সহকারী শিক্ষক
১৮ অক্টোবর, ২০২৪ ০৮:০৩ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় ফকির লালন শাহের ১৩৪তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে লাখো ভক্ত ও অনুসারীর সমাগমে মুখরিত কালীগঙ্গার তীর। বাউল সম্রাটের সাধন-ভজনা, আধ্যাত্মিক গানের সুর, এবং মানবধর্মের বাণী ছড়িয়ে চলছে বাউলদের মিলনমেলা। দেশ-বিদেশ থেকে আসা ভক্তরা লালনের জীবন ও দর্শনের আলোয় অনুপ্রাণিত হয়ে ছুটে এসেছেন, যেখানে সাম্প্রদায়িকতা ও বিভেদের ঊর্ধ্বে রয়েছে একজাত মানবধর্মের মর্মবাণী।
কুষ্টিয়া শহরতলির ছেঁউড়িয়ায় গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের ১৩৪তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে লালন উৎসব। বাংলা ১২৯৭ সালের পহেলা কার্তিক (ইংরেজি ১৬ অক্টোবর) সাধক পুরুষ লালন সাঁই এই ছেঁউড়িয়াতেই দেহত্যাগ করেন। এর পর থেকে তাঁর অনুসারীরা কালীগঙ্গার তীরে এই আখড়া বাড়িতে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি স্মরণ করেন। প্রতিবছরের মতো এবারও সাধক লালনের দর্শন লাভের আশায় প্রাণের টানে ছুটে এসেছেন লাখো মানুষ।
এই উৎসব ঘিরে এখন চলছে গুরু-শিষ্য ও ভক্ত-অনুসারীদের মিলনমেলা।
‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’—এই স্লোগান সামনে রেখে গতকাল সন্ধ্যায় এ উৎসবের উদ্বোধন করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। কুষ্টিয়ার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মোছা. শারমিন আখতারের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাঈদ মাহামুদ বেলাল হায়দার, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ নসরুল্লাহ, পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ, জেলা বিএনপির সদস্যসচিব ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার, ছাত্র-জনতা প্রতিনিধি এস এম সুইট, আলমাস হাসান মামুন প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রশিদুজ্জামান।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন ও লালন একাডেমি এই উৎসবের আয়োজন করেছে। উৎসবের সঙ্গে শুরু হয়েছে তিন দিনের লালন মেলাও।
এর আগে সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে লালনের আখড়া বাড়িতে সমবেত সাধু-বাউলরা চাল-জল গ্রহণের মাধ্যমে তিরোধান দিবসের গুরুকর্মের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। আজ শুক্রবার সকালে গোষ্ঠ গানের মাধ্যমে সাধুরা দ্বিতীয় দিনের আচার শুরু করবেন।
লালনের মাজার ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সাম্প্রদায়িকতা, সহিংসতা এবং সংঘাতমুক্ত জাত-পাতহীন মানবধর্মের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে উৎসবস্থলে এসেছেন ভক্ত-অনুসারীরা।
সেইসঙ্গে মরমি সাধক এই বাউল সম্রাটের জীবন-কর্ম, ধর্ম-দর্শন, সংগীত ও চিন্তচেতনা থেকে শিক্ষা নিতে দেশ-বিদেশের লাখো ভক্ত-অনুরাগী, দর্শনার্থী এখন ভিড় করেছে ছেঁউড়িয়ায়।
পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, উৎসবকে সফল করতে র্যাব, পুলিশ ও ট্যুরিস্ট পুলিশের সমন্বয়ে শহর ও মাজারকেন্দ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
শিল্পকলায় তিন দিনের ‘লালন স্মরণোৎসব’
নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে গতকাল গানে ও তত্ত্বে লালন সাঁইজিকে স্মরণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে তিন দিনের ‘লালন স্মরণোৎসব’। এদিন সন্ধ্যায় উৎসব উদ্বোধন করেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ।
প্রথম দিন একাডেমির চারুকলা বিভাগের আয়োজনে শিল্পী অরূপ রাহী ও জহুরা ফকিরানীর পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ভাবানুষঙ্গিক গান ও কথার অনুষ্ঠান ‘আশাসিন্ধুতীরে’। জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদ।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি শারমিন এস মুরশিদ বলেন, ‘আমাদের পরিচয়টাকে আরো বিকাশ করতে হবে। এ জন্য নানা রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নিতে হবে এবং মানুষের কাছে পৌঁছতে হবে। আমাদের আত্মপরিচয়ের ধারা আবার তৃণমূলে মানুষের মাঝে নাড়া দিক। ২০২৪ আমাদের নতুন করে দেশ গড়ার সুযোগ দিচ্ছে। এবার যেন আমরা ভুল না করি। এবার যেন মিথ্যাকে মিথ্যা, ন্যায়কে ন্যায়, অন্যায়কে অন্যায়, সত্যকে সত্য বলি। যে সাহস দেখিয়ে আমাদের হাজারো বাচ্চা মৃতুকে বরণ করল, সেই সাহস যেন আমাদের থাকে। ৫ আগস্টের আগের মিথ্যাচার ও ভণ্ডামিতে যেন ফিরে না যাই। এই সমাজ অন্যায়কে গ্রহণ করে না।’
স্বাগত বক্তব্যে চারুকলা বিভাগের পরিচালক মোস্তাফা জামান জানান, শিল্পকলা একাডেমি নতুনভাবে চলা শুরু করেছে। এ পথের পাথেয় হিসেবে একাডেমি লালন সাঁইজিকে বেছে নিয়েছে। এ কারণে তাঁর ১৩৪তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী ‘লালন স্মরণোৎসব ২০২৪’-এর এই আয়োজন।
আজ শুক্রবার উৎসবের দ্বিতীয় দিন একাডেমির নন্দন মঞ্চে থাকবে সাধুমেলা ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। আগামীকাল উৎসবের তৃতীয় দিনের আয়োজন অনুষ্ঠিত হবে দুটি পর্বে। প্রথম পর্বে শনিবার বিকেল ৪টায় জাতীয় নাট্যশালার সেমিনারকক্ষে থাকবে ‘জাতিসত্তার প্রশ্ন এবং বাউল-ফকির পরিবেশনার রাজনীতি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক আ-আল মামুন। আলোচনা করবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ আজম, পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ; নাট্যকার, লেখক ও গবেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. শাহমান মৈশান।
৬৫
১০০ মন্তব্য