সহকারী শিক্ষক
১৫ অক্টোবর, ২০২৪ ০৬:০০ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ডালিমের রোগবালাই ও প্রতিকারঃ
ডালিমের প্রজাপতি বা ফলছিদ্রকারী পোকাঃ ডালিম ফলের মারাত্মক শত্রু পোকা হচ্ছে ডালিমের প্রজাপতি বা ফলছিদ্রকারী পোকা। এই প্রজাতির শূঁককীট ফলের ক্ষতি করে থাকে। স্ত্রী প্রজাপতি ফুল ও ছোট ফলের ওপর ডিম পাড়ে। সেই ডিম থেকে শূঁককীট বের হয়ে বর্ধনশীল ফলে ছিদ্র করে ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং ফলের বীজ ও অন্যান্য অংশ খেয়ে ফেলে। পরবর্তীতে শূঁককীট থেকে মূককীটে পরিণত হওয়ার পূর্বে ফলের ত্বকে গোলাকার ছিদ্র করে ফল থেকে বের হয়ে আসে। এই পোকা দ্বারা আক্রান্ত ফলে মাধ্যমিক সংক্রমণ ( Secondary Infection ) হিসেবে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ হতে পারে।
প্রতিকারঃ
(ক) আক্রান্ত ফল গাছ থেকে পেড়ে বা মাটিতে পড়ে থাকা আক্রান্ত ফল কুড়িয়ে নষ্ট করে ফেলতে হবে।
(খ) গাছে ফল ধরার পর ফলের বৃদ্ধি শুরু হলে কাপড় বা পলিথিন বা কাগজ দিয়ে ফল ব্যাগিং করে দিলে এ পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।
(গ) এছাড়া প্রতি লিটার পানিতে এক মিলিলিটার হারে ম্যালাথিয়ন বা কার্বারিল ( এসিকার্ব ) বা ফস্ফামিডন গ্রুপের কীটনাশক ১২- ১৫ দিন পর পর গাছে ও ফলে স্প্রে করতে হবে।
কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকাঃ কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ সাধারণত পরিচর্যাবিহীন গাছে দেখা যায়। এই পোকার শূঁককীট রাতের বেলা কাণ্ড ও শাখার ছাল ছিদ্র করে ভেতরে প্রবেশ করে এবং ভেতরের অংশ খেতে থাকে। দিনের বেলা ডালের গর্তের মধ্যে এই শূঁককীট লুকিয়ে থাকে ও বর্জ্য পদার্থ ত্যাগ করে। কাণ্ড বা শাখায় ছোট ছোট ছিদ্র বা বর্জ্য পদার্থ দেখে এ পোকার আক্রমণ লক্ষ করা যায়।
প্রতিকারঃ
(ক) গর্তের মধ্যে সরু তার ঢুকিয়ে পোকার কীড়াকে খুঁচিয়ে মারার ব্যবস্থা করতে হবে।
(খ) গর্ত থেকে এ পোকার কীড়ার বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার করে গর্তে ইনজেকশনের সিরিঞ্জ বা তুলার সাহায্যে কেরোসিন বা পেট্রোল ঢুকিয়ে কাদা দিয়ে গর্ত বন্ধ করে দিলে পোকা মারা যাবে।
রস শোষণকারী পোকাঃ ছাতরা পোকা, সাদা মাছি, শুল্ক বা আঁশ পোকা, থ্রিপস, জাব পোকা ও মাকড় ডালিমের রস শোষণকারী পোকা হিসেবে বিবেচিত। এসব পোকার আক্রমণে পাতা, মুকুল, ফুল ও ছোট ফল ঝরে পড়ে। সাদা মাছি ও জাব পোকা পাতা ও কচি ডগার রস চুষে খায়। ফলশ্রুতিতে আক্রান্ত অংশ বিবর্ণ ও বিকৃত হয়ে যায়। এছাড়া এসব পোকার দেহ থেকে এক ধরনের মধু নিঃসৃত হয়, যা পাতায় লেগে থাকে। পরবর্তীতে পাতার গায়ে এই নিঃসৃত মধুর ওপর এক প্রকার ছত্রাক জন্মায়। ফলে গাছের খাদ্য তৈরি প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হয়। মাকড় ও থ্রিপস পোকা পাতা, ফুলের বোঁটা, বৃতি ও দলমণ্ডলের অংশ ক্ষত করে এবং ক্ষত থেকে বের হওয়া কোষরস খায়। ফলে পাতার আগা কুঁকড়ে যায় এবং ফুল ঝরে যাওয়ায় ফলধারণ বাধাপ্রাপ্ত হয়।
প্রতিকারঃ
(ক) ছাতারা পোকা ও শুল্ক পোকার কীট দমনের জন্য আক্রমণের প্রথম দিকে আক্রান্ত অংশ কেটে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। এর পর প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি হারে ডায়াজিনন দলীয় কীটনাশক পানিতে মিশিয়ে গাছে স্প্রে করতে হবে।
(খ) জাব পোকা বা সাদামাছি দমনের জন্য প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি হারে ডাইমেথয়েট (টাফগর ) অথবা ০.৫ মিলি হারে ইমিডাক্লোপ্রিড ( ইমিটাফ, টিডো,টিডো প্লাস ) দলীয় কীটনাশক পানিতে মিশিয়ে ১০-১২ দিন পর পর গাছে দুই বার স্প্রে করতে হবে।
