Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৪ নভেম্বর, ২০২৪ ০৮:৩৪ অপরাহ্ণ

শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নের ধারণা, গুরুত্ব ও পেশাগত উন্নয়নের উপাদান বিশ্লেষণ

শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নের ধারণা, গুরুত্ব ও পেশাগত উন্নয়নের উপাদান বিশ্লেষণ




ভুমিকাঃ শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়ন যে কোন প্রতিষ্ঠানের জন্য অপরিহার্য। ব্যক্তির দৃষ্টিতে এর গুরুত্বকে অবহেলা করা যায় না। পেশাগত উন্নয়ন যে শুধু শিক্ষকতের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করে তাই নয় এটা প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলী সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করতে সহায়তা করে থাকে। পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে যিনি যে পেশায় নিয়োজিত আছেন সে কার্যের প্রক্রিয়ায় তার পেশার উন্নয়ন ঘটিয়ে স্বীকৃতি অর্জন করাকে পেশাগত উন্নয়ন বলে। অন্যভাবে বলা যায়, কোন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আনুষ্ঠানিক ও কাঠামোগতভাবে শিক্ষকের জ্ঞান, সচেতনতা, চিন্তা-চেতনা ও সামর্থ্য বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে পেশার উৎকর্ষ সাধনে নির্দেশনা করে তাকে পেশাগত উন্নয়ন বলা হয়। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে পেশাগত উন্নয়নের গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, পাঠদানের প্রতি আকর্ষণ, কার্য প্রক্রিয়া উন্নয়ন ও চিন্তাচেতনার প্রসারতার জন্য পেশাগত উন্নয়নের গুরুত্ব উত্তরোত্তর আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

পেশাগত উন্নয়নঃ পেশাগত উন্নয়নের মাধ্যমে ব্যক্তি পেশার সাথে প্রয়োজনীয় এবং নবতর জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির উন্নয়ন সাধন করেন। পেশার সার্বিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন পেশাগত উন্নয়ন। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তি কর্মক্ষেত্রের উপযুক্ত একজন সদস্য হিসেবে গড়ে ওঠেন। শিক্ষার্থীরা কী শিখতে চাচ্ছে, কীভাবে শিখতে চাচ্ছে, তাদের আগ্রহ কতটুকু ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষকের সচেতন থাকতে হয়। পাশাপাশি শিক্ষক শ্রেনিকক্ষে কোন কোন পদ্ধতি অবলম্বন করেন, কোন ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগ শিক্ষক সাবলীল, তাঁর প্রয়োগকৃত পদ্ধতিগুলো কতটুকু ফলপ্রসু, শিক্ষার্থীদের চাহিদা প্রক্ষিতে আরো কী ধরনের পদ্ধতি প্রয়োজন ইত্যাদি সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণই হলো পেশাগত উন্নয়ন।

 

পেশাগত উন্নয়নের গুরুত্বঃ প্রত্যেক পেশায় মানুষের কিছু পেশাগত দায়িত্ব ও কর্তব্য থাকে যা তার পেশাগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারন করে। একইভাবে যাঁর শিক্ষক তাঁদের কিছু পেশাগত বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন। যেমন, যিনি যে বিষয়ের শিক্ষক তাঁর সে বিষয়ে গভীর জ্ঞান থাকা বাঞ্ছনীয়। আবার শুধু জ্ঞান থাকলেই হবে না, তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। যে জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে চাই তার থেকেও তা কিভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে সেটা অধিক গুরুত্বপূর্ন। আবার জ্ঞান ছড়িয়ে দিলেই হবে না, যে বা যারা তা গ্রহণ করছে তা তারা আদৌ গ্রহণ করতে পারছে কিনা, পারলেও কতটা গ্রহণ করতে পারছে ইত্যাদিও দেখার বিষয়। আর তা সার্থকভাবে সম্পন্ন করতে হলে প্রয়োজন- দক্ষতা, যোগ্যতা ও প্রায়োগিক জ্ঞান। শিক্ষকগনের সে সকল দক্ষতা, যোগ্যতা ও প্রায়োগিক জ্ঞান অর্জনের জন্যই প্রয়োজন পেশাগত উন্নয়ন।

 

পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের শিশুদেরকে বিশ্বনাগরিক হিসেবে প্রস্তুত করতে শিক্ষকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিভিন্ন শিশু বিভিন্নভাবে শিখে থাকে। একজন শিক্ষককে একুশ শতকের শিক্ষার্থীর চাহিদা পূরনের জন্য সর্বপ্রথম তাঁকেও একুশ শতকের উপযোগী শিক্ষক হতে হবে। চাকুরিকালীন সময়ে শিক্ষকগনের দক্ষতাকে শক্তিশালী করার জন্য অনুশীলনের প্রয়োজন রয়েছে। ফলপ্রসু পেশাগত উন্নয়ন প্রক্রিয়া একদল শিক্ষককে তাদের শিক্ষার্থীদের চাহিদা বিশ্লেষণে সাহায্য করে এবং শিক্ষার্থীদের সাফল্য অর্জনকে নিশ্চিত করে।

