প্রধান শিক্ষক
২০ অক্টোবর, ২০২৪ ০৭:০৭ অপরাহ্ণ
একদিনের জন্য স্কুল ফাঁকি দিলে কী এমন হবে?
স্কুল পালানো
আমার নাম আরাফাত। আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। আমাদের ছোট্ট গ্রামের মাটির রাস্তা আর গাছপালার ছায়ায় ঘেরা স্কুলটি ছিল আমার সবচেয়ে কম প্রিয় জায়গা। প্রতিদিন সকালে স্কুলে যেতে আমার একেবারেই ভালো লাগত না। পড়াশোনা আমার কাছে খুব কঠিন আর বিরক্তিকর মনে হতো, বিশেষ করে অঙ্ক আর ইংরেজি। স্কুলের রুটিন, ক্লাস টেস্ট, আর শিক্ষকদের কঠোর নিয়ম মেনে চলা যেন আমার জন্য দুঃস্বপ্ন ছিল।
আমার বাবার কড়া নির্দেশ ছিল, আমি যেন নিয়মিত স্কুলে যাই এবং নামাজ ঠিকমতো পড়ি। বাবা ছিলেন গ্রামের একজন সম্মানিত ব্যক্তি এবং ইসলামি জীবনযাপন ও শিক্ষার প্রতি তার বিশেষ গুরুত্ব ছিল। তিনি সবসময় বলতেন, "ইসলাম আমাদের শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়, পৃথিবীর প্রতিটি বিষয়ে শিক্ষার ওপর জোর দেয়। তুমি পড়াশোনা করে যদি ভালো মানুষ না হও, তাহলে জীবনে সফলতা পাবে না।" যদিও বাবার কথা আমি বুঝতাম, তবু স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছা আমার কখনোই ছিল না।
একদিন রাফি, আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আমাকে বলল, "আরাফাত, আজকে স্কুল পালিয়ে নদীর ধারে যাবি? সেখানে একটা নতুন মাছ ধরার ফাঁদ বানিয়েছি। কত বড় বড় মাছ ধরব, ভাবতেও পারিস না!" রাফির প্রস্তাবটা শুনে আমার মন একদম লাফিয়ে উঠল। স্কুলের ক্লাস আর কঠিন পাঠের বদলে নদীর ধারে গিয়ে মাছ ধরার মজা—এমন সুযোগ তো হাতছাড়া করা যায় না!
আমি কিছুক্ষণ দ্বিধায় ছিলাম। বাবা যদি জানতে পারেন, তাহলে তিনি খুব রাগ করবেন, আর মা-ও হয়তো কড়া ধমক দেবেন। কিন্তু রাফি যখন আমাকে আশ্বাস দিল, "কেউ জানতে পারবে না, আমরা সময়মতো ফিরে আসব," তখন মনে হল, একদিনের জন্য স্কুল ফাঁকি দিলে কী এমন হবে? স্কুল তো প্রতিদিনই আছে!
পরদিন সকালে স্কুলের পোশাক পরে, বই-খাতা নিয়ে আমি বাড়ি থেকে বের হলাম। মা আমাকে দরজা পর্যন্ত বিদায় জানিয়ে বললেন, "বাবা, ঠিকমতো স্কুলে যাস, আর নামাজের কথা ভুলিস না।" আমি মায়ের কথায় মাথা নাড়ালাম, কিন্তু মনে মনে জানতাম আজকের পরিকল্পনা ভিন্ন। রাফি আর আমি স্কুলের পথে কয়েকটা মোড় পেরিয়ে পেছনের সরু গলিতে ঢুকে গেলাম। সেখানে কয়েকটা বড় গাছ ছিল, যেগুলোর পেছনে লুকিয়ে আমরা মাটির রাস্তা পেরিয়ে নদীর দিকে হাঁটা শুরু করলাম।
নদীর পাড়ে গিয়ে আমরা বসে পড়লাম। সকালবেলা হালকা বাতাস বইছিল, আর পানির নরম ঢেউ আমাদের পায়ের কাছে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। রাফি বড়শি ফেলে মাছ ধরার চেষ্টা করছিল, আর আমি পানির পাশে বসে ছোট পাথর ছুড়ে স্রোতের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। চারপাশে কেবল পাখির ডাক আর বাতাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সবকিছু এতটা শান্ত ছিল যে স্কুলের চিন্তা একেবারেই ভুলে গেলাম।
কিছুক্ষণ পর রাফি আনন্দে চিৎকার করে উঠল, "দেখ, একটা মাছ ধরেছি!" সে বড়শিতে একটা মাঝারি সাইজের মাছ তুলে আনল, আর আমরা দুজন খুব খুশি হয়ে গেলাম। মাছ ধরার আনন্দে সময় কীভাবে চলে গেল, বুঝতেই পারলাম না। হঠাৎ মনে হলো, অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে। রাফি বলল, "চল, এখন ফিরে যাই, না হলে সবাই সন্দেহ করবে।"
আমরা নদীর পাড় থেকে উঠে পড়লাম এবং গ্রামের দিকে হাঁটা দিলাম। কিন্তু রাস্তায় যখন আমরা ফিরে আসছিলাম, তখন হঠাৎ গ্রামের মসজিদ থেকে আসরের আজান শোনা গেল। আমি চমকে উঠলাম। আসর! মানে তো স্কুলের পুরো সময় পেরিয়ে গেছে!
