প্রভাষক
২১ অক্টোবর, ২০২৪ ০৬:৫০ পূর্বাহ্ণ
সাইবার অপরাধ ও আমাদের করনীয়
??সাইবার অপরাধ বা কম্পিউটার অপরাধ (Cyber Crime) এমন একটি অপরাধ যা কম্পিউটার এবং কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সাথে সম্পর্কিত।
সাইবার ক্রাইম একটি বিস্তৃত অপরাধমূলক কার্যকলাপকে অন্তর্ভুক্ত করে যা ডিজিটাল ডিভাইস এবং/অথবানেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সম্পাদিত হয়। এই অপরাধগুলির মধ্যে প্রতারণা, পরিচয় চুরি, ডেটা লঙ্ঘন, কম্পিউটার ভাইরাস, স্ক্যাম এবং অন্যান্য দূষিত কাজে প্রসারিত করার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার জড়িত।
? কম্পিউটার একটি অপরাধ সংঘটনে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে বা এটা নিজেই লক্ষ্য হতে পারে। দেবারতি হালদার ও কে জয়শংকর সাইবার অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করেছেন "আধুনিক টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক, যেমন ইন্টারনেট (চ্যাট রুম, ইমেল, নোটিশ বোর্ড ও গ্রুপ) এবং মোবাইল ফোন (এসএমএস / এমএমএস) ব্যবহার করে, অপরাধমূলক অভিপ্রায়ে কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে সম্মানহানি, কিংবা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি, বা ক্ষতির কারণ হওয়া"।
? এ ধরনের অপরাধ একটি জাতির নিরাপত্তা ও আর্থিক স্বাস্থ্য হুমকি হতে পারে। আইনগত বা আইনবহির্ভূতভেবে বিশেষ তথ্যসমূহ বাধাপ্রাপ্ত বা প্রকাশিত হলে গোপনীয়তার লঙ্ঘন ঘটে। হ্যাকিং, কপিরাইট লঙ্ঘন, শিশু পর্নোগ্রাফির মতো অপরাধগুলো বর্তমানে উচ্চমাত্রা ধারণ করেছে। লিঙ্গের ভিত্তিতে দেবারতি হালদার ও কে জয়শংকর নারীর প্রতি সাইবার অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করেছেন, "ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনের আধুনিক টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে, ইচ্ছাকৃতভাবে মানসিক এবং শারীরিক ক্ষতির উদ্দেশ্যে নারীর প্রতি অপরাধ"। আন্তর্জাতিকভাবে, রাষ্ট্রীয় বা ও-রাষ্ট্রীয় সত্তা কর্তৃক গুপ্তচরবৃত্তি, আর্থিক প্রতারণা, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, কিংবা অন্তত একটি রাষ্ট্রের স্বার্থ জড়িত এরূপ বিষয়ে হস্তক্ষেপজনিত সাইবার অপরাধকে সাইবার যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করা হয়।একটি রিপোর্ট (ম্যাকাফি কর্তৃক স্পন্সরকৃত) অনুমান করে যে, বিশ্ব অর্থনীতিতে বার্ষিক ক্ষতি ৪৪৫ বিলিয়ন ডলার।
?তবে একটি মাইক্রোসফটের রিপোর্ট দেখায় যে জরিপ ভিত্তিক অনুমান "একেবারে ভ্রান্ত" হয় এবং সত্যিকারের লোকসানকে অতিরঞ্জিত করে। অনলাইন ক্রেডিট এবং ডেবিট কার্ড জালিয়াতির ফলে ২০১২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় $ ১.৫ বিলিয়ন ডলার হারিয়ে গেছে।
? ২০১৬ সালে একটি গবেষণায় অনুমান করা হয়, সাইবার অপরাধের খরচ ২০১৯ সালে ২.১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে।
??ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল যুগের সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলছে সাইবার ক্রাইম বা প্রযুক্তিগত অপরাধও। অনেকেই সাইবার ক্রাইম শব্দটির সঙ্গে হয়তো পরিচিত নয়। পরস্পর নেটওয়ার্ক দ্বারা সংযুক্ত যন্ত্রসমূহ ব্যবহার করে যখন কোনো অপরাধ করা হয় তখন তাকে সাইবার ক্রাইম বলে। যারা এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকে তাদের সাইবার অপরাধী বলে।
