Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৩ অক্টোবর, ২০২৪ ০৭:২১ অপরাহ্ণ

এবারের নোবেল বিজয়ী যারা

বিশ্বের সর্বোচ্চ উপহার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় নোবেল পুরস্কারকে। প্রথা অনুযায়ী, প্রতিবছরের অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার থেকে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণা হয় নরওয়ে থেকে। সাহিত্য ও অর্থনীতির মতো অন্য পুরস্কারগুলো সুইডেন থেকে ঘোষণা করা হয়। নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করেন সুইডিশ বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবক আলফ্রেড নোবেল। আলফ্রেড তার জীবদ্দশায় ডিনামাইটসহ ৩৫৫টি উদ্ভাবন করেন। এসবের মাধ্যমে প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হয়েছিলেন তিনি। অর্জিত সব অর্থ দান করে ১৮৯৫ সালে একটি উইল করেন তিনি। যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯০১ সাল থেকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাশাস্ত্র, সাহিত্য এবং শান্তিতে এই পাঁচটি বিষয়ে নোবেল পুরস্কার প্রচলন করা হয় এবং পরে অর্থনীতি বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৬৯ সালে।
মেশিন লার্নিং নির্মাণে সহায়তা করার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দুই পথিকৃৎ জন হপফিল্ড এবং জিওফ্রে হিন্টন এবার পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গডফাদার’ হিসেবে পরিচিত হিন্টন কানাডা ও ব্রিটেনের নাগরিক। তিনি ইউনিভার্সিটি অব টরেন্টোতে কর্মরত। হপফিল্ড প্রিন্সটনে কর্মরত একজন আমেরিকান। রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের নোবেল কমিটির সদস্য এলেন মুনস বলেন, দুই বিজয়ী ‘পরিসংখ্যান পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক ধারণাগুলো ব্যবহার করে কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক ডিজাইন করেছেন যা সহযোগী স্মৃতি হিসেবে কাজ করে এবং ডেটা সেটগুলোতে নিদর্শন খুঁজে পায়।’ তাদের গবেষণা মেশিন লার্নিং ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স (এআই), তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। হপফিল্ড এমন একটি গঠন বানিয়েছেন যা তথ্য জমা করে রাখার পাশাপাশি আবার তা পুনর্গঠন করতে পারে। আর হিন্টন এমন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন যা স্বাধীনভাবে তথ্যের মধ্যকার বৈশিষ্ট্য খুঁজে বের করতে পারে। বর্তমানে ব্যবহৃত নিউরাল নেটওয়ার্কগুলোর পেছনে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। হিন্টন ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, এআই সভ্যতার ওপর ‘বিশাল প্রভাব’ ফেলবে, উৎপাদনশীলতা এবং স্বাস্থ্যসেবায় উন্নতি আনবে। রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের সাংবাদিক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে খোলাখুলি আলাপে তিনি বলেন, ‘এটি শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে তুলনীয়।’ মেশিন লার্নিং এবং এআইয়ের পেছনকার বিজ্ঞানকে সম্মানিত করা নোবেল কমিটিও এর সম্ভাব্য উলটো দিক সম্পর্কে আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছে। মুন বলেন, ‘যদিও এর প্রচুর সুবিধা রয়েছে, তবে এর দ্রুত বিকাশ আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও উদ্বেগ বৃদ্ধি করেছে। সম্মিলিতভাবে মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ উপকারের জন্য এই নতুন প্রযুক্তিটি নিরাপদ ও নৈতিক উপায়ে ব্যবহার করার জন্য মানুষ দায়বদ্ধ।’ গত বছর পদার্থবিজ্ঞানে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পান আমেরিকার পিয়ের অগস্টিন, হাঙ্গেরির ফেরেঙ্ক ক্রাউজ এবং ফ্রান্সের অ্যানে এলহুইলার। পদার্থবিজ্ঞানে ২০২৩ সালের নোবেলজয়ী ৩ বিজ্ঞানীরই গবেষণার বিষয় ছিল ইলেকট্রন গতিবিদ্যা। উল্লেখ্য, ১৯০১-২০২৩ সাল পর্যন্ত ১১৭ বার পদার্থে নোবেল দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ২২৪ জন পদার্থবিজ্ঞানী এই পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে জন বার্ডিন একমাত্র ব্যক্তি হিসাবে দুইবার এই পুরস্কার জিতেছেন।
