সহকারী শিক্ষক
০৯ নভেম্বর, ২০২৪ ০৬:৫৪ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
#শিশুদের_ব্রেন_ও_আমাদের_করনীয়:
আমরা এখন থেকে মূলত যে বিষয়ে কথা বলবো তা হল STEM ( সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ম্যাথমেটিক্স)। কারণ আগামী দিনে চাকরির সুযোগ এই ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশী হবে। আর সঙ্গে এটাও বলেছি, সায়েন্স বা টেকনোলজি শুধু পড়ে নম্বর পেয়ে ডিগ্রী পেলেই হবে না। আগামী দিনে চাকরি পেতে হলে যেটার উপর সবচেয়ে বেশী জোর দিতে হবে সেগুলো হল, problem solving, critical thinking আর decision making স্কিল। কারণ, নম্বরের দিন শেষ।
এবার যেটা ভাবার তা হল, এই অভ্যাস একদিনে তৈরী হয় না। আর বড়ো বয়সে তো একেবারেই হয় না। ছোট থেকে ধারাবাহিক ভাবে বাচ্চাদের মধ্যে এই অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কোন বয়স থেকে? শিশু মনোবিজ্ঞানী রা বলছেন, মোটামুটি ৩ বছর থেকেই শুরু করা যায়, তবে ৫ বছর হলে অবশ্যই শুরু করতে হবে। এই সময় থেকে তারা কার্য কারণ সম্পর্কে উৎসুক হয়। কারণ তাদের ব্রেনের গঠন প্রায় পরিণত হয়ে যায়।
বায়োলজির ভাষায় বললে, আমাদের মাথায় প্রায় ১০০ বিলিয়ন নিউরন থাকে। নিউরন হল ব্রেনের কোষ। যাদের দুটি মূল অংশ ডেনড্রাইট ও অ্যাকশন। ছোট তে, জন্মের পর পরই, এই গুলো নিজেদের মধ্যে জুড়ে থাকে না। আস্তে আস্তে এই নিউরন গুলো নিজেদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরী করে একটা ব্রেন নেটওয়ার্ক তৈরী করে। এই নেটওয়ার্ক এর উপরেই নির্ভর করে কোন বাচ্ছা কেমন ব্রেনী হবে। আর এই ৫ বছর বয়সে প্রায় ৯০% কানেকশন তৈরী হয়ে যায়। প্রায় ৭৭% তৈরী হয় সেরিব্রাল কর্টেক্স বলে অংশে, ব্রেনের যে অংশটাই আসলে ভাষা, স্মৃতিশক্তি, জটিল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে। এই নিউরন গুলো একে অপরের সঙ্গে যে বিন্যাসে জুড়ে থাকে তা প্রতিটি মানুষের জন্য আলাদা। আর আলাদা বলেই তাদের মনে রাখার ক্ষমতা, বোঝার ক্ষমতা, বিশ্লেষণের ক্ষমতা এক একজনের এক এক রকম হয়। যাইহোক, মোদ্দা কথা এই যে, ৫ বছর বয়স পর্যন্ত খেয়াল রাখতে হবে যে তাদের ব্রেনের এই গঠন টা যেন ভালো ভাবে হয়।
? ব্রেনের গঠন বা ওই নেটওয়ার্ক তখনই ভালো হয় যখন বাচ্চাদের বিভিন্ন বিষয়ে ভাবতে দেওয়া হয়। অর্থাৎ চ্যালেঞ্জ করলে ওরা একটা সমাধান বের করার চেষ্টা করবে ওদের ব্রেনের কোষ গুলো কাজে লাগিয়ে। আর কোষ গুলো চেষ্টা করবে অন্য কোষ গুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে যদি কিছু সমাধান বের করা যায়। এভাবে কোষ গুলোর নিজেদের মধ্যে একটা ভালো নেটওয়ার্ক তৈরী হয়ে