Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৭ অক্টোবর, ২০২৪ ০৭:২৮ পূর্বাহ্ণ

গল্প: প্রথম ট্রেন ভ্রমণ

গল্প: প্রথম ট্রেন ভ্রমণ

বাবার চাকরির বদলির কারণে আমাদের পুরো পরিবারকে ঢাকার বাইরে চলে যেতে হয়েছিল। মা, বাবা, আমি, আর আমার ছোট ভাইআমরা চারজনের নতুন ঠিকানা তখন চট্টগ্রাম। কিন্তু যাওয়ার জন্য বড় কোনো গাড়ির ব্যবস্থা হয়নি। মা বললেন, “আমরা ট্রেনে করে যাব। তোমাদের ট্রেন যাত্রার মজা পেতে হবে।কথাটা শুনেই আমি আর আমার ছোট ভাই খুব উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। আমাদের তো কখনো ট্রেনে ভ্রমণ করা হয়নি। সেই প্রথম ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতা আজও মনে আছে, কারণ সেই যাত্রাই আমার জীবনে অন্যতম সেরা এক স্মৃতি হয়ে আছে।

স্টেশনে পৌঁছানোর পরই যেন রূপকথার দুনিয়ায় এসে পড়লাম। কানে এল ধাতব আওয়াজ, চাকার ঘর্ষণের শব্দ, মানুষের কোলাহল আর হকারদের হাঁকডাক। বড় বড় কামরাগুলির মধ্যে একটা কামরায় ঢুকে পড়লাম আমরা। তখনো ট্রেন ছাড়েনি, কিন্তু আমাদের মন কেবলই চাইছিল কখন চলতে শুরু করবে। জানালার পাশে আসন পেলাম আমি আর ভাই, আর বাবা-মা আমাদের বিপরীত দিকে বসে পড়লেন। তখনো ট্রেনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ে একটু ভীত ছিলাম, তবে জানালার বাইরে যে দৃশ্যমান পৃথিবী ছিল, তা এক অন্যরকম কল্পনাময় এক নতুন দুনিয়া।

কিছুক্ষণ পর ট্রেন চলতে শুরু করল। প্রথমে ধীরে ধীরে, আর তারপর আস্তে আস্তে গতি বাড়াতে লাগল। বাইরে জানালার পাশে যতই দৃশ্যগুলো একে একে ছুটে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল যেন আমরা কোনো স্বপ্নের মধ্যে প্রবেশ করছি। ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখি মাঠ, গাছ, পুকুর, দূরে দূরে গরুর গাড়ি কিংবা গ্রামের মানুষজনের চলাচল। কখনো ছোট ছোট ঘরবাড়ি, কখনো বা সবুজ ধানের ক্ষেত। মা বললেন, “দেখছো, এটাই তো আমাদের দেশ, কেমন সুন্দর, তাই না?” মাথা নাড়লাম আমরা। সত্যিই তো, এতদিন এই দৃশ্যগুলো কেবল গল্পের বই কিংবা টিভিতেই দেখেছি।

ট্রেন চলতে চলতে নানা স্টেশনে থামল। প্রতিটি স্টেশনে নতুন নতুন যাত্রীরা উঠছেন আর নামছেন, কেউ হয়তো হকারের কাছ থেকে নাস্তা কিনছেন। একটা স্টেশনে থামতেই বাবা ছোট ছোট প্লাস্টিকের গ্লাসে চা আর কিছু খাবার কিনে আনলেন। সে চায়ের স্বাদ যেন অন্যরকম। ঘরের সাধারণ চায়ের তুলনায় একটু অন্যরকম লাগছিল বটে, কিন্তু কেন জানি না, এই ভ্রমণেই ওই চায়ের স্বাদ ছিল যেন স্বর্গীয়।

প্রথমবার ট্রেনের টানেলের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হচ্ছিল যেন এক অজানা রহস্যের ভেতরে প্রবেশ করেছি। চারপাশে কেবল অন্ধকার, আর ট্রেনের আওয়াজ যেন আরও গভীর আর তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। আমার ছোট ভাই প্রথমে ভয় পেয়ে আমার হাত ধরল, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার সে নিজেই আশ্বস্ত হলো। টানেল পেরিয়ে ট্রেন আবার যখন আলোর মাঝে ফিরল, আমাদের মধ্যে উত্তেজনার ঝলক দেখা গেল।

আমাদের সিটের পাশে এক বৃদ্ধলোক বসেছিলেন। তিনি নানা গল্প বলছিলেন। আমরা জানতে পারলাম যে উনি প্রায় প্রতিদিনই এই ট্রেন ধরে যাতায়াত করেন, কারণ তাঁর বাড়ি চট্টগ্রামের অদূরেই। তিনি জানালেন, তাঁর গ্রামের কাছেই একটা সুন্দর নদী আছে, যার উপর একটা সেতু রয়েছে। আমরা তখন নদী দেখতে উদগ্রীব হয়ে উঠলাম। তিনি তখন বললেন, “শিগগিরই দেখতে পাবে, একটু অপেক্ষা করো।

বৃদ্ধলোকটির কথামতো সত্যিই কিছুক্ষণ পর আমাদের ট্রেনটি একটা ব্রিজ পার হতে লাগল। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি, সেই নদীটা ঝলমল করছে রোদের আলোয়। পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিল কয়েকটা নৌকা, আর ছোট ছোট মাছরাঙা পাখি নদীর পানির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সেই দৃশ্য দেখার পর আমাদের মন ভরে গেল। বৃদ্ধলোকটির দিকে তাকিয়ে হাসলাম, তিনি যেন মনের মধ্যে সেই মুহূর্তের সৌন্দর্য গেঁথে দিলেন।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে রোদের তাপও বাড়ছিল, কিন্তু ট্রেনের ভেতরের বাতাস ছিল মিষ্টি আর ঠান্ডা। হালকা হাওয়ার কারণে আমরা এতক্ষণে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুমের মধ্যে ট্রেনের গড়গড় শব্দ যেন মৃদু ঘুমপাড়ানি গানের মতো লাগছিল। আমাদের মা একটু পর পর আমাদের দিকে নজর দিচ্ছিলেন, আর বাবা জানালার বাইরে প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে একের পর এক ছবি তুলে যাচ্ছিলেন।

আমাদের যাত্রাপথের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে ট্রেনের গতিবেগ কমতে শুরু করল। আমাদের গন্তব্য খুব কাছেই ছিল। বাবা-মা আমাদেরকে সতর্ক করলেন ব্যাগ গোছানোর জন্য। তখনো জানালার বাইরে গাছপালা, ছোট ছোট ঘরবাড়ি চোখে পড়ছিল। চট্টগ্রাম স্টেশনের কাছে আসতেই এক নতুন শহরের ব্যস্ততা আর কোলাহল চোখে পড়তে লাগল। প্ল্যাটফর্মের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, এই ভ্রমণটি আমার জীবনের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ছোট্ট শহরের কোলাহল থেকে বড় শহরে পৌঁছানোর সেই মুহূর্তটুকু আমাকে আরও জানিয়ে দিল যে, ট্রেনযাত্রা শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর একটি মাধ্যম নয়; এটি একটি স্মৃতির কারিগরও।

ট্রেনের সেই যাত্রাটি আমার মনের গভীরে একটা চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। আজ এত বছর পরও সেই স্মৃতিগুলি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ট্রেনের জানালার পাশে বসে ছোট ছোট গাছ, নদী, মাঠ আর মানুষের মুখ দেখতে দেখতে যে অনুভূতি হয়েছিল, সেটি আজও ভুলতে পারিনি।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