প্রধান শিক্ষক
২৬ অক্টোবর, ২০২৪ ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ
ছোট গল্প "শরতের কাশফুল"
কাশফুল
শরতের আকাশে মেঘগুলো নীলের সঙ্গে মিতালির খেলা করছে। হাওয়ায় মৃদু শিরশিরে শীতলতা জানান দেয়, পূজোর সময় এসে গেছে। গ্রামের পাশের খালপাড়ে একরকম দুলছে কাশফুলের সারি। সাদা তুলোর মতো একগুচ্ছ কাশফুল যেন দূর থেকে দেখতে অপার্থিব মনে হয়। এই খালপাড়, শরতের মেঘ, আর সাদা কাশফুল নিয়ে যেন কত কথাই মনে জমে থাকে। কিন্তু কাশফুলের মতোই যেন কিছু অনুভূতি দোলা দিয়ে যায় নিরবে, সেগুলো কখনো প্রকাশ হয় না।
রাকিবের সেসব অনুভূতির কথা আজ মনে পড়ে। সে শহরে চাকরি নিয়ে চলে গেছে বেশ কয়েক বছর হলো। কিন্তু গ্রামটা তার মনের গহীনে যেন একটা অদ্ভুত স্থান করে নিয়েছে। শহুরে চাকরির ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে গ্রামের সেই দিনগুলোই তাকে টানে। বিশেষত, কাশফুলের সময় এলেই গ্রামের সেই নিরিবিলি বিকেলগুলো মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আর মনে পড়ে সেই মেয়েটির কথা, যার সাথে তার অদ্ভুত রোমান্স শুরু হয়েছিল এই কাশফুলেরই ফাঁকে।
প্রায় পাঁচ বছর আগের কথা। রাকিব তখন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। শহর থেকে অনেক দূরে তার গ্রামের বাড়ি। শরৎকাল এলেই সে গ্রামে চলে আসত। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার জন্য তার মনে এক অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল। আর কাশফুলের প্রতি তার ছিল বিশেষ দুর্বলতা। এদিকে পাশের গ্রামের মেয়ে তাহমিনা, ডাকনামে তমা, শরৎকাল এলেই তাদের বাড়ির কাছের খালপাড়ে কাশফুলের ভেতর দিয়ে হাঁটতে ভালোবাসত। কাশফুলের মাঠটা তার বিশেষ প্রিয় ছিল।
রাকিব আর তমার আলাপ সেই কাশফুলের মধ্যে দিয়েই। এক বিকেলে রাকিব খালপাড়ে হাঁটতে গিয়ে তমাকে কাশফুলের ভেতর বসে থাকতে দেখেছিল। তমার চুলগুলো হাওয়ায় উড়ছিল আর তার হাতে একটা কাশফুল ধরা ছিল। মেয়েটার মধ্যে একটা অদ্ভুত মায়া ছিল, যেন একটুকরো কাশফুল হয়ে সে নিজেই প্রকৃতির সাথে মিশে গেছে।
রাকিব তখন ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে যায়। "তোমার নাম কি?" সে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল।
তমা চমকে ফিরে তাকায়। তার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। "আমার নাম তমা," সে মৃদু স্বরে বলে। তারপর হেসে বলে, "তুমি কে? আগে কখনো এখানে দেখিনি।"
রাকিব কিছুটা লাজুক হাসি দিয়ে বলল, "আমি রাকিব। শহরে থাকি, তবে মাঝে মাঝে গ্রামে আসি। কাশফুল দেখতে ভালো লাগে।"
এই পরিচয়ের সূত্র ধরে তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত বন্ধন গড়ে ওঠে। প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর ধীরে ধীরে স্নেহ আর ভালোবাসার সম্পর্ক। শরতের প্রতিটি দিন বিকেলে তারা খালপাড়ে কাশফুলের মাঝে বসে গল্প করত। তমা রাকিবকে নিয়ে কত কী যে স্বপ্ন দেখত! তার কথা শুনে রাকিবের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি জন্ম নিত
