Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৪ অক্টোবর, ২০২৪ ০৯:০৫ অপরাহ্ণ

কিশোর ক্লাসিক রিভিউ - কাউন্ট অফ মন্টিক্রিস্টো - আলেকজান্দার দ্যুমা

ফারাও নামের জাহাজটি বন্দরে ফিরেছে আজ বহুদিন পর। এডমন্ড দান্তে এই জাহাজের একজন ফার্স্ট অফিসার।আসার পথে জাহাজটির ক্যাপ্টেন লে ক্লার্কের মৃত্যু হয়ে সমুদ্রে থাকা অবস্থায়। তখন মৃত ক্যাপ্টেনের নির্দেশনা মতো নিজে থেকেই এর ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব বুঝে নিয়েছিল দান্তে কিন্তু এটা তার সঙ্গীদের অনেকেরই পছন্দ হলো না আর তাদের মধ্যে একজন ছিলো দাঁগলার আর তারপর থেকে সে দান্তে কে তার শত্রু ভাবতে শুরু করল।

ক্যাপ্টেন লে ক্লার্ক মৃত্যুর আগে দান্তে কে ২টা চিঠি দিয়ে শপথ করিয়ে যায় চিঠিগুলো কে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দেয়ার জন্য। একটা ছিল নেপোলিয়নের উদ্দেশ্যে লেখা আর তখন নেপোলিয়ন এবং তার সমর্থকদের দেশদ্রোহী বলা হত। দান্তে জানত না চিঠিগুলো তে কি লেখা আছে, শুধু মৃত্যুপথযাত্রী ক্যাপ্টেনের কাছে দেয়া কথা রক্ষা করতে সে সেগুলোকে পোঁছে দিল।

সমুদ্র থেকে ফেরার পর তার প্রথম কাজ ছিলো বাবার সাথে দেখা করা আর তারপর মার্সিডিস এর সাথে দেখা করা যাকে সে ভালোবাসে আর বিয়ে করবে। কিন্তু মার্সিডিসকে ভালোবাসে তার খালাতো ভাই ফার্নান্দ। দান্তের বন্ধু কাদেরুশে,জাহাজের ক্যাপ্টেন হওয়ার আশায় দাঁগলার ও মার্সিডিসের খালাতো ভাই দান্তের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র করলো যখন তারা জানতে পারলো যে দান্তে নেপোলিয়নকে চিঠি পৌঁছে দিতে যাবে কারন তারা জানতো এটা দেশদ্রোহী একটি কাজ।

ফানান্দের দেয়া চিঠির উপর ভিত্তি করে বিয়ের আসর থেকে বেচারাকে দেশদ্রোহী বলে গ্রেফতার করে অন্ধকার কারাগারে নিক্ষেপ করা হলো, সে জানতেই পারল না কেনো তাকে বন্দী করা হয়েছে।বিচারক যখন চিঠিটা পড়লো তখন তাকে বেশ চিন্তিত দেখালো কিন্তু সবকিছু সামলে সে খুব ভালো ব্যবহার করলো যাতে দান্তে কোন ঝামেলা করার আগেই তাকে নিক্ষেপ করতে পারে কারাগারে, শুধু কারাগার বললে ভুল হবে এটা এমন একটি কারাগার যেখানে মানুষ একবার ডুকলে আর জীবিত বের হয় না, সমুদ্রের মধ্যে সেই ভয়ানক এক অবস্থা।

দান্তে বুঝতেই পারলো না তার বন্ধুরাই তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। এদিকে অন্ধকার কারাগারে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছিল তার। হঠাৎ একদিন ফারিয়া নামের আরেক কয়েদীর সাথে তার কথা হয় তাদের।কারাগারের দেয়াল ভেঙে সুরঙ্গ তৈরি করে তারা দুজন সাক্ষাৎ করে, একে অপরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে। সেই সাথে তাদের একাকীত্বের অবসান ঘটে।

ফারিয়া লোকটা অসম্ভব জ্ঞানী, শান্ত, ধীরস্তির, ধৈর্যশীল, সাহসী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আর প্রচন্ড মনোবলের অধিকারী একজন মানুষ। কারাগারে থেকেও সে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে, বই লিখে ফেলেছে, কারাগার থেকে পালাবার জন্য সুরঙ্গ তৈরী করে কাটিয়েছে একা হাতে এতোগুলো বছর ধরে। দান্তে ফারিয়া কে দেখে নিজের প্রতি লজ্জাবোধ করল, সে ওই লোকটা থেকে অনেক কম বয়সের আর অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েও কারাগারের এতোগুলো বছর পুরো হেলায় কাটিয়ে দিল অথচ ফারিয়ার মতো ভাবলে এতোদিনে পালিয়ে যেতে পারত।

দান্তে ফারিয়া কে দেখে নিজেকে খুবই অজ্ঞ ভাবতে লাগল। তাই ফারিয়ার কাছে দান্তে পড়তে শুরু করল, অনেক নতুন সব জিনিস জানতে লাগল সে।দান্তে শিখে ফেলল ইংরেজি, জার্মান আর স্পেনিশ ভাষা। দুই কারাবন্দি বন্ধু মিলে পড়তে পড়তে আর শিখতে শিখতে যে কিভাবে আবারও বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছিল বুঝতেই পারছিল না তারা। এরি মাঝে চলছিল পালানোর জন্য তাদের সুরঙ্গ তৈরীর কাজও।