(গ) মাকড় দমনের জন্য প্রতি লিটার পানিতে ১.২৫ মিলি হারে ভার্টিমেক/ সানমেক্টিন এবং ২ গ্রাম হারে সালফার ছত্রাকনাশক পানিতে মিশিয়ে গাছে স্প্রে করতে হবে।
ফলের দাগ রোগঃ এই রোগ ছত্রাকজনিত কারণে হয়ে থাকে। ফল গাছ এ রেগে আক্রান্ত হলে আক্রান্ত ফলের ওপর অনেক ছোট ও অনিয়মিত দাগ পড়ে। এই দাগগুলোর চারিদিকে সবুজ হলদে দাগ থাকে। পরবর্তীতে দাগগুলো লম্বা দাগে পরিণত হয়। ফলের খোসার নিচের বীজগুলো বাদামি বর্ণের হয়ে যায়। আক্রান্ত ফলের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বাজার মূল্য কমে যায়।
প্রতিকারঃ রোগাক্রান্ত অংশ কেটে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মেনকোজেব (ইণ্ডোফিল এম ৪৫/ ডিইথেন এম ৪৫) বা ১ গ্রাম হারে কার্বান্ডিজম( নোইন/ অটোস্টিন/এমকোজিম) ছত্রাকনাশক পানিতে মিশিয়ে ৮-১০ দিন পর পর গাছের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত ২-৩ বার ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে।
ফল পচা রোগঃ ছত্রাকজনিত এই রোগটি সাধারণত বর্ষাকালে দেখা যায়। এ রোগের জীবাণু দিয়ে ফুল আক্রান্ত হলে ফলধারণ বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং কচি ফল ঝরে যায়। ফলের গায়ে, বিশেষ করে বোঁটায় হলদে বা কালো দাগ দেখে এ রোগের আক্রমণ বোঝা যায়। এই রোগের আক্রমণে ফলের খোসা কুঁচকে যায় ও ফলের ওজন কমে যায়। আক্রান্ত ফল কাঁচা থাকে, আকার ছোট হয় এবংফলের উজ্জ্বলভাব নষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তীতে ফল নরম হয়ে পচে যায়।
প্রতিকারঃ ফল পচা রোগের প্রতিকার ফলের দাগ রোগের প্রতিকারের অনুরূপ।
ফল ফেটে যাওয়াঃ ডালিমের ফল ফেটে যাওয়া একটি মারাত্মক সমস্যা। এটি কোন ছত্রাকজনিত রোগ নয়। এটি সাধারণত পুষ্টি উপাদানের অভাবজনিত কারণে বা মাটিতে রসের তারতম্যের কারণে হয়ে থাকে। ফলের বৃদ্ধির সময় শুকনো আবহাওয়ায় মাটিতে রসের অভাব দেখা দিলে ফলের বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয়। এজন্য ফলের ত্বক শক্ত হয়ে যায়। এরপর হঠাৎ বৃষ্টি হলে মাটিতে রসের আধিক্য ঘটলে ফলের ভেতরের অংশ দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পায়। যার কারণে ভেতরের চাপ সহ্য করতে না পেরে ফলের খোসা ফেটে যায়।
প্রতিকারঃ
(ক) ডালিম গাছে ফল ধরার পর থেকে গাছে ঘন ঘন পানি সেচ দিতে হবে।
(খ) মাটিতে বোরনজনিত সার যেমন বোরিক এসিড প্রতি গাছে ৪০ গ্রাম হারে মাটিতে প্রয়োগ করতে হবে।
(গ) ফলের বৃদ্ধির সময় সলুবর বোরন ২ গ্রাম/লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ফলে ও গাছে ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে।
(ঘ) তাছাড়া ডালিমের যেসব জাতে ফল ফাটা সমস্যা নেই সেসব জাতের ডালিমের চাষাবাদ করতে হবে।
ফল সংগ্রহঃ আনারের কলমের গাছে ৩-৪ বছর থেকেই ফলন দেওয়া শুরু হয়। ফুল আসার পর থেকে ফল পাকা পর্যন্ত ৬ মাস সময় লাগে। পরিপুষ্ট ফলের খোসার রঙ হলদে বাদামি হয়ে এলেই ফল পাড়াতে হবে। গাছে ফল বেশি দিন রেখে দিলে ফল ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যেসব গাছে ফল ফেটে যাওয়ার প্রবণতা থাকে সেসব গাছের ফল পুষ্ট হওয়ার কিছু আগেই পেড়ে নেওয়ায় উত্তম। তবে অপুষ্ট ফলের স্বাদ ও গুণাগুণ খুব একটা ভালো হয় না। ডালিমের খোসা বেশ শক্ত এজন্য পাকা ফল অনেক দিন সংরক্ষণ করা যায় এবং বাজারজাত করার সময় পরিবহনকালেও ফল সহজে নষ্ট হয় না।
১
১ মন্তব্য