সহকারী শিক্ষক
১৪ নভেম্বর, ২০২৪ ০৮:৪২ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
শ্রেণিকক্ষে উপন্যাস শিখন শেখানোর পদ্ধতি ও কৌশল
ভুমিকাঃ উপন্যাস হলো সাহিত্যের একটি আধুনিকতম শিল্প শাখা। ইউরোপে শিল্প বিকাশের পর যখন ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের বিকাশ ঘটে তখন আধুনিক একটি মাধ্যম হিসেবে উপন্যাসের সৃষ্টি। উপন্যাসের পূর্ব-পুরুষ ছিল মাহাকাব্য। উপন্যাস মূলত গদ্যে রচিত হয়। এটি একটি বর্ণনাত্মক শিল্পকর্ম। বর্তমান সময়ে উপন্যাস সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পশাখা। উপন্যাস হল আধুনিক কালের এক শক্তিশালী সাহিত্য মাধ্যম। উনিশ শতকে সাহিত্যের মাধ্যম হিসেবে গদ্যরীতি বিকাশের পর থেকে এর আবির্ভাব উপন্যাসের আবির্ভাবের প্রায় একশ বছরের মধ্যেই এই শাখাটি বিশেষ সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে।
উপন্যাসঃ উপন্যাস গড়ে ওঠে ঔপন্যাসিকের জীবনদর্শন ও জীবনানুভূতিকে কেন্দ্র করে। ঔপন্যাসিক উপন্যাসে মানুষ, মানুষের জীবন সম্পর্কে তার বীক্ষা উপন্যাসে তুলে ধরেন। এজন্য তিনি নিদৃষ্ট সময়, সমাজ প্রেক্ষিতে একটি কাহিনী কাঠামোর আশ্রায় গ্রহণ করে চরিত্র সৃজন করেন। উপন্যাসে সে কাহিনী ও চরিত্র শেষ পর্যন্ত একটি পরিণতি লাভ করে যারা মাধ্যমে লেখকের জীবন দর্শন প্রতিফলিত হয়। এ জন্য উপন্যাসের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে গিয়ে সাহিত্যতাত্ত্বিক শ্রীশচন্দ্র দাশ বলেছেন ”গ্রন্থাকারের জীবন দর্শন ও জীবনানুভতি কোন বাস্তব কাহিনী অবলম্বনে যে বর্ণনাত্মক শিল্পকর্মে রুপায়িত হয়, তাকে উপন্যাস বলে”।
বাংলা উপন্যাসের বিখ্যাত ইতিহাসকার শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন – “গল্প বলিবার একটি বিশেষ ভঙ্গিকে গল্পের মধ্যে দিয়ে মানুষের প্রকৃত ছবি আঁকিবার চেষ্টা, ঘটনা সংঘাতে তার চরিত্র স্ফুরণের উদযোগ, সামাজিক মানুষের মধ্যে যে অহরহ একটা আকর্ষণ বিকর্ষণের দ্বন্দ্ব চলিতেছে, তাহাই সূক্ষ্ম আলোচনা ও দ্বন্দ্ব সংঘাতের মধ্যদিয়ে মানুষের জীবন সম্বন্ধে একটি বৃহত্তর ব্যাপকতর সত্যকে ফুটাইয়া তোলা ইহাকেই উপন্যাস বলা যেতে পারে”।
উপন্যাসের বৈশিষ্ট্যঃ উপন্যাসের স্থির, সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করা কঠিন। কেননা উপন্যাস হরেক রকমের হতে পারে। যেমন- বস্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ যে বৈশিষ্ট্যসমুহ নিয়ে লেখা হয়েছে রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য তা থেকে আলাদা তবুও কিছু কিছু বৈশিষ্ট্যকে উপন্যাসের সাধারণ বৈশিষ্ট্য বলে চিহ্নিত করা যায়। যেমন -
(ক) মানুষ ও মানুষের জীবন সম্পর্কে ঔপন্যাসিকের, দার্শনিকের বোধকে কেন্দ্র করে উপন্যাস গড়ে ওঠে।
(খ) উপন্যাস একটি নির্দিষ্ট সময় ও সমাজকে উপজীব্য করে গড়ে ওঠে।
(গ) উপন্যাসে একটি কাহিনী থাকে।
(ঘ) উপন্যাসের কাহিনীটি সাধারণত আদি-মধ্য-অস্ত ক্রম অনুসারে বিন্যাস্ত থাকে।