 

মাঝে মাঝে একজন অভিজ্ঞ শিক্ষকও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়, যেমন- বিষয়ভিত্তিক নতুন নতুন পরিবর্তন, নতুন নতুন শিক্ষণ পদ্ধতি, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, নতুন আইন ও প্রক্রিয়া এবং সর্বোপরি শিক্ষার্থীর নিত্যনতুন চাহিদা। যদি শিক্ষক এই সকল বিষয়ে অভিজ্ঞ না হন এবং নিজের দক্ষতার উন্নয়ন না করেন তবে শিক্ষার্থী ভোগান্তীর শিকার হয়। পাশাপাশি একজন নতুন শিক্ষকের নিকট বিদ্যালয়ের অনেক ব্যাপারই নতুন থাকে, যেমন-শেণি ব্যবস্থাপনা; নির্দেশনা, শিক্ষাক্রম, বিদ্যালয়ের সংস্কৃতি, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা, আদর্শমান, অভিভাবকের সাথে সম্পর্ক এবং অন্যান্য শিক্ষকের সাথে সম্পর্ক। নতুন শিক্ষকের জন্য এই অপরিচিত বিষগুলো অনেক সময় বিড়ম্বনা তৈরি করে। তাই তাঁর জন্য পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের বিকল্প নেই।

 

Arends (2001) বলেছেন – শিক্ষক কী করছেন এবং শিক্ষকের কার্যাবলি শিক্ষার্থীর সামাজিক এবং একাডেমিক শিখন কী প্রভাব ফেলছে তার ওপর নির্ভর করে কার্যকর শিখন। কার্যকর শিখনের পদ্ধতি ও গুরুত্ব সম্পর্কে Wong এবং Wong (১৯৯৮) বলেছেন- শিক্ষক হিসেবে আপনি আপনার শিক্ষার্থীর জীবনের স্পন্দনকে স্পর্শ করার চেষ্টা করুন। এতে করে আপনি এমন এক শিক্ষার্থীকে পাবেন যে ইতিহাস, শারীরিক শিক্ষা, বিজ্ঞান, গনিত সববিষয় শিখবে, নিজের অন্যসব কাজ করেও আপনাকে খুশি রাখাবার সবরকম প্রচেষ্টা গ্রহন করবে। শিক্ষককে তাই তাঁর পেশাগত উন্নয়ন সাধন করতে হবে।

 

শিক্ষার্থীর চাহিদা পূরনের জন্য নিজেকে যুগোপোযোগী রাখতে হবে, শিক্ষার্থীদের চিাহিদা বুঝতে হবে, তাদের সামর্থ্য অনুধাবন করতে হবে নিজের দুর্বলতা অনুসন্ধান করতে হবে শ্রেনিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখার জন্য নিত্য নতুন পদ্ধতি ও কৌশলের প্রয়োগ করতে হবে, নতুন জ্ঞান সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে এবং নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে। সার্বিকভাবে শিক্ষার্থী, শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজে নিজেকে আদর্শরূপে প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে। অন্যথায় এর প্রভাব পড়বে সরাসরি শিক্ষার্থীদের ওপর। ফলে তারা বিদ্যালয় বিমুখ হবে, বিদ্যালয়ে শেখার তুলনায় প্রাইভেট বা কোচিং এর প্রতি বেশি আগ্রহী হবে, ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হওয়ার সম্ভাবনা তেরি হবে। সর্বোপরি শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য ও উদ্দ্যেশ অর্জন বিঘ্নিত হবে।

 

পেশাগত উন্নয়নের উপাদান বিশ্লেষণঃ শিক্ষকগণের ক্ষেত্রে পেশাগত দক্ষতা হলো জন্মাগত ও অর্জিত গুনাবলির সমষ্টি। অর্থাৎ একজন শিক্ষক জন্মগতভাবে কিছু গুন অর্জন করেন যা সংখ্যায় নগন্য। অবশিষ্ট সব গুন তাকে পেশার প্রয়োজনে বিভিন্ন কার্যাবলির দ্বারা অর্জন করতে হয়। জন্মগতভাবে শিক্ষকের গুনাবলি অর্জন না করেও কেবল পেশার প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রেখা কঠোর পরিশ্রম দ্বারা একজন আদর্শ শিক্ষকে পরিণত হওয়া যায়। শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়ন সাধন করতে হলে তাঁর মধ্যে এমন কিছু গুনের সংযোজন করতে হবে যা দ্বারা শ্রেনিকক্ষে পাঠদানের মানোন্নয়ন ঘটবে।

 

