন। বালিকা ফাতিমা (রাঃ) এর চোখের সামনে এ ঘটনা ঘটল।
[তারাজিমু সায়্যিদাতি বায়ত আন-নবুয়াহ্ ৫৯২] ★★সংক্ষিপ্ত★★

★৩. হযরত ফাতিমা (আ:) এঁর জীবন- যাপন প্রণালীঃ

★বিখ্যাত হাদিসগ্রন্থ ‘সুনানে ইবনে দাউদ’ এর রচয়িতা আবু দাউদ সুলাইমান ইবনে তিয়ালসী তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থে লিখেছেন, হজরত আলী ইবনে আবি তালিব বলেছেন, তোমরা কি চাও না যে, নিজের ও নবি কন্যা ফাতেমা সম্পর্কে তোমাদেরকে অবগত করি? তিনি মহানবি ﷺ-এঁর সবচেয়ে নিকটতম হওয়া সত্ত্বেও আমার বাড়ীতে যাতা পিষতে পিষতে তার হাতে ক্ষতের সৃষ্টি হত,পানি বহনের কারণে তার কাঁধে ব্যথা হত,ঝাড়ু দান ও গৃহ পরিচ্ছন্ন করার কারণে তার পোষাক পুরোনো হয়ে যেত।শুনেছি যে,মহানবি ﷺ -এঁর নিকট কয়েকজন গৃহ পরিচারিকা ছিলেন (দাসী)।ফাতেমা সাহায্য গ্রহণের আশায় বাবার কাছে গেলেন।যাতে ঐ গৃহ পরিচারিকাদের একজনকে বাড়ীর কাজের জন্য তাঁর (ﷺ) নিকট চাইতে পারেন।কিন্তু তিঁনি বাবার নিকট উপস্থিত হয়ে সেথায় উপস্থিত যুবকদেরকে দেখে অতিমাত্রায় লজ্জিত হয়ে নিজের আবেদন প্রকাশ করা হতে বিরত থাকলেন এবং মনের কথা না বলেই তিঁনি ফিরে আসলেন।
[সুনানে আবি দাউদ, ২য় খণ্ড,পৃষ্ঠা ৩৩৪]

⏺যুহ্দ বা দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ততা:

ইমাম জা’ফর আস সাদেক (আঃ) এবং হযরত জাবের আনসারী থেকে বর্ণিত হয়েছে যে,একদিন হযরত মুহাম্মদ (ﷺ) হযরত ফাতেমাকে দেখলেন যে,তিনি একটি মোটা ও শক্ত কাপড় পরিধান করে নিজ হস্তে যাঁতাকল চালিয়ে আটা তৈরী করছেন।আর সে অবস্থায় নিজের কোলের সন্তানকে দুধ খাওয়াচ্ছেন।এহেন অবস্থা পরিদর্শনে হযরতের চোখে পানি ছল ছল করে উঠলো।তখন তিনি বলেন : “আঁমার হে প্রিয় কন্যা! এ দুনিয়ার তিক্ততা আখেরাতের মিষ্টি স্বাদেরই পূর্ব প্রস্তুতি মনে করে সহ্য করে যাও।”
প্রত্যুত্তরে হযরত ফাতেমা বলেন:

হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আল্লাহ্ প্রদত্ত এতসব নেয়ামত ও অনুগ্রহের জন্যে তাঁকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই এবং এ জন্যে তাঁর অশেষ প্রশংসাও করছি।তখন আল্লাহ্ নিম্নোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ করেন :

وَ لَسَوْفَ يُعْطِيْكَ رَبُّكَ فَتَرْضَى

অর্থাৎ তোমার প্রভু অতি শীঘ্রই তোমাকে এতসব কিছু দেবেন যার ফলে তুমি সন্তুষ্ট হবে।”
[আদ দোহা,আয়াত নং ৫]

ইমাম জা’ফর সাদিক (আ:) বলেন : “ইমাম আলী (আ:) পানি ও কাঠ জোগাড় করে আনতেন আর হযরত ফাতেমা (আ:) আটা তৈরী করে খামির বানাতেন আর তা দিয়ে রুটি তৈরী করতেন।তিঁনি কাপড়ে তালি লাগানোর কাজও করতেন।এ মহিয়সী রমণী সকলের চেয়ে বেশী রূপসী ছিলেন এবং তাঁর পবিত্র গাল দু’টি সৌন্দর্যে পুষ্পের ন্যায় ফুটে ছিল। আল্লাহর দরূদ তিনি সহ তাঁর পিতা,স্বামী ও সন্তানদের উপর বর্ষিত হোক।”
[রাওদ্বাহ্ আল কাফি,পৃ: ১৬৫,ইসলামিয়া প্রেস,তেহরান থেকে প্রকাশিত।]

হযরত আলী (আ:) বলেছেন: “ফাতেমা মশক দিয়ে এতই পানি উত্তোলন করেছেন যার ফলে তাঁর বক্ষে ক্ষতের ছাপ পড়ে যায়,তিঁনি হস্তচালিত যাতাকলের মাধ্যমে এত পরিমান আটা তৈরী করেছেন যার কারণে তাঁর হাত ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়,তিঁনি এত পরিমান ঘর রান্না-বান্নার কাজ করেছেন যে তাঁর পোশাক ধুলি  ধোঁয়া মাখা হয়ে যেত।এ ব্যাপারে তিঁনি প্রচুর কষ্ট স্বীকার করেছেন।”
[বিহারুল আনওয়ার,৪৩তম খণ্ড,পৃ. ৪২, ৮২; বাইতুল আহযান,পৃ: ২৩]

★উল্লেখ্য যে তিনি মদীনার দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষদের মধ্যে বিতরণের জন্য প্রতিদিনই রুটি প্রস্তুত করতেন।হযরত ফাতিমা খুবই সাধারণ জীবন যাপন করতেন।সংসারের যাবতীয় কাজ তিনি নিজের হাতে করতেন। তাঁর কাজে সাহায্যের জন্য কোন দাস-দাসী ছিল না। মশক দিয়ে পানি উত্তোলনের ফলে তাঁর শরীরে দাগ পড়ে গিয়েছিল।তিঁনি যাঁতার মাধ্যমে এত পরিমাণ আটা তৈরি করতেন যে,তাঁর হাতে ফোস্কা পড়ে যেত। আর তিনি সেই আটা দিয়ে রুটি তৈরি করে মদীনার দরিদ্র ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করতেন।হযরত ফাতিমা কাপড়ে তালি লাগিয়ে সেই কাপড় পরিধান করতেন। পার্থিব কোন বস্তুই তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারত না। আর এজন্যই রাসূল (ﷺ) তাঁকে ‘বাতুল’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

★৪. মদীনায় হিজরতঃ ইসলাম প্রচারের ত্রয়োদশ বর্ষে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (ﷺ) মহান আল্লাহর নির্দেশে মদীনায় হিজরত করেন।তাঁর হিজরত করার সময় হযরত ফাতিমা মক্কাতেই অবস্থান করছিলেন।কয়েকদিন পর হযরত আলী (আ:) হযরত ফাতিমা ও বনু হাশিমের আরও কয়েকজন নারীসহ হিজরত করেন।

মন্তব্য করুন

ব্লগ