(ঙ) উপন্যাসে চরিত্র থাকে। চরিত্রগুলো পরস্পর দ্বন্দ্ব সংঘাতের ভেদর দিয়ে বিকাশ লাভ করে।
(চ) ঘটনা থেকে চরিত্র আবার চরিত্র থেকে ঘটনার সৃষ্টি ও বিকাশ থাকে।
(ছ) চরিত্র বিকাশে ঘটনার পারস্পর্য রক্ষিত হবে।
(জ) উপন্যাসে বর্ণনায় চরিত্র বা লেখকের দৃষ্টিকোণ (Point of view) প্রতিফলিত হবে।
(ঝ) কোন ঘটনা বা পরিস্থিতি বর্ণনায় লেখকের পরিচর্যা (Treatmint) থাকবে।
(ঞ) উপন্যাস প্রধানত গদ্যে রচিত হবে।
(ট) উপন্যাসে জীবনের খন্ডাংশ নং সমগ্র জীবন রূপ লাভ করবে।
বাংলা উপন্যাসঃ বাংলার লোকগাঁথা, আখ্যান, কাহিনীকাব্য থাকলেও উপন্যাস ছিল না। বাংলা সাহিত্য উপন্যাস এসেছে মূলত ইংরেজী সাহিত্য থেকে। প্রথম বাংলা সার্থক উপন্যাস বঞ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ (১৮৫৬)। কিন্তু তার আগেও উপন্যাস রচনার প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছিল। খ্রিষ্টান মিশনারী হ্যানী ক্যাথরিন ম্যালেন্স উপন্যাসের আদলে ‘ফুলমনি ও করুনার বিবরণ’ (১৮৫২) গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। খ্রিষ্ট ধর্মের মহাত্ব প্রচার এ গ্রন্থের লক্ষ্য ছিল। উপন্যাসের কিছু উপাদান এতে থাকলেও সার্থক উপন্যাস এটি ছিল না।
ঊনিশ শতকের নব্যধনি বাঙালি বাবুদের কীর্তি কারখানা নিয়ে সে সময় নকশ্য জাতীয় রচনার চল চালূ হয়েছিল। এ ধারায় নকশা জাতীয় রচনা হচ্ছে প্যারিচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দূলাল’ (১৮৫৮), কালী প্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ (১৮৬২) এগুলোতে উপন্যাসের কিছু বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হলেও সার্থক বাংলা উপন্যাস রচিত হয় বঞ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতে। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসমুহের মধ্যে রয়েছে ‘কপালকুন্ডুলা’ (১৮৬৫), ‘বিষবৃক্ষ’ (১৮৭৩) ‘চন্দ্র শেখর’ (১৯৭৫), ‘কৃষ্ণকান্ডের উইল’ (১৮৭৮), ‘রাজসিংহ’ (১৮৮১), ’আনন্দমঠ’ (১৮৮২) ইত্যাদি।
পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখনি প্রতিভার মাধ্যমেই বাংলা উপন্যাস বহুবিচিত্র ফলবান হয়ে ওঠে। তাঁর রচিত উপন্যাসসমূহের মধ্যে আছে ‘বউ ঠাকুরাণীর হাট’ (১৮৮৩), রাজর্ষি (১৮৮৭), ‘চোখের বালি’ (১৯০৩), ‘নৌকাডুবি’ (১৯০৬), ‘গোরা’ (১৯০৯), ‘ঘরে বাইরে’ (১৯১৬), ‘চতুরঙ্গ’ (১৯১৬), ‘যোগাযোগ’ (১৯২৯), ‘শেষের কবিতা’ (১৯২৯), ‘দুইবোন’ (১৯৩৩), ’মালঞ্চ’ (১৯৩৩) ও ‘চার অধ্যায়’ (১৯৩৪)।
বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য বিখ্যাত ঔপন্যাসিকের মধ্যে আছে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, সৈয়দ শামসুল হক, সেলিনা হোসেন প্রমুখ।
শ্রেনিকক্ষে উপন্যাস শিখন শেখানোর পদ্ধতি ও কৌশলঃ উপন্যাস যেহেতু সাধারণ দীর্ঘ রচনা হয়ে থাকে সেহেতু এর পাঠদানে ভিন্ন পদ্ধতি ও কৌশলের আশ্রায় গ্রহণ করতে হবে। উপন্যাস পাঠদানের জন্য শুধুমাত্র শেণীকক্ষে ব্যবহার করলে হবে না এজন্য বাড়িতে পাঠেরও সাহয্য নিতে হবে। এ দুয়ের সমন্বয়ে পাঠদান সম্পন্ন করতে হবে। উপন্যাস পাঠদানে যে পদ্ধতি ও কৌশলগুলোর আশ্রায় নেয়া যেতে পারে তার মধ্যে রয়েছে-
