সহকারী শিক্ষক
১৮ নভেম্বর, ২০২৪ ০৬:৪৪ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা বাংলা নামের মানচিত্রে আধুনিক যুগের অবদান। ইংরেজ আর উপনিবেশবাদী রাজনীতির সঙ্গেই তৈরী হয় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা । এই সাম্প্রদায়িকতা স্হান পায় হিন্দু বর্ণবাদের সমান্তরালে। এই দুই অপশক্তি হাত ধরাধরি করে বাঙালির সমাজ জীবনে আঁছডে পড়ে। পরিণতিতে বাংলার আধুনিক মানচিত্রের পাতা দ্বিখন্ডত হয়। অথচ এই উপমহাদেশে ধর্মীয় সম্প্রতি ও সমন্বয়ের অজস্র উদাহরণ আছে , যেখানে হিন্দু-মুসলিম কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে গলাগলি করে, জীবন নির্বাহ করেছিলেন।এই উপমহাদেশে ধর্মীয় সম্প্রীতির এক জ্বলন্ত উদাহরণ ছিল কাশ্মীর।যা ভারত ভাগের পরে আর নেই। ভারতের কাশ্মীরের শ্রীনগরে সুফী সাধক নূরউদ্দিন ওয়ালীর ( ১৩৭৭-১৪৪০) মাজার আছে। হিন্দু -মুসলিম নির্বিশেষে কাশ্মীরে সকলের ধর্মীয় গুরু ছিল এই নূর উদ্দিন ওয়ালী । ১৯৯৫ সালে জঙ্গী মৌলবাদীরা এই মাজার ধ্বংস করে দিয়েছিল। কথিত আছে নূরউদ্দিনের ধর্ম মা ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসিনী , যার নাম ‘লালেশ্বরী’। শৈশবে নূরউদ্দিন তাঁর এই ধর্ম-মায়ের স্তনপান করেছিলেন। হিন্দুরা শেখ নূরউদ্দিন ওয়ালীকে ডাকে ‘নুন্দ ঋষি’ বলে, মুসলিমরা ‘লালেশ্বরী ‘ কে ডাকে লাল্লাদেদ। মৃত্যুর আগে ‘ নূরউদ্দিন ওযালী তাঁর মুসলমান ভক্তদের বলেছিলেন, তাঁর হিন্দু মায়ের দুধের ঋণ শোধ করবার জন্য। সেই থেকে কাশ্মীরের মুসলমানরা গরুর মাংস খায় না, গরু হিন্দুদের আরাধ্য হওয়ার কারণে।
কাশ্মীরে এখন আর কোনও হিন্দু নেই, সবাইকে তাডিয়ে দেয়া হয়েছে জম্মু এবং ভারতের বিভিন্ন অঙ্চলে । কিন্তু সুফী সাধক নূরউদ্দিনের শিক্ষা ভোলেনি স্হানীয় মুসলমানরা।কাশ্মীরে এত যে জঙ্গী মৌলবাদী সন্ত্রাস এখনও শ্রীনগরের সকল রেস্তোরাঁর ভেতরে লেখা আছে ‘ নো বিফ’।অন্যদিকে হিন্দু মৌলবাদীদের দৌরত্ন্যে সারা ভারত জুড়ে এখন গরু খাওয়া না খাওয়া নিয়ে মাতম চলছে। ছোট বেলায় অবধূতের “ মরুতীর্থ হিংলাজ” বইটি পড়ে ভ্রমণ কাহীনি সম্পর্কে মুগ্ধ হয়েছিলাম কারণ ঐ ভ্রমণ কাহীনির যাত্রা পথের প্রতিটি ব্যাখ্যায় ছিল দুর্গমতার গল্প । এই বইটি সম্পর্কে সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছিলেন, “ অবধূত যদি তাঁর কল্পনা, তাঁর সৃজনী শক্তি, তাঁর স্পর্শকাতরতা মরুতীর্থের পাতায় পাতায় ঢেলে না দিয়ে থাকতেন তবে পুস্তক টি হতো গাইডবুক” । যারা অবধূতের “ মরুতীর্থ হিংলাজ” পড়েছেন তারা জানেন, পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের বিখ্যাত সুফী সাধক ‘ শাহ আবদুল লতিফের’ কথা এবং তাঁর মাজারের কথা। যে কোনো টুইরিষ্ট এই মাজার ভ্রমন করতে গেলে ঐ মাজারের খাদেম বলেন ,সুফী বাবার নির্দেশ হচ্ছে এখানে আসার আগে ভক্তরা যেন হিংলাজ মায়ের মন্দির দর্শন করেন’। কথা হচ্ছে সুফী সাধক আবদুল লতিফের মাজার ভ্রমণের সাথে হিংলাজ মায়ের মন্দির দর্শনের সম্পর্ক