প্রধান শিক্ষক
২০ অক্টোবর, ২০২৪ ০৭:০১ অপরাহ্ণ
শৈশবের সেই ফেলে আসা দিনগুলো
শৈশব স্মৃতি
আমার নাম আবদুল্লাহ। আমি বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্মেছি এবং বেড়ে উঠেছি। আমার শৈশবের দিনগুলো ছিল এমন এক সময়, যা আজও মনে হলে হৃদয় ভরে ওঠে। সবুজ ধানক্ষেত, সরু মেঠোপথ, পুকুরের স্বচ্ছ পানি, আর মসজিদের আজানের ধ্বনি—সবকিছু মিলে এক স্বপ্নের মতো জীবন ছিল সেই সময়টা।
আমাদের গ্রামটা খুব ছোট ছিল, কিন্তু ভালোবাসায় ভরা। গ্রামের এক প্রান্তে ছিল ছোট্ট একটা মসজিদ, যা আমার শৈশবের অন্যতম বড় অংশ হয়ে উঠেছিল। ছোটবেলা থেকেই বাবার হাত ধরে আমি প্রতিদিন ফজরের নামাজে যেতাম। বাবা তখন মাথায় টুপি পরে, হাতে মসলিনের এক টুকরো রুমাল নিয়ে মসজিদে যেতেন। তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন, নামাজ মানুষের অন্তরকে পবিত্র করে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের সবচেয়ে সুন্দর উপায়। ছোট থাকায় আমি হয়তো নামাজের সব নিয়ম ঠিকঠাক বুঝতাম না, তবে মসজিদের শান্তিময় পরিবেশ, মুসুল্লিদের একত্রে নামাজ পড়া, আর ইমামের হৃদয়গ্রাহী কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত আমার মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিত।
আমাদের বাড়ি ছিল একটা বড় বাগানের ভেতর। চারপাশে ছিল আম, কাঁঠাল, আর নারকেল গাছ। গাছগুলো যেন আমাদের পরিবারের অংশ ছিল। গ্রীষ্মকালে আম গাছগুলো পাকা আমে ভরে যেত, আর আমরা ছেলেমেয়েরা মিলে গাছের নিচে দৌড়াদৌড়ি করে আম কুড়িয়ে খেতাম। আমার ছোট বোন মরিয়ম ছিল আমার সব খেলাধুলার সঙ্গী। আমরা মিলে বাড়ির পেছনের পুকুরে যেতাম, যেখানে কচুরি পানার ভেতর লুকিয়ে ছোট মাছ ধরার চেষ্টা করতাম। পুকুরের পানি এতটা স্বচ্ছ ছিল যে পানিতে নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখা যেত।
আমার শৈশবের অন্যতম সুন্দর স্মৃতি হলো রমজান মাস। এই মাসটি ছিল আমাদের জন্য বিশেষ আনন্দের। সেহরি ও ইফতারের সময় পরিবারের সবাই মিলে একত্র হতো, আর মা অনেক ধরনের মজার খাবার তৈরি করতেন। ইফতারের আগে মসজিদের মাইকে যখন আজান শোনা যেত, তখন মনে একটা অন্যরকম অনুভূতি কাজ করত। পুরো গ্রামের মানুষ যেন একসাথে ইফতারের জন্য প্রস্তুত হতো। আর রাতে তারাবিহ নামাজে মসজিদে যাওয়াটা ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজ। ইমাম সাহেবের তিলাওয়াত শুনে মনটা প্রশান্ত হয়ে যেত।
ঈদ ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত উৎসব। রোজার মাসের শেষে যখন ঈদের চাঁদ দেখা যেত, তখন পুরো গ্রাম আনন্দে মেতে উঠত। বাবা আমাকে আর আমার ছোট ভাইকে নতুন পাঞ্জাবি কিনে দিতেন। ঈদের দিন সকালে ফজরের নামাজের পর আমরা সবাই মিলে ঈদের মাঠে যেতাম ঈদের জামাতে অংশ নিতে। নামাজ শেষে সবাইকে আলিঙ্গন করতাম, একে অপরকে "ঈদ মোবারক" জানাতাম। ঈদের দিন দুপুরে মায়ের হাতে বানানো সেমাই আর মাংসের স্বাদ যেন এখনো মুখে লেগে আছে।