০১. সামগ্রিক পঠনঃ প্রতিটি উপন্যাসের মধ্যে বাস্তব সমাজচিত্র অংকনন করার প্রবণতা থাকে। অর্থাৎ উপন্যাসে সমগ্ররূপটি বিধৃত হয় এবং জীবনের বৈশিষ্ট্যগুলি ঘটনার সাহায্যে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে।
০২. শ্রেণীতে পর্যায়ক্রমিক গঠনঃ শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের দিয়ে পর্যায়ক্রমে সমগ্র উপন্যাসটির পাঠ শেষ করা যেতে পারে।
০৩. কাহিনী বর্ণনাঃ নির্বাচিত উপন্যাসের কাহিনী সংক্ষেপে শিক্ষক শ্রেনিকক্ষে নিজের ভাষায় মাধুর্য মন্ডিত করে বর্ণনা করবেন।
০৪. চরিত্র বিশ্লেষণঃ সমগ্র উপন্যাসের পাঠ শেষ হলে প্রথমে প্রধান চরিত্রগুলোর বিচার-বিশ্লেষণে চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলো নিরূপণ করা যেতে পারে।
০৫. সংকেত লিখনঃ উপন্যাসের পঠিতব্য জটিল অথবা গুরুত্বপূর্ন অংশগুলো শিক্ষক সংকেতের আকার বোর্ড লিখে দিবেন।
০৬. পাঠ আলোচনাঃ উপন্যাস পাঠদানকে কার্যকরী করার অন্যতম প্রধান উপায় হলে। নির্ধারিত পাঠের সম্মিলিত আলোচনা।
০৭. শীর্ষভাগ করণঃ পাঠদানকে সফল ও সার্থক করে তোলার জন্য শিক্ষক পূর্ব হতেই সম্পূর্ন উপন্যাসটিকে প্রধান প্রধান কয়েকটি নির্দিষ্ট অংশে ভাগ করে নেবেন এবং নির্দিষ্ট অংশটি নির্ধারিত পিরিয়ডে পড়িয়ে শেষ করবেন। এছাড়াও, চরিত্র ও চরিত্রায়ন পদ্ধতি বিশ্লেষণ, দৃষ্টিকোন ও পরিচর্যা রীতি বিশ্লেষণ, ভাষার ব্যবহার ব্যাখ্যা, সামগ্রিক আলোচনা তথা ওপন্যাসিকের জীবনদর্শন ব্যাখ্যা, লেখার কাজ, সংক্ষিপ্ত বর্ননা, সার্বিক আলোচনা ও পাঠের পরবর্তী অংশের দিক নির্দেশনার মাধ্যমে শিখন শেখানো কার্যাবলি অগ্রসর হওয়া যেতে পারে।
উপসংহারঃ উপন্যাস আধুনিককালের একটি শক্তিশালী সাহিত্য মাধ্যম। শিশুকালের রূপকথায় গল্পের প্রতি আগ্রহই পরবর্তীকালে গল্প, উপন্যাস পাঠে মানুষকে আগ্রহী করে তোলে। জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখায়। উনিশ শতকে সাহিত্যের মাধ্যম হিসাবে গদ্যরীতি বিকাশের পর থেকেই এর আবির্ভাব। গদ্য ও পদ্য উভয় প্রকারে এটি লিখিত হতে পারে। তবে গদ্যই এর উৎকৃষ্ট বাহন। উপন্যাস সাধারণত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে পড়ানো হয়। শেণিকক্ষে যে কোন বিষয় পাঠ দানের ক্ষেত্রে শিক্ষককে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হয়। তাই উপন্যাস পাঠদানকে সরস ও আকর্ষনীয় করে তুলতে আধুনিক ও মনোবিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। আর এতে করে উপন্যাস সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা পাঠ গ্রহণে আগ্রহী হবে। পাঠদান প্রক্রিয়া ফলপ্রসু হবে।
তথ্য সূত্র বা রেফারেন্স
# পাঠ্য বই ‘বাংলা শিখন (EDBN-1411)
# শিক্ষক বাতায়ন ওয়েবসাইট
# উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাই
# bishleshon website।
# ACADEMIA website ইত্যাদি।
৩
৫ মন্তব্য