প্রভাষক
২১ অক্টোবর, ২০২৪ ০৭:২৭ অপরাহ্ণ
প্রভাষক
তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া এবং কালের কন্ঠ
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ডামাডোলে সার্কের প্রয়োজনীতা অস্বীকার করার সুযোগ দেখি না। বরং আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য এমন প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপুর্ণ অবদান রাখতে পারে।
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সংক্ষেপে সার্ক) দক্ষিণ এশিয়ার একটি আঞ্চলিক সংস্থা। এর সদস্য দেশগুলো বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান এবং আফগানিস্তান। চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, মায়ানমার, মরিশাস, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন হল সার্কের ৯টি পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র। সার্ক ১৯৮৫ সালের ৮ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে জেনারেল হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ দ্বারা সার্কের পথ চলা শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা নেতারা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশসমূহের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও সহযোগিতা করার লক্ষ্যে এক রাজকীয় সনদপত্রে আবদ্ধ হন। এটি অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং উন্নয়নের যৌথ আত্মনির্ভরশীলতা জোর নিবেদিত। সার্কের প্রতিষ্টাতা সদস্য সমূহ হল বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ, ভুটান এবং ২০০৭ সালে আফগানিস্তান সার্কের সদস্য পদ লাভ করে। রাষ্ট্রের শীর্ষ মিটিং সাধারণত বাৎসরিক ভিত্তিতে নির্ধারিত এবং পররাষ্ট্র সচিবদের সভা দুই বছর পর পর অনুষ্ঠিত হয়। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু সার্কের সদর দফতর অবস্থিত।
এই পর্যায়ে সার্কের আরো গতিশীল, আরো কর্মমুখর হওয়া প্রয়োজন। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ১৭০ কোটি জনসমষ্টির আশা-আকাঙ্ক্ষা সার্কের কর্মে প্রতিফলিত হওয়া একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের উদ্যোগ এবং কর্মপরিকল্পনায় তেমন কিছুর প্রকাশ দেখছি কি? ১৯৯৮ সালের ৩০ জুন ঢাকায় অনুষ্ঠিত কিছুসংখ্যক নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতা, কূটনীতিক ও বুদ্ধিজীবীর এক আলোচনা সভায় ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দর কুমার গুজরাল বলেছিলেন, 'ইতিহাসের গতি-প্রকৃতির ধারা হচ্ছে আমাদের এই উপমহাদেশে শান্তির রাজপথ দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করবে।
প্রফেসর এমাজ উদ্দীনের মতে- ' তিনি আরো বলেন, 'এ জন্য প্রয়োজন আমরা একত্রে বসে আলোচনা করি, যেমন পরিবারের সদস্যবৃন্দ শলাপরামর্শ করে এবং সমষ্টিগতভাবে সমস্যা সমাধানে প্রয়াসী হয়। এই হলো সার্কের মর্মবাণী বা সার্ক স্পিরিট'।
সার্কের এই মর্মবাণী যথার্থ অনুধাবনের জন্য আই কে গুজরাল সত্যি ধন্যবাদের পাত্র। তিনি যেভাবে এবং যে ভাষায় এসব কথা বলেছেন, তিনিও জানেন, দুই দশক আগে বাংলাদেশের এক কৃতী সন্তান, প্রেসিডেন্ট জিয়া আরো জোরেশোরে এমনি কথা বলেছিলেন। সার্কের মর্মবাণী সম্পর্কে আই কে গুজরাল ১৯৯৮ সালে যা বলেছিলেন, সার্ক পরিবার, বিশেষ করে বিশাল ভারত এখনো কি তা বিশ্বাস করে? এটা তো সত্যি যে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার মূল প্রেরণার উৎস ভারত নয়, তবে সার্কের নেতৃত্ব চলে গেছে বৃহৎ ভারতের হাতে।
