Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩০ অক্টোবর, ২০২৪ ০৯:৩৯ অপরাহ্ণ

জাপানের শিক্ষা ব্যাস্থাপনা কেমন

বাধ্যতামূলক শিক্ষা ৬ বছরের প্রাথমিক বিদ্যালয় দিয়ে শুরু হয় এবং মোট ৯ বছরের জন্য ৩ বছরের নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাধ্যমে শেষ হয়। শিক্ষার্থীরা তারপর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যায়, যা তাদের বাধ্যতামূলকশিক্ষা সম্পন্ন করে এবং ৩ বছরের মধ্যে সম্পন্ন করা শিশুদের পূরণ করে। জাপানে প্রাথমিক এবং নিম্ন মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা বাধ্যতামূলক। জাপানে নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য সরকারি বিদ্যালয় জনপ্রিয়। কিন্তু বেসরকারী বিদ্যালয়সমূহ জনপ্রিয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের পুনঃগঠন ও বাণিজ্যিক সাফল্যে শিক্ষা সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ জাপানে শিক্ষার জন্য আইন পাশ করে। সেই আইনের জন্য বর্তমানের জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও এই আইনের প্রভাব রয়েছে। এই আইন জাপানের বিদ্যালয়ের বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা নির্ধারণ করেছে। ছয় বছরের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়, তিন বছরের জন্য নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, তিন বছরের জন্য উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, দুই অথবা চার বছরের বিশ্ববিদ্যালয়। প্রাথমিক শিক্ষার পূর্বে শিশুদেরকে কিন্ডারগার্টেন আর ডে কেয়ার সেন্টারে প্রধান করা হয়। পাবলিক এবং ডে কেয়ার সেন্টার এক থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের গ্রহণ করে। কিন্ডারগার্টেনে খেলাধুলারর মাধ্যমে শিক্ষা দেয় এবং উচ্চারণের শিক্ষা দেয়। আর তারা এমন শিক্ষা দান করে, যাতে একটি শিশু প্রাইভেট বিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়।

জাপানের অপরাধ শতকরায় শূন্য। জাপানিদের এমন সুন্দর সমাজব্যবস্থার ভিত্তি আসলে কি? বা আপনি যদি অন্যভাবে প্রশ্ন করেন তাদের এমন চরিত্র গঠনের ভিত্তি কোথায়? তাহলে একবাক্যে বলতে হয় সেটা শেখানো হয় তাদের স্কুলগুলোতে। 


তাদের স্কুলে অনেক কিছু শেখানো হয়। যার মধ্যে গণিত, ভাষা, নৈতিকতা ইত্যাদি। জাপানের স্কুলগুলোতে জীবনমুখী শিক্ষা দেয়া হয়। শেখানো হয় সামাজিকতা, ন্যায়-অন্যায়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি।


জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা ৫ ভাগে বিভক্ত। কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ৩-৫ বছর, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬-১১ বছর, জুনিয়র হাইস্কুল/মিডল স্কুলে ১২-১৪ বছর এবং সিনিয়র হাইস্কুলে ১৫-১৭ বছরের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা দেয়া হয়। আর বিশ্ববিদ্যালয় অথবা ভোকেশনাল স্কুল ২-৪ বছরমেয়াদি হয়।


জাপানের প্রাথমিক বিদ্যালয় আর জুনিয়র হাইস্কুল হচ্ছে বাধ্যতামূলক শিক্ষার পর্যায়। প্রাথমিক স্কুল ৬ বছর আর মিডল স্কুল ৩ বছর। ৬ বছর হলে শিশুরা প্রাথমিক স্কুলে যেতে পারে। সরকারি এবং বেসরকারি দুই ধরনের প্রাথমিক স্কুল রয়েছে। দুই ধারাই বেশ জনপ্রিয়। 


জাপানের প্রাথমিক স্কুলগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীরা এক ধরনের টুপি পরে আর 'রানদোশেরু' নামক এক ধরনের ব্যাগ বহন করে। টুপি একেক স্কুলের জন্য ভিন্ন রং হতে পারে। ছেলে এবং মেয়েরা ব্যাগ পিঠে বহন করে স্কুলের পথে হেঁটে যায়। স্কুলে আসার পর তারা জুতা বদল করে ক্লাসরুমের জন্য ভিন্ন জুতা পরে নেয়।