যাবে। বায়োলজির ভাষায় বললে, বাচ্চাদের মধ্যে ঔৎসুক্য বাড়িয়ে দিতে পারলে, বা ভাবার মতো কাজ দিলে তাদের মাথা থেকে ডোপামাইন বলে একটা হরমোন বেরোয়। আর সেই হরমোন টা নিউরন গুলোর ডেনড্রাইট গুলো কে উত্তেজিত করে যাতে তারা অন্য কোষের অ্যাকসন এর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। এইভাবেই সমস্ত নিউরন এর মধ্যে যোগাযোগ গড়ে ওঠে। এই প্রসেস টার নাম #সায়ন্যাপটোজেনেসিস। পাশাপাশি মায়েলিনেশন বলে আর একটা প্রসেস চলে যেটা এই নিউরন গুলোর গায়ে একটা মোটা চাদর এর মত স্তর তৈরী করে যেগুলো অন্য নিউরন এর সঙ্গে আরও ভালোভাবে যোগাযোগ করতে সাহায্য করে। তাই এই সময় যত মাথা ঘামাবে ততো ই ব্রেনের এই নেটওয়ার্ক মজবুত হবে। গোদা বাংলায় বললে, ততই বাচ্চাদের বুদ্ধি গড়ে উঠবে।
? আবার এই বয়সে বাচ্চাদের ভয় বা মানসিক চাপ দিলে হয় ঠিক উল্টো। বায়োলজির ভাষায় বললে, বাচ্চারা মানসিক চাপ পেলে তখন আবার কর্টিসল নামে একটা হরমোন নিঃসরণ হয়, যেটা ব্রেনের হিপ্পোকম্পাস অংশের নিউরোন গুলো কে ধবংস করতে শুরু করে। আর এই হিপ্পোকম্পাস ই আমাদের স্মৃতি ও মনে রাখার ক্ষমতা কন্ট্রোল করে। অর্থাৎ, ওই বাচ্চার স্মৃতিশক্তি কমে যায়। তাই এই সময় বাচ্চাদের কোনো ভাবেই মারা তো দূর, বকা ঝকা করাও উচিত না। বা তাদের সামনে চিৎকার চেঁচামেচি করা উচিত না। সবসময় আদর করে, ঠান্ডা মাথায় ভালো ভাবে বোঝানো দরকার যাতে বাচ্ছা খুশি থাকে, আনন্দে থাকে।
?এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই সময় কি কি করা যায় যাতে তাদের ব্রেনের গঠন ভালো হয় ! সবার আগে যেটা দরকার তাহল, বাচ্চাদের সঠিক পুষ্টি। প্রকৃতির সঙ্গে ব্রেনের একটা সম্পর্ক আছে। তাই প্রকৃতি থেকে পাওয়া শাক সবজি মাছ মাংস নিয়মিত খেলে ব্রেনের গঠন ভালো হবে। নিয়মিত পার্কে যাওয়া, অন্তত ৩০ মিনিট দৌড়াতে পারবে এমন খেলা বা সাঁতার এগুলো খুব উপকারী। পাশাপাশি এই সময় বাচ্চা যত বেশি মানুষের সঙ্গে মিশবে তার ব্রেনের গঠন ততো তাড়াতাড়ি ও ভালো হবে। বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে সব বাচ্চারা এই সময় তাদের মা বাবা দাদু দিদার সঙ্গে বেশী সময় কাটিয়েছে তাদের ব্রেনের গঠন অন্য বাচ্ছা যারা সেভাবে তাদের মা বাবার সঙ্গে সময় কাটাতে পারে নি তাদের থেকে কয়েকগুন ভালো হয়েছে। সামাজিক মেলামেশা ব্রেন কে এক্টিভ রাখে ও ব্রেনের গঠনে সাহায্য করে। বায়োলজির ভাষায় একে বলে #প্লাস্টিসিটি।