#রসায়ন -৩ জন
ছোটখাটো আঘাত বা বড় কোনো দুর্ঘটনা। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ক্ষত এক স্বাভাবিক ঘটনা। পেশি এবং হাড়ের সেই ক্ষত মেরামত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে থাকে প্রোটিন। সেই প্রোটিন নিয়ে গবেষণাকে স্বীকৃতি দিয়ে এবার তিন বিজ্ঞানীকে রসায়নে নোবেল পুরস্কার দিলেন নোবেল কমিটি। এবারের নোবেল প্রাপকরা হলেন ডেভিড বাকের, ডেমিস হাসাবিস এবং জন এম জাম্পার। নোবেল কমিটি জানিয়েছে, ‘নতুন ধরনের প্রোটিন’ তৈরি নিয়ে গবেষণার জন্য মার্কিন বিজ্ঞানী বাকেরকে এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। আর প্রোটিনের গঠন কেমন হয়, তা নিয়ে গবেষণার জন্য এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী হাসাবিস এবং মার্কিন বিজ্ঞানী জাম্পারকে। হাসাবিস গুগলের লন্ডন শাখার ডিপমাইন্ড প্রকল্পের সিইও। আর গুগলের ‘ডিপ মাইন্ড এআই’ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত জাম্পার। পুরস্কার বাবদ অর্থমূল্যের অর্ধেক পাবেন বাকের। বাকি অর্ধেক ভাগ করে দেওয়া হবে হাসাবিস এবং জাম্পারকে।
মাছ, মাংসের মতো আমিষ খাবারে থাকে প্রোটিন। এই প্রোটিন আবার গঠিত হয় অ্যামাইনো অ্যাসিডের সমন্বয়ে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় প্রোটিন হলো অ্যামাইনো অ্যাসিডের দীর্ঘ শৃঙ্খল। ২০ ধরনের অ্যামাইনো অ্যাসিড রয়েছে। এই অ্যামাইনো অ্যাসিডের শৃঙ্খলের ধরনের ওপর নির্ভর করে প্রোটিনের চরিত্র এবং কার্যকারিতা। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বাকের সেই ২০০৩ সালে অ্যামাইনো অ্যাসিডের শৃঙ্খলে রদবদল ঘটিয়ে নতুন ধরনের প্রোটিন তৈরি করেন। এই প্রোটিনের চরিত্র অন্যগুলোর থেকে অনেকটাই আলাদা। অন্যদিকে ২০২০ সালে হাসাবিস এবং জাম্পার আলফাফোল্ড২ নামের একটি এআই মডেল তৈরি করেন। গবেষকরা ২০ কোটি প্রোটিনকে চিহ্নিত করেছেন। গুগলের ডিপমাইন্ড প্রকল্পে তৈরি আলফাফোল্ড২ এআই মডেল এই প্রোটিনগুলোর গঠন ভার্চুয়ালি আঁচ করতে সক্ষম। ১৯০১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রসায়নে ১১৮টি নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৯০১ সালে প্রথম নোবেল পান জ্যাকবাস এইচ. ভ্যান হফ। রসায়নে দুইবার করে নোবেল পেয়েছেন ফ্রেডেরিক স্যাঙ্গার ও ব্যারি শার্পলেস।
এ বছর চিকিৎসাশাস্ত্রে দুজন মার্কিন বিজ্ঞানী যৌথভাবে নোবেল পেয়েছেন। তারা হলেন ভিক্টর অ্যামব্রোস ও গ্যারি রুভকুন। নোবেল কমিটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, করোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নোবেল অ্যাসেম্বলি ‘মাইক্রোআরএনএ আবিষ্কার এবং পোস্ট-ট্রান্সক্রিপশনাল জিন নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকার জন্য’ ভিক্টর অ্যামব্রোস এবং গ্যারি রুভকুনকে আজ চিকিৎসা বা ওষুধশাস্ত্রে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার ২০২৪ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ বছরের নোবেল পুরস্কার দুই বিজ্ঞানীকে ‘জিনের কার্যকলাপ কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়’ সে সংক্রান্ত একটি মৌলিক নীতি আবিষ্কারের জন্য সম্মানিত করেছে। এই দুই বিজ্ঞানী কীভাবে বিভিন্ন কোষের বিকাশ ঘটে সে সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ছিলেন। তারা মাইক্রোআরএনএ আবিষ্কার করেছেন। এটি একটি নতুন শ্রেণির ক্ষুদ্র আরএনএ অণু, যা জিন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নোবেল কমিটি জানিয়েছে, তাদের যুগান্তকারী আবিষ্কার জিন নিয়ন্ত্রণের একটি সম্পূর্ণ নতুন নীতি প্রকাশ করেছে, যা মানুষসহ বহুকোষী জীবের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