গত তিন দশকে ভারতের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। যখন সার্কের জন্ম হয়, তখন ভারতের লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা (Pre-eminence in South Asia), এখন কিন্তু ভারতের লক্ষ শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, সমগ্র এশিয়ায় একাধিপত্য (Pre-dominance in Asia') প্রতিষ্ঠা। ফলে এখন ভারতের গতিপথ সহযোগিতার দিকে নয়, বরং আধিপত্যের দিকে এবং এই আধিপত্য শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নয়, অর্থনৈতিক, এমনকি সামরিক ক্ষেত্রেও। সার্ক সৃষ্টির তিন দশক পরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যেসব পরিবর্তন এসেছে, বিশেষ করে বিশ্বে এক নম্বর অর্থনীতি হিসেবে চীনের উত্থানের প্রেক্ষাপটে পাশ্চাত্যের বৃহৎ শক্তিগুলোর ভারতকে সমর্থনের ফলে ভারতের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছে ভীষণভাবে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শক্তি হিসেবে জাগ্রত ভারতের অবচেতন মনের সুখ-সুষুপ্তিতে যে চেতনা এত দিন সুপ্ত ছিল, তা ক্রমে ক্রমে বিকশিত হয়ে শুধু এশিয়ায় নয়, সমগ্র ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে, নীল পানির নৌবাহিনীর দুর্দমনীয় বিক্রমে, বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম সামরিক বাহিনীর দাপটে, নেতৃত্বের যে প্রতিকৃতি ভারতের সামনে এসেছে, তার সামনে আঞ্চলিক সহযোগিতার শ্বেত কপোতটি কম্পমান।
সার্কের মতো সহযোগিতামূলক সংস্থার ভিত্তি শক্তিশালী এবং কার্যক্রমকে গতিশীল করতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে 'আমাদের চেতনা', কোনোরূপ 'আমিত্ব' বা 'আমার ধারণা' নয়। ব্যাপকভিত্তিক সহযোগিতার জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক নির্ভরশীলতার এক সুখদ পরিবেশ, বিশ্বাস ও আস্থাশীলতার এক আলো। সন্দেহ বা অবিশ্বাসের কোনো কুয়াশা নয়। এ ক্ষেত্রে 'আমাদের' মানসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 'আমি' এর ধারণা বিষবৎ পরিত্যাজ্য। দাদাগিরি বা বড় ভাইসুলভ আচরণের কোনো প্রয়োজন নেই এ ক্ষেত্রে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (EU) হোক আর হোক আসিয়ান (ASEAN), সর্বক্ষেত্রে সমান অংশীদারি, পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং দ্বিপাক্ষিকতার পরিবর্তে বহুপক্ষীয় মাত্রায় ওই সব আঞ্চলিক সংস্থা কার্যকর হয়ে স্থিতিশীল হয়েছে। চলেছে সামনের দিকে। পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, আস্থাশীলতা এবং বিশ্বাসের আলো কিন্তু শুধু শীর্ষ পর্যায়ে সীমিত নয় ওই সব ক্ষেত্রে, তা নেতৃত্বের পর্যায় ছাড়িয়ে জনগণের পর্যায় পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত। সার্কের দৈন্য এসব ক্ষেত্রে মারাত্মক।
তার পরও সার্ক পথ চলছে, ধীরপদে যদিও। ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালে, ১৭তম শীর্ষ সম্মেলনের প্রায় তিন বছর পর। এ সম্মেলনের বিষয়বস্তু ছিল 'শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য গভীরতর আঞ্চলিক সংহতি' [Deeper Regional Integration for Peace and Prosperity]। সার্ক গঠিত হয় সাত সদস্যের সমন্বয়ে। পরে আফগানিস্তান যুক্ত হয় এবং বিভিন্ন সময়ে ৯টি রাষ্ট্র চীন, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইরান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মিয়ানমার, মরিশাস ও যুক্তরাষ্ট্র পর্যবেক্ষক হিসেবে অনুমোদিত হয়। ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনকে ব্যর্থ বলবেন? বলতে পারেন। কেননা এই সম্মেলনে নতুন কোনো প্রস্তাবনা গৃহীত হয়নি। সার্ক অঞ্চলের জন্য নতুন কোনো আশাবাদের আলোও সুস্পষ্ট হয়নি; যদিও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে যে নিত্যনতুন বিন্যাস ঘটছে, সে ক্ষেত্রে সার্কের সম্ভাবনা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে। তা ছাড়া ভারত-পাকিস্তানের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ওপর এবং চীনের কার্যক্রমকে ঘিরে সার্কের ভূমিকা অত্যন্ত ক্রিয়াশীল থাকবে ভবিষ্যতে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতারোহণের সময় তিনি সার্কের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের সবাইকে আমন্ত্রণ জনিয়েছিলেন এবং প্রায় সবাই উপস্থিত হয়ে এক ধরনের ছোট্ট সার্ক সম্মেলন গড়ে তুলেছিলেন। সার্ককে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ১৭০ কোটি মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান-ভারত বৈরিতার বিষয়টি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সংহতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়ক ও রেল যোগাযোগ চুক্তি সম্পাদিত হয়নি ওই কারণেই। পাকিস্তান যেমন ভারতকে কোনো ছাড় দিতে চায় না, ভারতও তেমনি পাকিস্তানের জন্য কোনো সুযোগ তৈরি করতে চায় না। তবে বাংলাদেশ আশা করতে পারে, ভারত এবার তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করবে। ইতিমধ্যে স্থলসীমান্ত চুক্তি ভারতের পার্লামেন্টের অনুমোদন পেয়েছে। এত সব হতাশার মাঝেও কিন্তু ছোট্ট আশার আলো দেখা গেছে SAARC Agreement Framework for Energy Co-operation চুক্তিতে। এর মাধ্যমে এক দেশের বিদ্যুৎ অন্য দেশ কিনতে পারে।
জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের নিমিত্তেই সৃষ্টি হয়েছে রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্রের স্বার্থেই তৈরি হয় রাষ্ট্রমণ্ডল। সার্কের জন্ম হয়েছে এ লক্ষ্যেই। দক্ষিণ এশিয়ায় একদিকে যেমন ভারতের বিরাটত্ব এবং বিশাল আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, অন্যদিকে ভারতের তিন দিক ঘিরে ছোট ছোট সাতটি প্রতিবেশীর একাকিত্ব এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ভারতের জন্য যেমন সুখকর নয়, ভারতের ছোট প্রতিবেশীদের জন্যও তেমনি শুভ নয়। ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা যেমন কাঙ্ক্ষিত নয়, ভারত-বিরোধিতাও তেমনি অর্থহীন। তাই বলব, সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার সমস্যা সমাধানের জন্য চাই আঞ্চলিক প্রক্রিয়ার (Regional Approach) যথার্থ বাস্তবায়ন। এই প্রক্রিয়া চালু করতে হলে অবশ্য দ্বিপাক্ষিকতার পরিবর্তে বহুপক্ষীয় (Multilateral) সমাধান প্রক্রিয়া অত্যন্ত জরুরি। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সৃষ্টির পরে একক সিদ্ধান্তের (Unilateralism) কোনো জায়গা নেই। কোনো জায়গা থাকা উচিত নয় দ্বিপাক্ষিকতারও (Bilateralism)। প্রয়োজন হলো আঞ্চলিক প্রক্রিয়া এবং এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের জন্য অপরিহার্য হলো বহুপাক্ষিকতা (Multilateralism)। এই প্রক্রিয়ায় দক্ষিণ এশিয়ায় বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে যাতায়াত ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ব্যাপক কানেক্টিভিটি যেমন সম্ভব, তেমনি সম্ভব সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ। ঠিক তেমনি সম্ভব দক্ষিণ এশিয়ার পানিসম্পদের ন্যায়সংগত বণ্টন এবং দক্ষিণ এশিয়ার নদীগুলোর পরিচর্যা তথা নদীর স্রোতপ্রসূত বিদ্যুতের সুষম বণ্টন।
এটি হচ্ছে না। কেননা দক্ষিণ এশিয়ার কেন্দ্রবিন্দু প্রভাবশালী ভারত এখনো ছোট ছোট প্রতিবেশীর সঙ্গে সহযোগিতার মাত্রা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উদারনীতি গ্রহণে অত্যন্ত কৃপণ।
২
২ মন্তব্য