? ইংরেজি তে একটা কথা আছে, "use it or loose it." অর্থাৎ হয় ব্যবহার করুন না হলে ভুলে যান। তাই এই সময় ব্রেনকে কাজে লাগাতে হবে। এই কারণেই প্লে স্কুলে ভর্তি করা ভালো কারণ ওখানে অন্য বাচ্চাদের অ্যাকটিভিটি দেখে তার ব্রেন নুতন কিছু করার চেষ্টা করবে। আর তাতে তার ব্রেনের গঠন ভালো হবে। তাছাড়া এইসময় তারা ত্রিমাত্রিক জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট হয়। অর্থাৎ গাড়ি বা যেকোনো খেলনা। তাই বিভিন্ন ধরনের প্রবলেম সলভিং খেলনা দিলে তাদের মাথা ঘামানোর সুযোগ হবে যা আসলে ব্রেন কে আরো মজবুত করবে। এই বয়সে ম্যাক্সিমাম ১৫ মিনিট এর বেশি বাচ্চারা কনসেন্ট্রেশন রাখতে পারে না কোনো কাজে। তাই ব্লক পাজেল টাইপের খেলা সলভ করার প্রাকটিস করানো যেতে পারে যাতে অন্তত একটু সময় লাগবে আবার ভাবতেও হবে। বা ধরুন, ব্লক দিয়ে বাড়ি বানালো বা বলি দিয়ে ঘর। যেকোনো কাজ যা হাতে কলমে করবে কিন্তু করতে গেলে সামান্য হলেও ভাবতে হবে। খেলার সময় এমন কিছু তে ব্যস্ত রাখতে হবে বাচ্চাকে যেন সে মাথা ঘামাতে ব্যস্ত থাকে।
পাশাপাশি মনে রাখবেন, #টিভি_বা_মোবাইল_বাচ্চাদের_জন্য_অত্যন্ত_ক্ষতিকারক #প্রভাব_ফেলে। যে সব বাচ্চারা টিভি ও মোবাইল এ বেশী সময় কাটায় তাদের ব্রেন অতিরিক্ত এক্টিভ হয়ে যায় ও সেই সব বাচ্চারা অতিরিক্ত চঞ্চল হয় ও যেকোনো বিষয়ে কম মনোযোগ দিতে পারে। ভবিষ্যতের জন্য খুব ই ক্ষতিকর।
? অন্য একটা মজার বিষয় বলি, সাউদার্ন ক্যালিফর্নিয়া ইউনিভার্সিটি তে ৩৭ জন বাচ্ছাদের উপর ৫ বছর ধরে একটা পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। সেখানে দেখা গেছে, যারা ভায়োলিন শিখেছিল, তাদের ব্রেণের ডেভেলপমেন্ট অন্যদের থেকে ভালো। ক্যালিফর্নিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা গেছে, বাচ্ছাদের ব্রেনের গঠন বা বুদ্ধি মিউজিক এর সঙ্গে সম্পর্কিত। যে বাচ্চারা গান শুনে (ওদের মোজার্ট এর মিউজিক শোনানো হয়েছিল) অঙ্কের পরীক্ষা দিযেছিল তাদের পারফরম্যান্স অন্যদের থেকে ভালো। একে মোজার্ট এফেক্ট বলা হয়। মিউজিক এর সঙ্গে অঙ্কের একটা কিছু সম্পর্ক আছে নিশ্চয়। আমার ও মনে পড়ে, আমি ছোট বেলায় অঙ্কে খুবই ভালো ছিলাম। গান শিখতাম ৩ বছর বয়স থেকে। পাশাপাশি আমি সবসময় গান শুনতে শুনতেই অঙ্ক প্রাকটিস করতাম। তাই বাচ্ছা দের যে কোনো বাদ্যযন্ত্র বা গান শেখাতে পারলে ভাল।
?সবার শেষে যে খুবই গুরুত্বপূর্ন বিষয় টা আসবে সেটা হল, এই সময় এদের মনে প্রচুর প্রশ্ন তৈরী হয়। "তোর এতো প্রশ্ন কিসের?" বলে থামিয়ে দেবেন না।বরং প্রশ্ন করার অভ্যাস কে আরো বেশী করে উৎসাহ দেওয়া দরকার। তবে সরাসরি প্রশ্নের উত্তর বা সমাধান বলে দেবেন না। তাকে আরো প্রশ্ন করে ভাবতে সাহায্য করুন যাতে সে নিজে একটা সমাধান বের করে বা একটা উত্তর খুঁজে বের করে, হোক না সেটা ভুল উত্তর। কিন্তু নিজে ভেবে উত্তর বের করার অভ্যাস টা তার ব্রেনের গঠনে কাজে লাগবে।
৬৪
১০০ মন্তব্য