প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিশুরা সোমবার থেকে শুক্রবার সপ্তাহে ৫ দিন ক্লাস করে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক-একটি ক্লাসের সময়সূচি হল ৪৫ মিনিট। প্রতিটি ক্লাসের মাঝে ১০-১৫ মিনিট বিরতি থাকে। একদিনে সর্বোচ্চ ৬টি ক্লাস হয়। টিফিনের আগে ৪টি ক্লাস, টিফিনের পরে ২টি ক্লাস। 


দিনের শুরুতে প্রধান শিক্ষক সবার আগে স্কুলে আসেন। তিনি স্কুল গেটে দাঁড়িয়ে সব ছাত্র-ছাত্রীকে অভ্যর্থনা জানান। শিক্ষার্থীরা স্কুলে ঢুকে বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। ক্লাস শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত কেউ খেলাধুলা, কেউ বিভিন্ন প্রোগ্রামিং কার্যক্রম, কেউ হ্যান্ড ক্রাফটে কাজ করে। ক্লাস শুরু হওয়ার ইঙ্গিতস্বরূপ এক ধরনের বিশেষ মিউজিক বেজে উঠে। তখন সব ছাত্র-ছাত্রী দলবেঁধে ওয়াশরুমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে শ্রেণিকক্ষে ফেরে।


প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নানারকমের সাবজেক্ট পড়ানো হয়। যেমন জাপানি ভাষা, গণিত, ইতিহাস, শরীরচর্চা, সংগীত ও শিল্প, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, বিজ্ঞান, অংকন বিদ্যা, নৈতিক শিক্ষা ইত্যাদি। এ সব ক্লাসের সঙ্গে সঙ্গে আরও বিশেষ কিছু ক্লাস এবং সমন্বিত পাঠ্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে হয় নিয়মিত। প্রতিটি ক্লাসে ৩০-৩৫ জন ছাত্র-ছাত্রী থাকে। প্রতিটি ক্লাসে একজন শিক্ষক থাকেন। সংগীত আর শিল্পকলা এবং শারীরিক শিক্ষার জন্য একজন বিশেষজ্ঞ শিক্ষক থাকেন।


জাপানের স্কুলগুলোতে শিশুদের কিছু বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কাজ করতে হয়। যেমন সকালের সমাবেশের সময় শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করা, শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-ছাত্রীদের হাজিরা ক্ষেত্রে শিক্ষককে সহযোগিতা করা, বাগানের পরিচর্যা করা, খাবার পরিবেশন করা এবং খাবারের পর পরিষ্কার করা ইত্যাদি।


জাপানের প্রাথমিক স্কুলগুলোতে দুপুরের খাবার বিদ্যালয় থেকে পরিবেশন করা হয়। খাদ্য তালিকা এবং খাবারের গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য একজন ডায়েটেশিয়ান থাকেন। ডায়েটেশিয়ান বাচ্চাদের কোন্ খাদ্যের কতটুকু ক্যালরি প্রয়োজন তা হিসাব করে ব্যালান্সড ডায়েট তৈরি করেন যা দেখে দক্ষ এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাবুর্চিরা খাবার রান্না করেন। 


প্রত্যেকটি স্কুলে নিজস্ব রান্নাঘর রয়েছে। দুপুরের খাবারের সময় ছাত্র-ছাত্রীরা সংগীতের তালে তালে খুব আনন্দের সঙ্গে বিশেষ ধরনের পোশাক পরে সারিবদ্ধভাবে রান্নাঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে শ্রেণিভিত্তিকভাবে নিজেদের উপস্থিতির জানান দেয়। তখন রান্নাঘরের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিগণ খাবার বুঝিয়ে দেন। খাবার নিয়ে ক্লাসে ফিরে ছাত্র-ছাত্রী নিজেরাই খাবার পরিবেশন করে। 


খাবার গ্রহণের সময় শিশুদের জানানো হয়, তারা কি খাচ্ছে এবং কেন খাচ্ছে ইত্যাদি। শেখানো হয় যিনি খাদ্য রান্না করেছেন তার প্রশংসা কিভাবে করতে হয়। খাবার গ্রহণের সময়টাতে শিশুরা প্রার্থনা শুরু করে এবং খাবার শেষেও। খাবার গ্রহণ শেষ হলে শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করে আবার শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়।


মন্তব্য করুন