?বাংলাদেশ সরকারের ই-গভর্নমেন্ট কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিমÑ বিজিডি ই-গভ সিআইআরটি নামে সংস্থাটি যারা বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিরোধ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করে তারা একটি বিবৃতির মাধ্যমে জানিয়েছে যে, বিভিন্ন আর্থিক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভোক্তা ও গ্রাহকদের লক্ষ করে সাইবার হামলার হুমকি রয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে যে, হুমকির পেছনে লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশে তাদের বটনেট ছড়িয়ে দেওয়া। এর আওতায় হামলাকারীরা বাংলাদেশ সরকারের করোনার টিকা দিতে নিবন্ধনের জন্য যে ওয়েবসাইট রয়েছে সেটির আদলে ভুয়া ওয়েবসাইট বানিয়ে মানুষকে আকর্ষণ বা ফিশিংয়ের চেষ্টা করে বলে জানানো হচ্ছে। ফলে চুরি হয়ে যাচ্ছে অনেক ব্যক্তিগত তথ্য। এ ছাড়াও চাকরি থেকে শুরু করে ব্যাংকিং ও স্বাস্থ্যসেবা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই মানুষ এখন অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে থাকে।
?সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে সবার আগে দরকার সচেতনতা। আর এ জন্য সচেতন করতে হবে শহর থেকে গ্রামের সব বয়সের মানুষকে। এ ছাড়াও কিছু পদক্ষেপ নিলে সহজেই সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। ই-মেইল ব্যবহারের সময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অপরিচিত কারও ই-মেইলে দেওয়া লিঙ্কে ক্লিক করা যাবে না। সন্দেহজনক ই-মেইল থেকে কখনও ফাইল ডাউনলোড করবেন না। হ্যাকাররা নকল লিঙ্কগুলোকে আসলের মতো করে উপস্থাপন করে, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। পাসওয়ার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে জটিল, একই সঙ্গে বড় ও ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা ও চিহ্ন ব্যবহার করা যেতে পারে। পাসওয়ার্ড বা কিপাররের মতো পাসওয়ার্ড মেসেঞ্জারও ব্যবহার করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। কোনো ই-মেইলে লগইন পেইজের লিঙ্ক দেওয়া থাকলে সেখানে ক্লিক না করে, ব্রাউজারে তাদের ওয়েবসাইটে গিয়ে সেখানে লগইন করুন। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ব্যাকআপ রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কম্পিউটার, ফোন ও ট্যাবে ব্যবহৃত সফটওয়্যারগুলো হালনাগাদ করা থাকতে হবে। টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশনের মতো অতিরিক্ত নিরাপত্তা স্তর ব্যবহার করা যেতে পারে। পিসিতে লুকানো ভাইরাস শনাক্ত করা খুব কঠিন, যা শুধু একটি অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার ব্যবহার করেই করা যেতে পারে।
?পুলিশের ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (সিডিএমএস) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সাইবার অপরাধের ঘটনায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় ৩ হাজার ৬৫৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৭৫টি মামলা সাইবার ট্রাইব্যুনালে গেছে। নিষ্পত্তি হয়েছে ৫২২টির। ২৫ মামলায় আসামিদের সাজা হয়েছে। ইউনিসেফের গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিশুদের মধ্যে ৩২ শতাংশ সাইবার হয়রানির মুখে পড়ছে। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে জাপানের ২২ বছর বয়সি হানা কিমুরা আত্মহত্যা করেন। অনলাইনে টেরাস হাউসের দর্শকদের ক্রমাগত সমালোচনার প্রতিক্রিয়ায় আত্মহত্যা করার আগে বেশ কয়েকটি টুইট করেছিলেন তিনি। কিমুরার টুইটগুলোতে আত্মহত্যার আভাস ছিল। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত দক্ষিণ কোরিয়ার ২৫ বছর বয়সি সল্লি সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেন। আপত্তিকর ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ায় পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার স্কুলশিক্ষার্থী রূপা গত বছর আগস্টে আত্মহত্যা করে।
?সাইবার হামলা এখন সারা পৃথিবীরই মাথাব্যথার কারণ। তাই আমাদের আরও সতর্ক থাকতে হবে। পাসওয়ার্ড হ্যাকিং, ই-মেইলের নিরাপত্তা, অনলাইনে প্রলোভন, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সাইট থেকে বিপদ, এটিএম কার্ডজনিত বিপদ, নেটব্যাংকিং ও মোবাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত প্রয়োজন। সরকারের আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং জনগণের সচেতনতাই পারে সাইবার আক্রমণ থেকে সবাইকে নিরাপদ রাখতে।
১৩
১৯ মন্তব্য