আমার মনে ভয় ঢুকে গেল। বাবা যদি জানতে পারেন, তাহলে কী হবে? স্কুল পালানোর কথা তো গোপন থাকল না! আমরা তাড়াহুড়ো করে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলাম। আমি আর রাফি ভেবেছিলাম, বাড়িতে ঢুকে বলব স্কুলের পড়া শেষ করে এসেছি। কিন্তু যখন বাড়ির কাছে পৌঁছলাম, দেখি বাবা উঠোনে বসে আছেন। তাঁর চোখে সন্দেহের ছায়া।
“আজ স্কুলে কী শিখলে?” বাবা সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন। আমি কয়েক মুহূর্ত থমকে গেলাম। কী বলব, বুঝতে পারলাম না। তখন বাবার মুখটা আরও গম্ভীর হয়ে গেল। তিনি জানতেন আমি মিথ্যা বলব।
“আজ তো স্কুলে পড়াশোনার বদলে নদীর ধারে মাছ ধরতে গিয়েছিলে, তাই না?” বাবার কথায় আমার মুখ শুকিয়ে গেল। কীভাবে তিনি জানলেন? কিছু বলার আগেই বাবা কঠিন স্বরে বললেন, “তোমার শিক্ষক ফোন করেছিলেন। তুমি আজ ক্লাসে ছিলে না, তিনি আমাকে জানিয়েছেন।”
আমি বুঝলাম, মিথ্যা আর বলা যাবে না। মাথা নিচু করে বাবার সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম। বাবা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “আরাফাত, তুমি কি জান, মিথ্যা বলা ইসলামে কতটা নিন্দনীয়? রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিম মিথ্যা বলতে পারে না।’ তুমি স্কুলে না গিয়ে আমাকে, তোমার মাকে, এমনকি নিজেকেও ধোঁকা দিয়েছ। তোমার যদি স্কুলে কোনো সমস্যা থাকে, আমাকে বলতে পারতে। কিন্তু এইভাবে মিথ্যা বলা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।”
বাবার কথা শুনে আমার চোখে পানি চলে এলো। সত্যিই, আমি ভুল করেছি। স্কুলের প্রতি আমার অনাগ্রহের জন্যই আজ এমন একটা ভুল করলাম, যা আমার জন্য লজ্জার হয়ে দাঁড়াল।
বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “জীবনে মজা করতেই পারো, কিন্তু নিজের দায়িত্ব কখনো ভুলে যেও না। আল্লাহ আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজে সৎ থাকতে বলেছেন। তুমি যদি সৎভাবে নিজের দায়িত্ব পালন না করো, তাহলে জীবনে কোনো কিছুতে সফল হতে পারবে না।”
সেদিন আমি বাবার কথার গভীরতা প্রথমবারের মতো বুঝতে পারলাম। বাবার চোখে কোনো রাগ ছিল না, ছিল কেবল হতাশা। আমি বাবাকে কথা দিলাম, আর কখনো মিথ্যা বলব না এবং স্কুলের দায়িত্ব এড়িয়ে যাব না।
সে রাতেই আমি মায়ের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইলাম। মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “মানুষ ভুল করেই, তবে সেই ভুল থেকে যদি শিক্ষা নেয়া যায়, তবেই সেটা সঠিক পথ।”
সেদিনের পর থেকে স্কুল পালানো বা কোনো দায়িত্ব এড়িয়ে চলার কথা আর কখনো ভাবিনি। ইসলামের শিক্ষা এবং বাবার নসিহত আমার জীবনের পথপ্রদর্শক হয়ে উঠল। আমি শিখেছি, জীবনে মজা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সৎ থাকা, দায়িত্ব পালন করা, এবং সর্বদা আল্লাহর ওপর ভরসা করা আমাদের সফলতার আসল চাবিকাঠি।
৭
৭ মন্তব্য