তাদের এই মায়াময় দিনগুলো চলছিল, কিন্তু রাকিব জানত এ সম্পর্ক বেশিদিন স্থায়ী হবে না। সে শহরে পড়াশোনা করছে, তার সামনে অনেক বড় স্বপ্ন, দায়িত্ব, যা তাকে পূরণ করতে হবে। তমার সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো তাকে যতই সুখী করুক না কেন, সে জানত যে একদিন তাকে ফিরতে হবে তার নিজস্ব পথে।
একদিন বিকেলে রাকিব এক অদ্ভুত অনুভূতিতে কাতর হয়ে তমাকে বলে, "তমা, জানো? কাশফুলের এই নীরবতায় তোমার মুখ দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু আমি জানি, আমি তোমাকে চিরকাল এভাবে দেখতে পারব না।"
তমা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, "আমাদের জীবনে অনেক কিছুই চিরকাল থাকে না, তাই না? কিছু কিছু মুহূর্ত শুধুই স্মৃতিতে থেকে যায়। তবে আমি চাই, তুমি এই কাশফুলের মতোই আমার স্মৃতিতে থেকে যাও।"
এই কথাগুলো শোনার পর রাকিবের মনে এক অদ্ভুত দুঃখ ও আনন্দের মিশ্র অনুভূতি জাগে। তাদের দু'জনের মনের কোণে অদৃশ্য এক চিহ্ন এঁকে গেল সেই কথাগুলো। তাদের সম্পর্ক যেন কাশফুলের মতোই - কখনো কখনো দূরে চলে যায়, কিন্তু বাতাসে ভেসে থাকে এক নীরব পরম স্নেহ।
বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার পর রাকিব চাকরি নিয়ে শহরে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তমার সাথে যোগাযোগ আর আগের মতো হয় না। সে মাঝে মাঝে মেসেজ করত, দু’জনের কথাও হতো; তবে সময়ের সাথে সাথে দূরত্বটা যেন বাড়তে থাকে। রাকিবের মনটা মাঝে মাঝে খুব ভারী হয়ে যেত, কিন্তু বাস্তবতার কাছে সে অসহায়।
এদিকে তমা অনেক কষ্টে সব কিছু মেনে নিয়েছিল। তার মনে রাকিবের জন্য ভালোবাসা ছিল, কিন্তু সে জানত, এই ভালোবাসা তাকে আর রাকিবকে একসাথে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। একদিন সে নিজেই রাকিবকে মেসেজ করল, "জীবনের পথে তুমি এগিয়ে যাও, রাকিব। আমি সবসময় তোমার জন্য প্রার্থনা করব।"
রাকিবের মনে এক তীব্র শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল সেদিন। মনের গভীরে তমার সেই মেসেজটি তাকে কাঁদিয়েছিল, কিন্তু সে জানত, তাদের জীবন একসাথে চলে না। তবে, সেই কাশফুলের মাঠের কথা, তাদের গল্পের দিনগুলো, একটুকরো স্মৃতি হয়ে রয়ে গেল রাকিবের হৃদয়ে।
অনেক বছর পর এবার শরতের ছুটিতে রাকিব আবার গ্রামে ফিরে আসে। সেই কাশফুলের মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে সে সবকিছু দেখতে পায় আগের মতোই। কিন্তু তার পাশে এখন তমা নেই। কাশফুলের সাদা তুলোর মতো ভেসে বেড়ানো তার স্মৃতিতে তমার সেই হাসিমাখা মুখটি ভেসে ওঠে। মনে পড়ে, তমা বলেছিল, "তুমি আমার স্মৃতিতে থেকে যেও, কাশফুলের মতো।"
রাকিব একটু হাসে আর মনের ভেতর গভীর এক প্রশান্তি অনুভব করে। তমা হয়তো দূরে আছে, কিন্তু তাদের সেই স্মৃতিগুলোই যেন প্রকৃতির মতোই চিরন্তন হয়ে রয়ে গেছে।
কাশফুলের মতোই কিছু ভালোবাসা থাকে, যা কখনো রঙ হারায় না, বরং স্মৃতির কোণে থেকে মনকে বারবার ছুঁয়ে যায়।
৪
৪ মন্তব্য