কী ? তাহলে বলি সম্পর্কটা কি? :-“হিংলাজ মন্দির হলো অনেক অনেক বছরের পুরানো মন্দির। কথিত আছে ও বহু কিংবদন্তী আছে, যার কোনো কোনোটি রূপকথাকেও হার মানায়। হিন্দুরা হিংলাজ মন্দিরে যান ৫১ পীঠ স্হানের অন্যতম পীঠ স্হান হিসেবে,তাদের বিশ্বাস সতীর মস্তক এখানে পড়েছিল। হিন্দু ধর্ম বিশ্বের প্রচীনতম ধর্ম হলেও এর ইতিহাস ছয়/সাত হাজার বছরের বেশি নয়। হিংলাজ মন্দিরের ভক্তরা দাবী করে থাকেন এই মন্দির নাকি এক লাখ বছরের পুরানো।যাক আসলে এগুলো হলো বিশ্বাস, যেভাবে বিশ্বাসের উপর ধর্ম দাঁড়িয়ে আছে সেরকম।
হিংলাজ মন্দিরের প্রাচীনত্ব নিয়ে সন্দেহের কোনো কারণ নেই ।মন্দির মানে বিশাল পর্বতমালার ভিতরে একটা বড় গুহা, আরাধ্য দেবীও মানুষ নির্মিত মূর্তি নয়, দুই খন্ড পাথর মাত্র , যদিও পাশে দশভূজা দুর্গা এবং আরেকটু দূরে চতুর্ভূজা কালী প্রতিমা আছে সতীর প্রতীক হিসেবে । যে দুটি প্রতিমা মানুষের দ্বারা তৈরী,যেমনটি থাকে অন্য সব মন্দিরে।এখানকার পূজারী এবং দর্শনীর্থীদের মতে কথিত আছে এবং জনশ্রুত আছে তরুণ আবদুল লতিফ তাঁর পথ অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে এই মন্দিরে এসেছিলেন।মন্দিরের আশেপাশে তখন গোয়ালঘর থাকত, দেবীকে ভক্তরা বাটিতে করে দুধ পান করতে নিবেদন করত। লতিফ শায়িত দেবীর পাশে বসে বললেন,মা তুমি শুয়ে আছ কেন,ভক্তরা তোমার জন্য দুধ এনেছে,তুমি দুধ পান কর। ভক্ত লতিফের কথায়,
দেবী মানবরূপ ধারণ করে উঠে বসলেন, দুধ পান করলেন। বললেন, তুমি আমার কাছে কেন এসেছ ?
লতিফ বললেন, মা, তুমি জান আমি কেন এসেছি। বল, আমি কোথা থেকে শুরু করব।
দেবী বললেন, আমার মন্দিরের নিচে একটি সুড়ঙ্গ রয়েছে।এই সুড়ঙ্গ যেখানে শেষ হয়েছে সেটি তোমার গন্তব্য । সুড়ঙ্গটা একশ মাইল দীর্ঘ, শেষ হয়েছে সিন্ধু প্রদেশের থাট্টায়।শাহ আবদুল লতিফ থাট্টা থেকে ইসলাম প্রচার আরম্ভ করেছিলেন।শাহ আবদুল লতিফের মাজার সিন্ধু প্রদেশের ভিটশা জেলা, থাট্টা থেকে অনেক দূরে।থাট্টার অধিবাসীরা দাবি করে তাদের জনসংখ্যার চেয়ে সুফীদের মাজারের সংখ্যা বেশি, যে কারণে থাট্টাকে বলা হয় মৃতের শহর। শাহ আবদুল লতিফের কাব্যপ্রতিভা সিন্ধুর সীমানা অতিক্রম করে বহু দূর বিস্তৃত হয়েছিল। তিনি হিংলাজ বা হিঙ্গোলা দেবীকে মা ডেকেছিলেন। তাঁর মুসলিম ভক্তরা দেবীকে ‘নানীমাতা’ নামে সম্বোধন করেন”।
বেলুচিস্তান ও সিন্ধু প্রদেশে শাহ আবদুল লতিফের ভক্তরা মনে করেন, তাদের জন্য দুটা হজ ফরজ। একটি মক্কায় , অপরটি হিংলাজে। যারা মক্কায় যেতে পারেন না, তারা ‘নানীমাতার হজ ‘ পালন করেন ।
হিংলাজ মন্দিরে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে ভক্তরা আসেন। দেবীর প্রসাদ হচ্ছে দুধ আর নারকেল। মৌলবাদের সদর দূর্গ পাকিস্তানের প্রত্যন্ত অঙ্চলের বিভিন্ন গ্রামে সুফীদের মানবপ্রেমের যে সব নিদর্শন দেখা যায়, ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের দেশটিকেও সুফী সাধকদের ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতেই হবে।
১৭
২৭ মন্তব্য