প্রভাষক
২৬ অক্টোবর, ২০২৪ ১০:৩০ অপরাহ্ণ
প্রভাষক
একটানা ছ'দিন ধরে ঝড় চলার পর সপ্তম দিনে এসে ঝড় কমার বদলে অগ্নিমূর্তি ধারণ করলে জাহাজের ক্যাপ্টেন থেকে শুরু করে সবাই ক্লান্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায় যাদের মধ্যে একই অবস্থা রবিনসন পরিবারের ও। এদিকে মাস্তুলগুলো ভেঙে গিয়েছে এবং জাহাজেও দেখা দিয়েছে ফাটল। রবিনসন পরিবারে মোট ৬ জন সদস্য রয়েছে রবিনসন, স্ত্রী এলিজাবেথ ও তাদের ৪ পুত্র। মা ছেলেরা একে অপরের গায়ে গা লাগিয়ে বসে আছে। তাঁদের সান্তনা দেওয়ার মতো তখন একটাই কথা সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করা।
কিন্তু না তখনই পাহাড়ের সাথে ধাক্কা লেগে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেলো জাহাজটা।ক্যাপ্টেন কথামত সকলেই নৌকা নামিয়ে নেমে পরলো কিন্তু ছোট ছোট চার ছেলে ও বউকে নিয়ে নামতে পারলেন না জাহাজ থেকে কারন তার পরিবারের একেকজন ছিলো একেক জায়গায় আর ডাকাডাকি করেও কাজ হলো না কারন তখন বৃষ্টির শব্দে কিছুই শুনতে পারলো না কেউ।
রবিনসন খেয়াল করলেন জাহাজ একটা পাহাড়ের মাঝে শক্ত হয়ে আটকে আছে তাই মনে সাহস আনলো তারা।ঝড়ের এই সাত দিনে তারা কেউই ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে পারেনি ।তাই এলিজাবেথ জাহাজের রান্না ঘরে গিয়ে অল্প কিছু রান্না করলে খেয়ে হালকা ঘুমিয়ে নিলো সবাই কিন্তু জেগে রইল রবিনসন,এলিজাবেথ ও বড় ছেলেটা, তাদের একটাই ভয় কখন যে ভেঙে পরে জাহাজটা।
একসময় ভয়ে ভয়ে তারা ঘুমিয়ে যায় সবাই আর সকালে দেখতে পেলো হালকা রোদ্দুর সাথে শান্ত সাগর। রবিনসনের মাথায় তখন একটাই চিন্তা যে করেই হোক বের হতে হবে এখান থেকে,জাহাজে খোঁজাখুঁজি করে প্রত্যেকেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস পেয়ে যায়।
সবাই মিলে অনেক সরঞ্জাম পেয়ে গেলে শুরু করে দিলো একটা নৌকা তৈরির কাজ আর করেও ফেললো সবাই মিলে।রবিনসন বাচ্চাদের নিয়ে রওনা হন অজানা পথের উদ্যেশ্যে সাথে যতটুকু জিনিস না নিলেই নয় তা নিয়ে গেলো জাহাজ থেকে।ছোট নৌকাটা ভাসতে ভাসতে পৌঁছে যায় একটা দ্বীপের সেখানে মাটিতে পা পরতেই সবার চোখে খুশির পানি চলে আসে।
শুকনো ঘাস ও শেওলা দিয়ে তৈরি করে ফেলে থাকার মতো একটা জায়গা একেকজন একেকরকম দ্বায়িত্ব নিয়ে।সমুদ্রের বিভিন্ন খাবার সংগ্রহ করার কাজে তারা সময় কাটাচ্ছে।এই সময়েই ফ্রিংস ধরে নিয়ে আসে একটা শুয়োর ।পরদিন ভোর হলে রবিনসন আর ফ্রিংস যান মানুষের খোঁজে সাথে থাকে জাহাজ থেকে পাওয়া কুকুর দুটো টার্ক ও পনটো।
