Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩০ অক্টোবর, ২০২৪ ০১:৫২ পূর্বাহ্ণ

প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব ও এর মানোন্নয়নে করণীয়।

প্রাথমিক শিক্ষা হলো একটি শিশুর মৌলিক শিক্ষা বা বুনিয়াদি শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষার ভিত যত মজবুত হবে পরবর্তী ধাপের শিক্ষা গ্রহণ ততো সহজ ও সাবলিল হবে।  আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষা পাঁচ বছর মেয়াদি ছিল তবে এখন অনেক স্কুলেই ৪+ ও ৫+ বছর  বয়সী শিশুদের জন্য প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু হয়েছে।  প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু হয়েছে সাধারণত শিশুকে স্কুলে গমন উপযোগী করে তোলার জন্য।  শিশুকে স্কুলে ভর্তির শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে প্রস্তুতি নেয়ার জন্য যাতে শিশুর ৬+ বছর বয়স হলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে অভিযোজিত হতে পারে। 


প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্যঃ 


শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, নৈতিক, মানবিক, নান্দনিক, আধ্যাত্মিক ও আবেগিক বিকাশ সাধন এবং তাদের দেশাত্মবোধে, বিজ্ঞানমনোস্কতায়, সৃজনশীলতায় ও উন্নত জীবনের স্বপ্নদর্শনে  উদ্বুদ্ধ করা।


প্রাথমিক শিক্ষা শেষে একটি শিশু - 


 ‌‌√  অন্যের মতামত ও অবস্থানকে সম্মান ও অনুধাবন করে প্রেক্ষাপট অনুযায়ী নিজের ভাব, মতামত যথাযথ মাধ্যমে সৃজনশীলভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম হবে। যে কোনো ইস্যুতে সূক্ষ্মচিন্তার মাধ্যমে সামগ্রিক বিষয়সমূহ বিবেচনা করে সকলের জন্য যৌক্তিক ও সর্বোচ্চ কল্যাণকর সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। 


√  ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যকে সম্মান করে নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক হয়ে নিজ দেশের প্রতি ভালোবাসা ও বিশ্বস্ততা প্রদর্শন করে বিশ্ব-নাগরিকের যোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হয়ে উঠবে। 


√ পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে দৈনন্দিন অদ্ভূত সমস্যা গাণিতিক, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা ব্যবহার করে সমাধান করতে পারবে এটা নিঃসংকোচে বলা যায়। 


√ ধর্মীয় অনুশাসন, সততা ও নৈতিক গুণাবলি অর্জন এবং শুদ্ধাচার অনুশীলনের মাধ্যমে প্রকৃতি ও মানব-কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারবে।  


প্রাথমিক শিক্ষা শেষে একটি শিশু যে সুনির্দিষ্ট যোগ্যতাগুলো অর্জন করবে বলে প্রত্যাশা করা হয় সেগুলোকে প্রান্তিক যোগ্যতা বলে। প্রান্তিক যোগ্যতা ২৯ টি ছিল।  সেগুলোকে সংযোজন বিয়োজন করে বর্তমানে ১০টি প্রান্তিক যোগ্যতায় সংশ্লেষণ করে সুচিহ্নিত করা হয়।


এখন জেনে নেয়া যাক, যোগ্যতা কী? 


প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে, যোগ্যতা হলো দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে অভিযোজনের জন্য জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে অর্জিত সক্ষমতা। 


* প্রাথমিক শিক্ষাকে একীভূত শিক্ষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া যেতে পারে।  কারন বস্তির শিশু, ভাসমান শিশু,  যৌনকর্মীর শিশু, নিম্নজাতের শিশু,  বেদে শিশু, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু, আদিবাসী শিশু,  উপজাতি শিশু,  বিভিন্ন ধর্মের শিশু, কর্মজীবী শিশু এমন সকল ধরনের শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় এনে একই শিক্ষা দান করা হয়।  


প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্বঃ 


প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব সর্বাগ্রে।  কারন প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে শিশুর শিক্ষা জীবনের মূল ভিত্তি।  প্রাথমিক শিক্ষা শিশুর মৌলিক অধিকার।  সরকার সার্বজনীন ফ্রী প্রাথমিক শিক্ষা চালু করলেও শিশুর মৌলিক শিক্ষা সুনিশ্চিত করতে সরকারের পাশাপাশি অভিভাবক ও স্থানীয় প্রশাসনকে আরও বেশি সজাগ হতে হবে। মনে রাখতে হবে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ লেখাপড়ার ভিত্তি হলো এই প্রাথমিক শিক্ষা। কেননা এই প্রাথমিক শিক্ষাই ভবিষ্যত জীবনের মূল চালিকা শক্তি হয়ে উঠে। তাই প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব বলে শেষ করা যাবে না। 


যদিও প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও প্রান্তিক যোগ্যতার মাঝেই প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব লুকিয়ে আছে তথাপিও নিচে প্রাথমিক শিক্ষার কিছু অনস্বীকার্য গুরুত্ব তুলে ধরা হলোঃ 


১)  প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে শিশুর মূল্যবোধ ও চিন্তা করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এই শিক্ষা শিশুকে জ্ঞান পিপাসু করে তুলে।


২) প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে শিশু দেশপ্রেমী, উদার, দয়ালু, পরোপকারী,  শুদ্ধাচারী,  গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন, পরমমত সহিষ্ণু ও স্বাস্থ্য  সচেতন হয়ে উঠে। 


৩) শিশু বিভিন্ন শ্রমজীবী ও পেশাজীবীদের মর্যাদা দিতে শিখে। 


৪) শিশু পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সাথে অভিযোজন করতে শিখে।