কিন্তু ফারিয়া খুব কঠিন এক রোগে আক্রান্ত থাকায় সে বুঝতে পারছিল কারাগার থেকে পালাবার সুযোগ আর ওর হবে না। তাই সে দান্তেকে একাই পালিয়ে যেতে বলল আর জানাল মন্টিক্রিস্টো নামক এক দ্বীপে গুপ্তধন লুকানো আছে তা যেন দান্তে উদ্ধার করে। দান্তেকে বৃদ্ধ ফারিয়া নিজের পুত্র ভেবে সেই গুপ্তধনের পুরোটাই নিয়ে নিতে বলে। কিন্তু দান্তে তার এই পরম বন্ধুকে রেখে কোনোভাবেই কারাগার ত্যাগ করবে না জানায়। এদিকে ঠিকই হতভাগ্য ফারিয়াকে সৃষ্টিকর্তা মুক্তি দেন। দান্তে ভীষণ ভেঙে পরে পরম বন্ধুর মৃত্যুতে কিন্তু পরক্ষনেই ভাবে তাকে পালাতে হবে এখান থেকে তবেই ফারিয়ার আত্মা শান্তি পাবে।

কারারক্ষীরা যখন টের পায় ফারিয়ার মৃত্যু, তখন লাশ নেয়ার জন্য তারা একটা বস্তা এনে ফারিয়ার লাশটা ভরে ওর কুঠুরি তে রেখে বাইরে গেলে হঠাৎ দান্তের মাথায় এক বুদ্ধি আসে। সে লাশটা কে বের করে সুরঙ্গ দিয়ে তার ঘরে নিয়ে এসে ঢেকে শুইয়ে রাখে আর সে একটা ছোরা নিয়ে বস্তার ভেতর ঢুকে যায়। লাশ নিতে এসে ওরা দান্তে কে নিয়ে যায় আর বস্তা সহ ফেলে দেয় গভীর সমুদ্রে।

দান্তে ছোরা দিয়ে বস্তা কেটে বাইরে বেরিয়ে এসে কোনো রকমে সাঁতরে একটা দ্বীপে এসে পৌঁছে। সেখান থেকে সৌভাগ্যক্রমে একটা জাহাজে উঠতে পারে সে এবং সেই জাহাজে করেই মন্টিক্রিস্টো দ্বীপে গিয়ে গুপ্তধনেরও সন্ধান পেয়ে যায় সে। অবসান ঘটে দান্তের দুঃখজনক তিক্ত জীবনের।

গুপ্তধন পেয়ে দান্তে বিশাল ধনী হয়ে যায়, কাউন্ট অব মন্টিক্রিস্টো নামে পরিচিত হয় সে। নয় বছর পর ফ্রান্সে ফিরে এসে প্রথমে ছদ্মবেশ নিয়ে যায় কাদেরুশের কাছে আর সেখানে জানতে পারে ওর বাবা না খেতে পেয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। বিয়ের আসরে ফেলে যাওয়া মার্সিডিস ফার্নান্দ কে বিয়ে করেছে। ওদের একটা ছেলেও হয়েছে আর বিশাল প্রাচুর্যের মাঝে জীবনযাপন তাদের। সেই দাঁগলারও এখন এক ব্যাংকের মালিক, বিশাল ধনী ব্যারন।কাদেরুশের নিজের বন্ধুর প্রতি হওয়া অবিচারের জন্য অনুতপ্ত থাকায় তাকে মাফ করে দেয় দান্তে।

বিচারক মৃত্যু হয় ছুরিকাঘাতে দান্তের এক ভৃত্যের হাতে কারন ভৃত্যের সাথে বিচারকের পূর্বের শত্রুতা ছিলো, দান্তে সবকিছু জেনেও চুপ করে দেখে যায়। ফার্নান্দ এখন সমাজের গুনী ব্যক্তি কারন সে সবার কাছে বলেছে যুদ্ধে তার বীরত্বের কারনে তার এই অর্থ সে উপার্জন করতে পেরেছেন কিন্তু আসলে সে হুইডে নামক এক মেয়ের বাবার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে অর্থের মালিক হয় আর সেটা সবার সামনে চলে আসলে প্রথমে ফার্নান্দের ছেলে না জেনে দান্তের সাথে যুদ্ধ করতে চায়।

এদিকে মার্সিডিস দান্তের কাছে এসে বলে যে সে যেদিন প্রথম ফ্রান্সে এসে তার সামনে যায় তখনই সে দান্তেকে চিনে ফেলে কারন মার্সিডিস সারাজীবন দান্তেকে ই ভালোবেসেছে কিন্তু দান্তের নিখোঁজ হওয়ার পর সে অপেক্ষা করে ব্যর্থ হয়ে ফানান্দকে বিয়ে করে অবশেষে। দান্তে তার নিখোঁজ হওয়ার কারন মার্সিডিসকে জানালে সে ঐখান থেকে চলে যায় আর তার ছেলেকে সব খুলে বলে।

মার্সিডিস স্বামী সংসার ত্যাগ করে, ওর ছেলে অন্যদেশে চলে যায় আর ফার্নান্দ নিজের মাথায় নিজে গুলি করে মারা যায়। দাঁগলার দান্তের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে সর্ব শান্ত হয়ে যায় আর কাউন্ট অফ মন্টিক্রিস্টো থেকে পুনরায় জন্ম নেয় এডমন্ড দান্তে।

হেইডির কাছে নিজের জীবনের গল্প বলছিলো দান্তে, গল্পের শেষে হেইডিকে সে মুক্তি দিতে চায় দাসত্বের জীবন থেকে কিন্তু হেইডি ভালোবাসে দান্তেকে যদিও বয়সে সে অনেক বড় তবুও হেইডির জীবন বলতে এই একমাত্র দান্তেকেই বুঝে সে।

অবশেষে হেইডি আর দান্তের নতুন জীবন শুরু হলো মন্টিক্রিস্টো দ্বীপকে পিছনে ফেলে।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