প্রতিদিন অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে একইভাবে শ্রেনিপাঠ পরিচালনা করা কোন আদর্শ শিক্ষকের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এজন্য শিক্ষকগণের পেশাগত উন্নয়ন প্রয়োজন। শিক্ষাবিদগন শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়ন সাধনের জন্য বিভিন্ন দক্ষতার উন্নয়নকে চিহ্নিত করেছেন। এগুলোকেই শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নের উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানে শিক্ষকগনের পেশাগত উন্নয়নের বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করা হল-

 

বিষয়জ্ঞান, পেডাগজি এবং প্রযুক্তির সমন্বয় দক্ষতাঃ বিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষককেই তাঁর পঠিত বিষয় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিদ্যালয় পাঠদান করতে হয়। তাই শিক্ষক হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো বিষয়ভিত্তিকজ্ঞান। তবে সব ভালো ছাত্র সবসময় ভালো শিক্ষক হয় না। এর কারণ বিষয়বস্তু উপস্থাপন দক্ষতার ঘাটতি। উপস্থাপন দক্ষতার অভাবের কারনে বিষয়জ্ঞান সম্পন্ন অনেক ভাল ছাত্রও অনেক সময় শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহনযোগ্যতা অর্জন করতে পারে না।

 

শ্রেনিপাঠদানে শিক্ষককে বিভিন্ন ধরনের কলাকৌশল প্রয়োগ করতে হয়। কারণ একটি শ্রেনিতে বিভিন্ন মেধার শিক্ষার্থী থাকে, শিক্ষার্থীদের আগ্রহের পার্থক্য থাকা, তাদের গ্রহন কৌশলের বিভিন্নতাও থাকে। বিভিন্ন ধরনের বৈচিত্র থাকা সত্বেও একজন শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের নিয়েই সফলভাবে শ্রেণিকার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। ফলে শিক্ষককে তাঁর বিষয়বস্তু সম্পর্কিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণনের মাধ্যমে এমনভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে যেন সকল শিক্ষার্থীর কাছে তা সমানভাবে গৃহীত হওয়ার মাধ্যমে শিখনফল সঠিকভাবে অর্জিত হতে পারে। এর জন্য শিক্ষককে বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি ও কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়। শ্রেনিকার্যাক্রম পরিচালনার এই সব বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও কৌশলগুলোই হলো পেডাগজি।  বিভিন্ন বিষয়ের আলোকে এই পদ্ধতি ও কৌশল বা পেডাগজি বিভিন্ন রকম, যেমন- গনিতের পেডাগজি ও ইংরেজির পেডাগজি এক হবে না। এজন্য প্রত্যেক শিক্ষককে তাঁর বিষয় সংশ্লিষ্ট পেডাগজিতে দক্ষতা অর্জন করতে হয়।

 

বর্তমানে শিক্ষার্থীদের শ্রেনিকক্ষে পাঠের প্রতি আকৃষ্ট করার আরেকটি অন্যতম মাধ্যম হল আইসিটি। শ্রেনিকক্ষে মাল্টিমিডিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে সহজেই বিমুর্ত বিষয়কে মূর্তভাবে উপস্থাপন করা যায়। তবে এর জন্য প্রয়োজন বিষয়জ্ঞান, পেডিগজি ও আইসিটির সমন্বয় সাধনের। এই তিনিটি বিষয় সমন্বয়ের মাধ্যমে একজন শিক্ষক আনন্দদায়ক পরিবেশে কার্যকর শিখন নিশ্চিত করতে পারেন। তাই বিষয়জ্ঞান, পেডাগজী ও আইসিটির সমন্বয় সাধনের দক্ষতা পেশাগত উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ন উপাদান।

 

উপসংহারঃ গুনগত শিক্ষা নিশ্চয়নের সাথে শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়ন জড়িত। প্রাচীন থেকে আধুনিক কাল পযর্ন্ত সবসময়েই সব ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থাতেই শিক্ষকের ভূমিকাকে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বর্তমান আধুনিক মনোবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহন নিশ্চিত করার জন্য সহায়তাকারী হিসেবে মানসম্পন্ন দক্ষ শিক্ষকের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। মানসম্পন্ন শিক্ষকের উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষকের প্রতিনিয়ত পেশাগত উন্নয়নের প্রয়োজন। পেশায় সার্বিক সাফল্য অর্জন ও শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়ন একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়।

 

তথ্য সূত্র বা রেফারেন্স

# পাঠ্য বই ‘শিখন-শেখানো দক্ষতা ও কৌশল (EDBN-1402)

# শিক্ষক বাতায়ন ওয়েবসাইট

# দৈনিক পূর্বাদেশ পত্রিকা (০১/০২/২০২৩)

# bishleshon website

# ACADEMIA website ইত্যাদি

মন্তব্য করুন

ব্লগ