এই বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রখ্যাত লেখিকা হান ক্যাং। ১০ অক্টোবর সুইডিশ অ্যাকাডেমি আনুষ্ঠানিকভাবে তার নাম ঘোষণা করে। হান ক্যাং তার অনন্য সাহিত্যিক অবদানের জন্য এই সম্মান অর্জন করেছেন। সংস্থাটি জানিয়েছে, হান ক্যাংকে তার ‘গভীর কাব্যিক গদ্যের’ জন্য নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। তার এসব সাহিত্যকর্মে পূর্বের যুগে সাধারণ মানুষের ওপর হওয়া অত্যাচার-নির্যাতন এবং মানবজাতির ভঙ্গুরতার বিষয়টি উঠে এসেছে। হান ক্যাং ১৯৭০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার গুয়াঞ্জুতে জন্মগ্রহণ করেন। ৯ বছর বয়স হওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে রাজধানী সিউলে চলে আসেন তিনি। তার পরিবারও সাহিত্যের সঙ্গে জড়িত ছিল। তার বাবা ছিলেন একজন প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক। এ ছাড়া গান ও সংস্কৃতির প্রতিও নিজেকে মেলে ধরেছিলেন হান ক্যাং। যা তার সাহিত্যকর্মে ফুটে উঠেছে। দক্ষিণ কোরিয়ান এই লেখিকার সবচেয়ে আলোচিত সাহিত্যকর্ম হলো (২০০৭; ‘দ্য ভেজেটেরিয়ান’, ২০১৫)। এটি তিন খণ্ডে লেখা হয়েছে। এটিতে এক নারীর গল্প তুলে আনা হয়েছে, যিনি মাংস খেতে অস্বীকৃতি জানানো পর তার স্বামী, বাবা এবং অন্যদের দ্বারা নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। গত বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান নরওয়ের নাট্যকার ইয়োন ফসে। ইয়োন ফসের সাহিত্য ও নাটক নিয়ে সুইডিশ অ্যাকাডেমি প্রশংসা করে বলেছিল, তিনি তার লেখায় অব্যক্ত ও না বলা কথাগুলো চমৎকারভাবে প্রকাশ করেছেন। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রথম দেওয়া হয় ১৯০১ সালে। সেই প্রথম নোবেল জেতেন ফরাসি কবি ও প্রাবন্ধিক সুলি প্রুদোম। এখন পর্যন্ত ১২০ জন সাহিত্যিককে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। নোবেল পুরস্কারটির প্রবর্তক সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল। তার উইল অনুযায়ী, পদার্থ, রসায়ন, চিকিৎসা, শান্তি ও সাহিত্য এই পাঁচটি খাতে বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তিদের প্রতিবছর এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ১৯৬৯ সালে অর্থনীতি খাতও এতে যুক্ত হয়।
#শান্তি -১ জন
এ বছর শান্তিতে নোবেল পেয়েছে জাপানের পরমাণু অস্ত্রবিরোধী সংগঠন নিহন হিদানকায়ো। ১১ অক্টোবর নরওয়ের রাজধানী অসলোর নোবেল ইনস্টিটিউট থেকে এবারের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়। নোবেল কমিটির ভাষ্যমতে, পরমাণু অস্ত্রমুক্ত একটি বিশ্ব গড়ার প্রচেষ্টা এবং পরমাণু অস্ত্র আর কখনো ব্যবহার করা যে উচিত নয়, সেটি প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের মাধ্যমে তুলে ধরার জন্য জাপানের সংগঠনটিকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। ১৯৪৫ সালে পরমাণু বোমা নিক্ষেপের পর জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাসাকি শহর দুটি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পর্বে আমেরিকার এই একটি সিদ্ধান্ত জাপানের কয়েক প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নষ্ট করেছিল। সে সময় হিমাকুশা নামে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছিল পরমাণু বোমা নিক্ষেপে বরাত জোরে বেঁচে ফেরা মানুষজন। সেই প্ল্যাটফর্মই পরবর্তীতে ‘নিহন হিদানকিও’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। সংস্থাটি পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের বিরোধিতায় নিরন্তর কাজ করছে। সংগঠনটি গঠিত হওয়ার পর থেকেই পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়তে কাজ করে চলেছে। আর আজ এমন সময় এই সংগঠনটিকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দিচ্ছে কমিটি যখন চলতি বছর বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক বোমা নিয়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে বিশ্বে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গত ৮০ বছরে অনেক যুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু কোনো যুদ্ধে কোনো দেশই আর পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের সাহস দেখায়নি। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার খবরে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন সংগঠনটির সহপ্রধান তোশিউকি মিমাকি। প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সংগঠনটি যে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাবে, তা তিনি কখনো স্বপ্নেও ভাবেননি।
মন্তব্য করুন

ব্লগ