৫) যে সকল শিশু  প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে পরবর্তী শিক্ষা লাভের সুযোগ পায় না তাদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা একমাত্র জীবনমুখী শিক্ষা। 


৬) যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে শিশু প্রথম ভাষা শিখে প্রাথমিক শিক্ষার লেখা ও পড়ার মাধ্যমে।  


৭) প্রাথমিক হিসাব নিকাশ করতে শিখে।


৮) পরিবেশ সংরক্ষণ,  সম্পদ ও শক্তর অপচয় রোধ  করতে শিখে। 


৯)  উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখতে শ


১০) সামাজিক,  বন্ধুসুলভ ও প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি হয়। 


১১) নিজের দায়িত্ব,  কর্তব্য ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে শিখে। 



প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিশুদের প্রত্যাশাঃ


# শিশুদের স্কুলে অবস্থান করার দীর্ঘ সময়কে সংক্ষিপ্ত করলে শিশুরা আরও বেশি খেলা, সাঁতার ও দৌড়-ঝাঁপ করার মাধ্যমে শৈশবকে উপভোগ করার সুযোগ পাবে। 


#  ভৌত অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। যেমন - ছাত্র অনুপাতে শ্রেণি কক্ষের ঘাটতি দূর করতে হবে। বসার বেঞ্চ উন্নতমানের করতে হবে্ এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে বেঞ্চ থাকতে হবে। 


#  ক্লাসরুমে স্মার্ট বোর্ডের ব্যবস্থা করতে হবে। 


# পর্যাপ্ত এলইডি/টিউবলাইট ও ফ্যানের ব্যবস্থা থাকতে হবে। 


# ছাত্র -শিক্ষক অনুপাত ৩০:১ বাস্তবায়ন করতে হবে। 


# স্কুলে নিরাপদ পানি পান করার জন্য উন্নতমানের বৈদ্যুতিক ফিল্টার সরবরাহ করতে হবে। 


# মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম,  ক্যান্টিন, অডিটোরিয়াম,  নামাজঘর, কমনরুম, অভিভাবক বিশ্রামাগার করতে হবে।


# আায়া, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর,  ধর্ম,  শিল্পকলা, সংগীত এর বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।


# শিশুদের উপবৃত্তির টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। প্রতিবছর কিটস এলাউন্স দিতে হবে। 


# বইয়ের বাইন্ডিং ও পেজ উন্নতমানের হতে হবে। 


# ২/৩ টা  ক্লাসের পর শিশুদের নাস্তা বা মিড ডে মিল সরকারিভাবে চালু করতে হবে।


# শিশু ও শিক্ষকদের জন্য  ইউনিয়ন / পৌরসভা বা ক্লাস্টার ভিত্তিক ডাক্তার নিয়োগ ও ঔষধ সরবরাহ করতে হবে। 


# শিক্ষকদের জন্য আবাসিক থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। 


# শুন্য পদে দ্রুত বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে পদোন্নতি চালুু করতে হবে।  

# শিক্ষকদের কর্মকর্তার মর্যাদা দিতে হবে। পিটিআই সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদাগত বৈষম্য দূর করতে হবে। 


# শিক্ষকদের পাঠদান ব্যাতীত আনুষঙ্গিক কাজের চাপ কমাতে হবে। 


# দক্ষ, পরিশ্রমী শিক্ষকদের ও বিভিন্ন পর্যায়ে জাতীয় শিক্ষা পদক প্রাপ্ত শিক্ষকদের পুরস্কার স্বরূপ  বিশেষ প্রণোদনা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।  


# শিক্ষকদের পাঠদানের সংখ্যা কমিয়ে একদিনে সর্বোচ্চ ৪ টা পাঠদান করার অফিস আদেশ জারীী করতে হবে। 


# ছাত্র- শিক্ষক ও  শিক্ষক অভিভাবক সম্পর্ক্ আরও বেশি আন্তরিক হতে হবে। 


# মাঝারি বা তীব্র আকারের বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের প্রতি ক্লাস্টার বা উপজেলা ভিত্তিক একটি করে বিশেষ স্কুল চালু করতে হবে। 


# স্থানীয় ব্যক্তি, প্রাক্তন ছাত্রদের স্কুলের উন্নয়নে অবদান রাখতে হব। 


# স্কুলের বরাদ্দ  ( নির্মাণ, মেরামত,  স্লিপ ....   প্রভৃতি)  যথাযথভাবে খরচ করা নিশ্চিত করতে হবে। 


# এসএমসি কমিটি সকল অভিভাবকের সাথে মতবিনিময় করে গঠন করতে হবে।  এই কমিটি গঠনে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত রাখতে হবে। 


# কেউ শিক্ষককে  অসম্মান, অপমান, অপদস্ত ও মানহানী করলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। 


আজকের শিশু আগামী দিনের কর্ণধার।  তাই শিশুকে যুগোপযোগী করে তোলা এক ধরনের চ্যালেঞ্জ !  এই চ্যালেঞ্জগুলো দূর করা সময়ের দাবি। অন্য দিকে শিক্ষককে পাঠদানে আরও বেশি আন্তরিক হতে হবে এবং অভিভাবকদের সন্তানের প্রতি নজরদারি বাড়াতে হবে। স্কুলের পাশাপাশি বাড়িতেও শিশুকে বেশি বেশি শুদ্ধাচার শেখাতে হবে এবং অনুশীলন করাতে হবে।   


 


মোসাঃ তোসলিমা খাতুন

সহকারী শিক্ষক, 

কাপাশিয়া সপ্রাবি, পবা, রাজশাহী। 


দৈনিক নতুন প্রভাত ( কলাম ) 

০১/০৯/২০২৪ ইং। 


মন্তব্য করুন

ব্লগ