Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৪ নভেম্বর, ২০২৪ ০৮:৩৯ অপরাহ্ণ

মাধ্যমিক পর্যায়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শিখনের বিবেচ্য দিকসমূহ কী কী? যুক্তিসহ ব্যাখ্যা

মাধ্যমিক পর্যায়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শিখনের বিবেচ্য দিকসমূহ কী কী? যুক্তিসহ ব্যাখ্যা


ভুমিকাঃ বাংলা ভাষা মনোভাব প্রকাশের দিক থেকে পৃথিবীতে অনন্য। এ ভাষার করেছে সুদীর্ঘ ইতিহাস এবং ঐতিহ্য। এটি আমাদের মাতৃভাষা। আমার এ ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করি। এটি আমাদের হৃদয়ের একান্ত অনুভতি প্রকাশের প্রাণের ভাষা। এই ভাষা শিক্ষার জন্য সবার আগে প্রয়োজন এর উপাদান সম্পর্কে সম্যক ধারনা। ভাষার ধর্মই বদলে যাওয়া এই বদল ঘটে মানুষের মুখে মুখে। বদলে যাওয়ারও একটি নিয়ম শৃঙ্খলা থাকে। তাই ভাষার শুদ্ধতার প্রয়োজন গড়ে ওঠেছে ভাষার সাংবিধান, বা ব্যাকরণ। ব্যাকারণ ভাষাকে পরিশীলিত করার জন্য আবার মৌখিক ধ্বনি, শব্দ এবং বাক্যের উৎপত্তি, গঠন কৌলা, বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি বিশ্লেষন করে। তাই এ বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা জরুরি।

----------------------------------------------------------------------------------------------

বাংলা ভাষার ধারণা ও বৈশিষ্ট্যঃ মানুষের মনোভাব প্রকাশের সর্বোত্তম মাধ্যম ভাষা। ভাষা ভাবের বাহন। ভাষার প্রধান কাজই হলো একের ভাবনাকে অনেকর কাছে পৌছে দেওয়া। তা যদি না থাকত তাহলে মানুষ পরস্পরের ভাবের আদান প্রদান করতে পারতো না, ফলে পরিবার, গোষ্ঠী এবং সমাজও গড়ে উঠতো না। ভাষার সংজ্ঞায় ভাষাতাত্বিক ড. সনীতিকুমার চট্রোপাধ্যায় বলেন, মনেরভাব প্রকাশের জন্য বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চরিত ধ্বনির দ্বারা নিস্পন্ন, কোনো বিশেষ জনসমাজে ব্যবহৃত, স্বতন্ত্রভাবে অবস্থিত তথ্য বাক্যে প্রযুক্ত, শব্দ সমষ্টিকে ভাষা বলে। ড. মুহম্মদ এনামুল হকের মতে, মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করিবার জন্য কন্ঠ, জিহবা, তালু, ওষ্ঠ, দন্ত, নাসিকা, মুখবিবর প্রভৃতি বাগযন্ত্রের সাহায্যে অপরের বোধগম্য যে ফানি বা ধ্বনিসমষ্টির উচ্চারণ করিয়া থাকে, সেই ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টিকে ভাষা বলা হয়।

উপর্যুক্ত সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষণ করে ভাষার নিম্নরূপ বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়-

০১। ভাষা হবে মনোভাব প্রকাশক, অর্থাৎ পরস্পর তার বিনিময়ের একটি মাধ্যম।

০২। যে কোনো রকমের ধ্বনিই ভাষা নয়, যে ধ্বনি মানুষের বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চরিত, শুধু তা-ই ভাষার মূল উপাদান।

০৩। মানষের বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চরিত ধ্বনিমাত্রই ভাষা নয়, সেই ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টির অর্থ থাকতে হবে।

০৪। পাগলের অর্থহীন ধ্বনি বা শিশুর বা শিশুর অস্ফুট চিৎকার মানুষের বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত ধ্বনি বটে, কিন্তু তাকে ভাষা বলা যায় না। কারণ তা কোনো ভাবে প্রতিষ্ঠত ধ্বনি নয়। মোটকথা অর্থবোধক আওয়াজ ছাড়া ভাষা হয় না।

০৫। ভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য বদলে যাওয়া। প্রবহমান নদী কেল চলতে চলতে নতুন নতুন বাঁকে নতুন নাম ধারণ করে, ভালার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। একটি শব্দের উচ্চরণ, অর্থ পরিবর্তন হতে হতে রূপ ধারণ করে।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------

মাধ্যমিক পর্যায়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শিখনের বিবেচ্য দিকসমুহ :