আর্নেষ্ট ,জ্যাক,ফ্রান্সিকে এলিজাবেথের সাথে রেখে যায় যদিও ওদের না নেয়াতে একটু কষ্ট পায় কিন্তু এলিজাবেথকে একা রেখে যাওয়া ঠিক হবে না।বেশ কিছুক্ষণ খুজাখুজি করেও তারা কোনো মানুষের চিহ্ন ও পেলো না ।তো চোখ পড়তেই কিছু দূরে দেখতে পায় সারি সারি পাহাড়। বনের ধারে পৌঁছে অসংখ্য নারিকেল গাছ পেলে দুজনে খেয়ে ও বাসার জন্য নিয়ে নিয় কিছু নারিকেল। একটু হাঁটতেই পেয়ে গেলো আখ যা থেকে তারা নিজেরা খায় এবং বাসার জন্যেও নিয়ে আসে কিছু। সামনে একটু এগিয়ে এলেই দেখতে পায় বানর আর টার্ক একটা মা বানরকে কামড়ে মেরে ফেললে বানরের বুকে থাকা ছোট বাচ্চাটা ভয়ে ফ্রিংসের কাছে চলে আসে।ফ্রিংস টার্কের পিঠে চাপিয়ে দেয় বানরের বাচ্চাটা কারণ তার মাকে ওই ই মেরেছে ,তাই বাচ্চার দ্বায়িত্ব ও ওর ই।বাড়ি ফিরে এলে সবাই ওদের দেখে খুশি হয়।
রবিনসন প্রতিদিন কিছু না কিছু এভাবেই সংগ্রহ করতে থাকে কিন্তু একরাতে শেয়ালের ঝাঁক হামলা করে যদিও গুলি চালানোর কারনে চলে যায় কিন্তু নিরাপদ জায়গা খুঁজতে গিয়েই পায় অনেক বড় বড় ফাইন গাছ। রবিনসন প্রতিদিন জাহাজে গিয়ে দরকারি কিছু না কিছু নিয়ে তৈরি করে সুন্দর একটা মাচা আর সেখান থেকে সবকিছু নিয়ে চলে আসে।মাচায় ওঠার জন্য রবিনসন একদিন খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যায় বাঁশের পেলে তা দিয়ে তৈরি করে মই।কয়েকদিন পরেই এলিজাবেথ জানায় মই বেয়ে উঠতে তার সমস্যা হচ্ছে। গাছের গুঁড়িতে সিঁড়ি বানানোর বুদ্ধি দেয় এলিজাবেথ।
রবিনসনের গাছটা পুরোটাই ফাঁফা কিনা পরীক্ষা করা শুরু করে আর ফ্রিংস ও তার ছোট ভাই গাছে উঠে সাবলের ঘা দিয়ে চেক করতে থাকে।ঘা দিতে গিয়ে মৌমাছির বাসায় ঘা মারলে মৌমাছি কিছু বোঝার আগেই কামড়ে ফুলিয়ে দেয় দুই ভাইকে, রবিনসন শুধু কাঁদা মাখিয়ে দেয় ঔষুধ হিসেবে।রবিনসন লাউয়ের খোলসের ব্যবস্থা করলে মৌমাছি গুলো ওই খোলসের ভেতরে বাসা বাঁধে।এদিকে তারা সিড়ি তৈরি করার পর তাদের সাথে সাথে থাকা গরু ,ভেড়া গুলোর জন্য ও তৈরি করে একটা ঘর ।
বর্ষাকালে এমন ঝড় বাদলে শুরু হয় যে তারা গাছের উপরে মাচাতে আর থাকতেই পারে না তাই বাধ্য হয়েই তাদের যেতে হয় জন্তুদের জন্য তৈরি করা ঘরে।এদিকে ছেলেরাও এখন বড় হয়ে গিয়েছে একজন চাষাবাদ করছে ,একজন শিকার করছে,একজন বণ্যপ্রাণী পোষ মানছে আবার রবিনসনকে হাতে হাতে কাজ করে দিচ্ছে সবাই। পরের বর্ষায় থাকার জন্যে তারা খুঁজতে থাকে পাহাড়ের গুঁহা, অনেজ খোজাখুজির পর একটা গুহায় তারা খুড়তে শুরু করলো। প্রথমে একটু শক্ত থাকলেও যতো ভিতরে যেতে লাগলো পাথর আরো নরম বের হলো তাই যেখানে তারা ভেবেছিলো বছর তিনেক লাগতে পারে সেখানে পরবর্তী বর্ষা আসার আগেই তারা তৈরি করে ফেলে গুহায় থাকার জায়গা।যেখানে তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস রাখার জায়গা থেকে শুরু করে গরু,মহিষ এমনকি নিজেদের থাকার জন্য ও ছোট ছোট রুম তৈরি করে ফেললো।
