Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৬ অক্টোবর, ২০২৪ ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ

ছোট গল্প "তালপাতার বাঁশি"

তাল পাতার বাঁশি

গ্রামের ছোট্ট একটি পাড়ায় থাকে রিমন। দশ বছর বয়সী ছেলেটি, সবসময় হাসিখুশি, আর দুষ্টুমিতে ভরা। বাড়ির উঠোনে মায়ের সাথে খেলা, বনের ধারে বন্ধুদের নিয়ে দৌড়ঝাঁপ, আর ঘন্টার পর ঘন্টা গাছতলায় বসে গল্প শোনাএসবই তার দিনের সেরা আনন্দ।

একদিন রিমন গাছতলায় বসে দাদুর কাছ থেকে এক অদ্ভুত গল্প শুনল। দাদু বলল, "রিমন, জানিস, তাল পাতার বাঁশিতে এক সময় গান বাজতো। সেই শব্দে মানুষ আর প্রকৃতি সব একসাথে মিশে যেত।"

রিমনের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। সে বলল, "তাল পাতার বাঁশি! সেটাতে কীভাবে গান বাজে?"

দাদু মুচকি হেসে বলল, "তাল পাতার বাঁশি বানাতে শিখতে হলে অনেক ধৈর্য আর মনোযোগ লাগে। তবে মন দিয়ে বানাতে পারলে, সেই বাঁশিতে এমন সুর বেরোয় যে মন মুগ্ধ হয়ে যায়।"

রিমন এই কথা শুনে খুব উৎসাহিত হয়ে উঠল। সে বলল, "দাদু, আমি কি তাল পাতার বাঁশি বানাতে পারব?"

দাদু মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "হ্যাঁ রে, কেন পারবি না? তবে মনে রাখতে হবে, ধৈর্য আর একাগ্রতা থাকতে হবে। তাছাড়া, তাল পাতার বাঁশি বানাতে গেলে একটু চেষ্টা করতে হবে।"

পরদিন রিমন ভোরে ঘুম থেকে উঠে রওনা দিল তাল গাছের দিকে। একদম খালি হাতে বেরিয়ে গেল, ছোট্ট ব্যাগে করে কিছু সরঞ্জাম আর এক বোতল পানি নিয়ে। গাছের পাতা তুলতে গিয়ে সে দেখে তাল গাছ অনেক উঁচু, পাতা ছিঁড়ে নামাতে হলে তাকে বেশ কিছুটা চেষ্টাও করতে হবে। কিন্তু সে এত সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নয়। বহু কষ্টে এক টুকরো বড় তাল পাতা নিয়ে সে বাড়িতে ফিরল।

দাদু তাকে পাতা ধরে কীভাবে বাঁশি তৈরি করতে হবে, তা শেখাতে লাগলেন। পাতার এক পাশ থেকে ছোট ছোট ছিদ্র করতে হবে আর পাতার উপরে আঙুল রেখে সুর বের করতে হবে। রিমন মনোযোগ দিয়ে শিখছে, কিন্তু বারবারই তার সুর ভুল হয়ে যায়। তবু সে হাল ছাড়ল না। প্রতিদিন বিকেলে সে এই তাল পাতার বাঁশি নিয়ে বসে সুর তুলতে চেষ্টায় লেগে থাকত।

কয়েকদিনের মধ্যে সে এক অদ্ভুত সুর বের করতে সক্ষম হলো। যদিও পুরোপুরি সঠিক সুর নয়, তবু কিছুটা মিষ্টি মেলোডি শোনা যাচ্ছিল। সে এই সফলতায় খুশি হয়ে উঠল। এরপর প্রতিদিনই বিকেলে তার বাঁশির শব্দ শোনা যেত, গাছতলায় বসে সে নিজের সৃষ্ট সুর বাজাতে থাকে।

রিমনের বাঁশির শব্দ শুনে গ্রামের সবাই অবাক হয়ে যায়। তারা বলে, "তোমার বাঁশির সুর কত সুন্দর, রিমন! একদম মায়াময়।" রিমন প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেই গাছতলায় বসে তার বাঁশি বাজাত আর গ্রামে সবাই তার বাঁশির সুর শুনত।

একদিন তার বন্ধু তমাল এসে বলল, "রিমন, তুই কীভাবে এত সুন্দর বাঁশি বাজাস? তুই আমাকে শিখাবি?"

রিমন খুশি হয়ে তমালকে বলল, "অবশ্যই শেখাব। তবে শোন, তাল পাতার বাঁশি বানাতে হলে অনেক মনোযোগ আর ধৈর্য লাগে। তুই কি তা পারবি?"

তমাল বলল, "আমি চেষ্টা করব।" এরপর রিমন তমালকেও তাল পাতার বাঁশি বানানো শেখাতে শুরু করল। তাদের মধ্যে বাঁশির সুর শেখা নিয়ে অনেক আনন্দ আর খুনসুটি চলল।

এবার শরৎকাল এলো, আর গ্রামে একটি ছোট উৎসব আয়োজন করা হলো। সবাই খুশি মনে এই উৎসবে যোগ দিচ্ছিল। রিমন আর তার বন্ধু তমাল মিলে পরিকল্পনা করল, তারা এই উৎসবে তাল পাতার বাঁশি বাজিয়ে সবাইকে আনন্দ দেবে।

উৎসবের দিন তারা খুব সকালে উঠেই নিজেদের বানানো বাঁশি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। তারা যখন মঞ্চে ওঠে, তখন গ্রামের সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে ছিল। রিমন আর তমাল একসাথে তাদের বাঁশি বাজানো শুরু করল। তাল পাতার বাঁশির সুরে মিশে গেল গ্রামবাসীর আনন্দ আর হাসির ধ্বনি।

গ্রামের বয়স্ক থেকে শুরু করে ছোট শিশুরাও এই সুরে মুগ্ধ হয়ে গেল। সবাই বলল, "তোমাদের বাঁশির সুরে আমরা যেন আবার ছোটবেলায় ফিরে গেলাম।" এই প্রশংসা শুনে রিমন আর তমাল খুব খুশি হলো। রিমন শিখল, ধৈর্য, মনোযোগ আর চেষ্টার মাধ্যমে যে কোনো কিছুই অর্জন করা সম্ভব। সে তার বন্ধু তমালকেও শিখিয়েছে, কিভাবে তাল পাতার মতো সাধারণ একটি বস্তু দিয়ে মধুর সুর তোলা যায়।

রিমনের এই তাল পাতার বাঁশি কেবল একটি খেলার উপকরণ নয়, বরং এই সুরের মধ্যে ছিল তার ভালোবাসা, আন্তরিকতা আর আনন্দের ছোঁয়া, যা সবাইকে মুগ্ধ করেছে। এই বাঁশির সুর গ্রামে মিষ্টি মেলোডি ছড়িয়ে দিয়েছিল, এবং এই সুর তাদের মনে একটা ভালো স্মৃতি হয়ে রয়ে গেল।

এইভাবে তাল পাতার বাঁশির সুরে রিমন আর তমাল তাদের শৈশবের মুহূর্তগুলোকে আরও সুন্দর করে তোলে, যা তাদের কাছে স্মৃতি হিসেবে চিরদিন থেকে যাবে।

মন্তব্য করুন

ব্লগ