ভাষার অর্নিহিত শৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যাকরণাঃ ব্যাকরণ = (বি+আ+কৃ+অন) শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বিশেষভাবে বিশ্লেষণ। ব্যুৎপনিগত অর্থ অনুযায়ী বলা যায়, যে শাস্ত্রে কোনো ভাষার বিভিন্ন উপাদানের প্রকৃতি ও রূপের বিচার-বিশ্লেষণ করা হয় এবং বিভিন্ন উপাদানের সম্পর্ক নির্ণয় ও প্রয়োগবিধি বিশদভাবে আলোচিত হয়, তাকে ব্যাকারণ বলে। যে শাস্ত্রে বাংলা ভাষার বিভিন্ন উপাদানের গঠনপ্রকৃতি ও স্বরূপ বিশ্লেষণ করা হয় এবং এদের সম্পর্কও সুষ্ঠ প্রয়োগবিধি আলোচনা করা হয়, তাই বাংলা ব্যাকরণ। প্রত্যেক ভাষার ধ্বনি, শব্দ বাক্য অর্থ এই চারটি মৌলিক অংশ থাকে। সে অনুযায়ী প্রত্যেক ভাষার ব্যাকটে প্রধানত চারটি বিষয়ের আলোচনা করা হয়। এগুলো হলো-ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব বা শব্দতত্ত্ব প্রকৃতি ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয়।

---------------------------------------------------------------------------------------------------

বাক্যতত্ত্বঃ মানুষের বাপ্রত্যঙ্গজাত জনির সমন্বয় গঠিত শব্দসহযোগ সৃষ্ট অর্থবোধক বাকপ্রবাহের বিশেষ বিশেষ অংশকে বলা হয় বাক্য। বাক্যের সঠিক গঠনপ্রণালি, বিভিন্ন উপাদানের সংযোজন বিয়োজন, এদের সার্থক ব্যবহারযোগ্যতা, বাক্য মধ্যে শব্দ বা পদের স্থান বা ক্রম, পদের রূপ পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয় বাক্যতত্ত্বে আলোচিত হয়। বাক্যের মধ্যে কোন পদের পর কোন পদ বসে কোন পদের স্থান কোথায়, বাক্যতত্ত্বে এসবের পূর্ন বিশ্লেষন থাকে। বাক্যতত্ত্বকে এজন্য পদক্রমও বলা হয়। কতকগুলো পদের সমষ্টিতে বাক্য গঠিত হলেও যে কোনো পদসমষ্টিও বাক্য নয়। বাক্যের বিভিন্ন পদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক থাকা আবশ্যক। এছাড়াও বাক্যের অন্তর্গত বিভিন্ন পদ দ্বারা মিলিতভাবে একটি অখন্ড ভাব পূর্নরূপে প্রকাশিত হওয়া প্রয়োজন, তবেই তা বাক্য হবে।

----------------------------------------------------------------------------------------------------

উচ্চারণরীতিঃ উচ্চারণরীতি বলতে সাধারণত উচ্চারনের নিয়মকানুন বোঝায়। সব ভাষারই কিছু নিয়মকানুন আছে, সে লেখার বেলায় যেমন, তেমন উচ্চরণের ক্ষেত্রেও। বাংলা ভাষাও এর ব্যতিক্রম নয়। শুদ্ধ করে লেখার জন্য ও শুদ্ধ উচ্চারনের জন্য সেসব নিয়মকানুন বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। আবার ভাষা ক্রমাগত পরিবর্তনশীল, সেই পরিবর্তনের কথাও মনে রাখা উচিত। আজ থেকে প্রায় দেড়শ’ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ বাংলা উচ্চরণের নিয়মরীতি নিয়ে ভেবেছিলেন। তখন তিনি ছিলেন যুবক। এক বিদেশি রবীন্দ্রনাথের কাছে বাংলা ভাষা শিখতে এসেছিলেন। তাঁকে শেখাতে গিয়েই বাংলা উচ্চারণের ক্ষেত্রে প্রচুর বিশৃঙ্খলার প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় রবীন্দ্রনাথের। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ভেবেছিলেন, বাংলা ভাষার এই রূপ উচ্চরণের বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটা নিয়ম আছে কিনা’। নিয়ম তো অবশ্যই আছে। প্রমিত উচ্চারণের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ মৌলিক নির্দেশনা তো দিয়েছেনই, প্রমিত উচ্চারণ শেখার জন্য ‘সহজ পাঠ’ নামে চার খন্ডের শিশুসাহিত্যও রচনা করেছেন।

-------------------------------------------------------------------------------------------------