তবে আমার শৈশবের সবচেয়ে বড় উপহার ছিল আমার দাদা। দাদা ছিলেন গ্রামের সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি। তিনি কুরআন শরিফ তিলাওয়াত করতেন, আর সন্ধ্যাবেলা আমাদেরকে নবীজির (সা.) জীবনী থেকে বিভিন্ন ঘটনা শোনাতেন। আমি আর আমার ভাইবোনেরা দাদার মুখে সেই গল্প শুনতে বসে থাকতাম। তিনি হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনের ঘটনা, সাহাবিদের সাহসিকতা, আর ইসলামিক ইতিহাসের বিভিন্ন শিক্ষামূলক কাহিনি বলতেন। দাদার এই গল্পগুলো আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নৈতিকতা ও আদর্শ শেখাত।
আমাদের গ্রামটি যদিও ছোট ছিল, তবু আমরা সেখানেই সবকিছু খুঁজে পেতাম। গ্রামের স্কুলে আমি আর আমার বন্ধুরা একসঙ্গে পড়তাম। স্কুলের সময় শেষে আমরা খেলার মাঠে ফুটবল খেলতাম। রতন, জাবির, আর সেলিম ছিল আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমরা মিলে মসজিদের পাশের বড় মাঠে লাঠি খেলা, দড়ি লাফানো, আর মাঝেমধ্যে বৃষ্টির দিনে ফুটবল খেলতাম। বৃষ্টির পানি মাঠ ভাসিয়ে দিত, আর কাদামাটিতে আমরা খেলে সারা গা ময়লা করতাম। মা যখন দেখতেন, তখন মুখে হাসি ফুটে উঠত, যদিও ধমকও দিতেন।
আমাদের গ্রামে মাঝে মাঝে ইসলামী মাহফিল বা ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন হতো। তখন গ্রামে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতো। দূর-দূরান্ত থেকে মাওলানা সাহেবেরা এসে ওয়াজ করতেন। গ্রামের মুরুব্বিরা মঞ্চের সামনে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে ওয়াজ শুনতেন, আর আমরা ছোটরা পেছনে বসে গল্প শুনতাম। এসব মাহফিল থেকে ধর্মের ব্যাপারে অনেক কিছু শিখতাম, বিশেষত দয়া, ক্ষমাশীলতা, আর আল্লাহর ওপর ভরসা করার গুরুত্ব।
শৈশবের প্রতিটি দিনই ছিল যেন এক নতুন অধ্যায়। কোনো চিন্তা-ভাবনা ছিল না, ছিল না কোনো দায়িত্ব। শুধু ছিল হাসি, খেলা, আর মসজিদের শান্ত পরিবেশে নামাজ পড়ার অভ্যাস। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দিনগুলো হারিয়ে গেল। আমি বড় হতে থাকলাম, স্কুলের পড়াশোনার চাপ বাড়ল, আর একসময় উচ্চশিক্ষার জন্য শহরে চলে গেলাম।
আজ এত বছর পর শহরের ব্যস্ত জীবনযাত্রায় যখনই গ্রামের কথা মনে পড়ে, তখন মনটা বিষণ্ন হয়ে ওঠে। আমার শৈশবের সেই দিনগুলো, মসজিদের আজান, দাদার গল্প, ঈদের উৎসব, আর গ্রামের সরল জীবন—সবকিছু যেন আজ শুধুই স্মৃতি। গ্রামের সেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, কাঁঠাল গাছের ছায়ায় বসে বন্ধুরা মিলে খেলাধুলা করা, আর নদীর পাড়ে বসে প্রকৃতির সুর শোনা—সবই যেন হারিয়ে গেছে।
তবে শৈশবের স্মৃতিগুলো আজও আমার হৃদয়ের গভীরে জমে আছে। জীবনের নানা ব্যস্ততার মাঝে, যখন ক্লান্তি এসে ভর করে, তখন শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে মনটা হালকা হয়ে যায়। আল্লাহর ওপর ভরসা করে চলতে শিখেছি শৈশবের সেই শিক্ষাগুলো থেকে। আমাদের জীবনে শান্তি ও সফলতা পেতে হলে শৈশবের সেই সরলতা, বিশ্বাস, আর ভালোবাসার অনুভূতিগুলোই ধরে রাখতে হবে।
শৈশবের সেই মধুর দিনগুলো হয়তো আর ফিরে আসবে না, তবে সেই স্মৃতিগুলো আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আমাকে প্রেরণা দেয়।
৪
৭ মন্তব্য