দ্বীপে দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছিলো দশটি বছর, জাহাজ থেকে আনা সবকিছু ই এখন রয়েছে তাদের কাছে। জাহাজ থেকে আনা বইগুলো রেখে দিয়েছে তাকে তাকে, দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে সবাই মিলে পড়ে বইগুলো।একদিন ফ্রিংস শিকারে বের হয় কিন্তু ফিরে আসতে দেরি হচ্ছিলো বলে এলিজাবেথ এর চিন্তার শেষ নেই যেনো। ফ্রিংসকে খুঁজতে বের হয়েই দেখা পায় ছেলের ।ফ্রিংস লুকিয়ে বাবাকে জানায় সে যেখানে শিকারে গিয়ে একটি চিঠি পায় সাহায্য করার জন্য আর তখব ফ্রিংস খুঁজতে গিয়ে একটা মেয়ের দেখা পায় ,তার নাম জেনি।ফ্রিংস বাবাকে জানায় তাঁকে তাদের কাছে নিয়ে আসতে চায় ।
রবিনসনের সম্মতিতে ফ্রিংস তখন পরিচয় করিয়ে দেয় তাদের ছোট ভাই হিসেবে কিন্তু রবিনসন বুঝতে পারে এটা একটি মেয়ে।নতুন ভাইকে পেয়ে বাকি তিনজন খুবই খুশি হয়।জেনি তার দ্বীপে কাটানো তিনটি বছরের কষ্টের কথা বলে সবাইকে।জেনির বাবা একজন নাবিক ,কর্মক্ষেত্র ইন্ডিয়ায় হওয়ায় সে ওখানেই বড় হয়েছে, চাকুরী জীবন শেষ হওয়ার সুবাদে অষ্টেলিয়ায় ফেরার সময় দুই জাহাজ ধাক্কা খেলে সে এই দ্বীপে এসে পৌঁছে। কথায় কথায় সবাই বুঝতে পারে জেনি একটি মেয়ে তখন ছোট দুই ভাই অনেক লজ্জা পায় জেনির সাথে কথা বলতে।পরে সবাই জেনিকে আগের মতোই গ্রহন করে।
কয়েকদিন পর ফ্রিংস আওয়াজ শুনতে পেয়ে বাবাকে বলে দূরে কেউ আছে তখন রবিনসন সহ সবাই একে একে দেখে একটা জাহাজ সমুদ্রের মাঝে এসেছে। প্রথমে জলদস্যূ ভাবলে পরে জেনির কথা শুনে তারা এগিয়ে গেলে দূরবিন দিয়ে দেখে কয়েকজন নাবিক নামছে।নৌকা এলিজাবেথ নিয়ে রবিনসন তাদের কাছে গেলে জানতে পারে সত্যিই জেনির বাবা তার খোজেই জাহাজ পাঠিয়েছেন।
রবিনসন তাদের নিয়ে আসে তাদের থাকার জায়গায় নিয়ে এলে নাবিকদের খুবই ভালো লাগে এবং থাকার ইচ্ছা পোষন করলে রবিনসন ও এলিজাবেথ তাদের অর্ধেক দ্বীপ দিয়ে দেয়ার কথা বলে।এদিকে নাবিকরা জানায় তাদের সাথে কেউ ফিরে যেতে চাইলে যেতে পারে তখন বড় ছেলে ফ্রিংক ও তার ছোটটা যেতে চায় দুনিয়া দেখার জন্য। রবিনসন ও এলিজাবেথ দ্বীপ ছেড়ে কোথাও যাওয়ার কথা চিন্তা ও করলো না তবে ফ্রিংকের কথায় রবিনসন বুঝে গেলো ফ্রিংস জেনির জন্য যেতে চায়।এলিজাবেথের কষ্ট কখনো ছেলেদের দেখতে পাবে না বলে অন্যদিকে নতুন একটা পরিবার থাকবে দ্বীপে তাদের সাথে এই আনন্দ ও রয়েছে।
রবিনসন নাবিক পরিবারকে দেন দ্বীপের অর্ধেক যেনো তারা ভালোভাবে জীবন কাটাতে পারে এখানে আর তাদের ছেলেদের বেশ কিছু মুদ্রা ও মুক্তা দিয়ে দেন যাতে ছেলেদের কষ্ট করতে না হয়।ছেলেদের বিদায় জানালো দ্বীপ থেকে যতক্ষণ না তারা চোখের আড়ালে গেলো।
১
১ মন্তব্য