সংবৃত ও বিবৃতরীতিঃ সংস্কৃত শব্দের অর্থ আবৃত বা আচ্ছাদিত। ব্যাকরণের ভাষায় বলা যেতে পারে অপরিবর্তিত রূপ। আর্থাৎ যে সব ধ্বনি উচ্চারণের সময় মুখবিবর সংকুচিত থাকে সেগুলোর উচ্চারণরীতিকে সংস্কৃতরীতি বলা যায়। অপরদিকে বিবৃত অর্থ প্রসারিত, উন্মুক্ত, খেলা ইত্যাদি। বাংলা ভাষায় এমন কতকগুলো স্বর রয়েছে যেগুলো আমরা উচ্চারণের সময় মুখবিবর খুরৈ উচ্চারণ করি। সেগুলোর উচ্চারণরীতিকে বিবৃতরীতি বলা যায়। সংবৃত এবং বিবৃত উচ্চারণ ঘটে মূলত স্বরধ্বনির ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ‘অ’, ‘এ’ এবং ‘এ্যা/অ্যা’-র ক্ষেত্রে। আবার ‘অ’, ‘এ’ ধ্বনি উচ্চারণে যেরকম বিবিধ পরিবর্তন (কখনও অর্ধসংবৃত কখনও অর্ধবিবৃত) হয় তেমনটি আর কোনো ধ্বনির বেলায় ঘটে না।

-----------------------------------------------------------------------------------------------

বাংলা ভাষারীতিঃ পৃথিবীর বহু উন্নত ভাষার মতো বাংলা ভাষাতেও দু ধরনের ভাষারীতি বিদ্যমান। এই রীতি বিভিন্ন রূপ ও প্রকাশভঙ্গির মধ্যে দিয়ে ফুটে ওঠে। এর একটি চলিতরীতি এবং অন্যটি সাধুরীতি। এই চলিত ও সাধুরীতি উভয়ই কথ্য বা মৌখিক এবং লিখিত রূপে ব্যবহৃত হতে পারে। মূলত সাহিত্যিক গদ্যের সুচনাপর্ব থেকেই বাংলা গদ্য সাহিত্যে ‘সাধু’ ও ‘চলিত’ এ দুটি রীতির প্রচলন হয়। রামমোহন ও বিদ্যাসাগর ’সাধু গদ্যের’ পাশাপাশি প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘চলিত গদ্যে’ প্রবর্তনই এ দু রীতির ভাষারূপের সুত্রপাত ঘটায়।

সাধুরীতিঃ উনিশ শতক বাংলা ভাষার যে লিখিত রূপ গড়ে ওঠে, তার নাম দেওয়া হয় ’সাধু ভাষা’। রাজা রামমোহন রায় প্রথম সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিতগণের মূখের ভাষাকে ‘সাধুভাষা’ বলে অভিহিত করেন।

---------------------------------------------------------------------------------------------------

পরে রামমোহন, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখ গদ্যশিল্পীগণ এই সাধু ভাষার মাধ্যমেই তাঁদের সাহিত্যকীর্তি প্রতিষ্ঠত করেছেন। প্রখ্যাত বৈয়াকরণ ও ভাষাতত্ত্ববিদ ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাব্যায়ের মতে, সাধারণ গদ্য-সাহিত্যে ব্যবহৃত বাঙ্গালা ভাষাকে সাধুভাষা বলে।

চলিতরীতিঃ উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের প্রথমেই চলিত ভাষার প্রচলন শুরু হয় বাংলা সাহিত্য। সংস্কৃতবহুল সাধু ভাষার বহুল প্রচলনের ফলে বাংলা গদ্য নিছক পন্ডিতি গদ্যে রূপান্তরিত হয়ে পড়ে এবং তার ফলে এর গতিশক্তি শিথিল ও মন্থর হতে থাকে। তাই সে যুগের কোনো কোনো গদ্যশিলী প্রচলিত পন্ডিতি গদ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে আপামর জনসাধারণের কথ্যভাষার ঢঙে বাংলা গদ্যরচনার ব্রতী হন।

--------------------------------------------------------------------------------------------------

উপসংহারঃ সাহিত্য শিল্পময় বলেই এর প্রকাশ ঘটে বিভিন্ন ধারা ও বিভিন্ন আঙ্গিকে। কোনো নির্দিষ্ট কাঠামোয় সব মানুষ হৃদয়ানুভুতি প্রকাশ করতে পারেনা। ব্যক্তি বিশেষের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে এর অঙ্গ-সৌষ্ঠর। বাংলা সাহিত্যর আদিকাল থেকে বর্তমান সাহিত্যের ধারা ও আঙ্গিকে ঘটেছে নানান পরিবর্তন। সাহিত্যর আদি ও মধ্যযুগের ভাবাবেগ এবং উচ্ছ্বাসের পরিবর্তে আধুনিক যুগে আবির্ভুত হয়েছে সৃজনশীল গদ্য সাহিত্য। গদ্য সাহিত্য ধারায় ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ‍ইত্যাদি মানুষের হৃদয়ে আসন করে নিয়েছে। তাই এ বিষয়গুলোও আয়ত্তে রাখা জরুরি।

তথ্য সূত্র বা রেফারেন্স

# পাঠ্য বই ‘বাংলা শিখন (EDBN-1411)

# শিক্ষক বাতায়ন ওয়েবসাইট

# উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাই

# bishleshon website।

# ACADEMIA website ইত্যাদি।

মন্তব্য করুন

ব্লগ