Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৮ নভেম্বর, ২০২৪ ০৬:৪৯ অপরাহ্ণ

# ব্যর্থ প্রেমিকার সূর্যের স্পর্শে ঝরে পড়া শরৎকালের শিউলি ।

শরতের শিউলিফুল ও নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা কার না ভালো লাগে। ঋতুর রাণী শরৎ আমার খুব প্রিয় ঋতু। কাশফুল, ঝিলেবিলে শাপলা-শালুক, শিউলির সুবাস, নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা -এসবই শরতের শ্রেষ্ট আর্কষণ । এখন আশ্বিন মাস, অথচ তালপাকা ভ্যাপসা গরম দাপট দেখিয়ে চলছে । উওুরে বাতাসের দেখা মেলেনি । এর মধ্যেও নদীর ধারে সফেদ কাশফুলের দোল দুলুনি জলাশয়ে শাপলা-শালুকের সমারোহ প্রকৃতি প্রেমীদের ঘর থেকে বাইরে নিয়ে আসছে। অনেকে আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাশফুলের ছবি দিচ্ছেন। করোনা-মাস্ক ছাপিয়ে শিউলি ফুলের গন্ধ মধ্যবিত্ত শৌখিন নাগরিকদের ব্যাকুল করছে। শিউলি ফুলের অবশ্য আলাদা একটা আকর্ষণ আছে। শিউলি ফুলের আরেক নাম শেফালি । শিউলি বা শেফালি আমার প্রিয় ফুলের মধ্যে একটি । শরতের শিউলি আমার অসম্ভব ভাললাগার একটি ফুল। দিনের আলোর স্পর্শে এই কমলা-সাদা ফুলটি তার নিজস্বতা হারায়।সূর্য ওঠার আগেই গাছ থেকে খসে পড়ে মাটিতে । টিপটাপ , গালিচার মতো বিছিয়ে থাকে শিশির-ভেজা কমলা-সাদা বৈভব। এই ফুলেরও একটা মন কেমন করা ব্যথা আছে। একে নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক লোককাহিনী। 

এক লোককাহিনী মতে,নাগরাজের অপরূপা লাবণ্যময়ী কন্যা পারিজাতিকা সূর্যের প্রেমে পড়েন।কিন্তু সে পবিত্র প্রেম দিনমণির নজরে পড়ে না। শেষে দিনমণি সূর্যকে না পেয়ে পারিজাতিকা আত্নহনন করেন। তার দেহের ভস্ম পারিজাত ফুল রূপে স্বর্গে ফুটে ওঠে।সূর্যের স্পর্শমাত্রই সে নীরব ব্যর্থ প্রেমিকার মতো ঝরে পড়ে মাটিতে। এই পারিজাত হলো স্বর্গের শ্রেষ্ঠ কুসুম । পারিজাত শিউলিরই আরেক নাম । 

পুষ্পপুরাণে রয়েছে অন্য আরেক গল্প । শ্রীকৃষ্ণের দুই পত্নী সত্যভামা ও রুক্নিনীর মনে খুব দ্বন্দ্ব যে,কৃষ্ণ কাকে বেশি ভালোবাসেন। কৃষ্ণ উদাসীন থাকেন এ প্রশ্নে। শেষে একদিন তারা আবদার করেন, পারিজাত ফুল যদি কৃষ্ণ এনে দিতে পারেন স্বর্গ থেকে, তাহলেই বোঝা যাবে কৃষ্ণের পত্নীপ্রেমের গাঢ়তা । কৃষ্ণ স্বর্গ থেকে চুপিচুপি পারিজাত বৃক্ষ চুরি করে আনেন। সত্যভামা সকালে ঘুম ভেঙে দেখেন তার প্রাসাদে একটি অপূর্ব পারিজাত বৃক্ষ এবং সেই ফুলের গুচ্ছ বিছিয়ে রয়েছে রুক্নিনীর প্রাসাদকোণে। এদিকে স্বর্গের ফুল পারিজাত চুরির অপরাধে দেবরাজ ইন্দ্র   অভিশাপ দেন, পারিজাত কেবল রাতেই ফুটবে, দিনে ঝরে যাবে। সে ফুলের ফল হবে না কখনো। দিনে না ফুটুক, শিউলি-শেফালি-পারিজাত যে নামেই ডাকা হোক না কেন , আমরা এই ফুলকে অনেক ভালোবাসি। শরৎ ঋতুর শ্রেষ্ঠ ফুল সে। শিউলি/শেফালী/ পারিজাত না ফুটলে শরতের শুভ্রতা যেন অপূর্ণই থেকে যায়। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মুগ্ধ হয়েছিলেন শরতের এই শিউলি বা শেফালি বা পারিজাতের রূপে। লিখেছিলেন:-“ শিউলি ফুল, শিউলি ফুল, কেমন ভুল, এমন ভুল/ রাতের বায় কোন মায়ায় নিল হায় বনছায়ায়/ ভোরবেলায় বারে বারেই ফিরিবারে হলি ব্যাকুল/কেন রে তুই উন্মনা”। কবি কাজী নজরুল ইসলামও শিউলির রূপে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন:-“ শিউলি  ফুলের মালা দোলে শারদ-রাতের বুকে ওই / এমন রাতে একলা জাগি সঙ্গে জাগার সাথী কই.........।” শিউলি ফুলের কেবল সুবাসই নয়, শিউলি গাছেরও রয়েছে অনেক ঔষধি গুণ। ভেষজ বিশেষজ্ঞদের মতে,এর পাতা স্বাদে তেতো।এজন্য পাতার রস কৃমি নাশক হিসেবে কাজ করে। ঠান্ডা ও কাশির জন্যও এ পাতার রস উপকারী। শিউলির পাতায় রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান । এদুটি উপাদান রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধে সাহায্য করে। এ ছাড়া মাথার খুশকি দূর করতেও শিউলি বীজের তেল বেশ উপকারী। যা হোক, শিউলি -শেফালি -পারিজাত ঝরা পথ বেয়ে গুটি গুটি পায়ে এসেছে শরৎকাল। ধূলি-ধূসরময় ইট-কাঠ পাথরের প্রাণহীন এই নগর জীবনে,আয়-উপার্জনের সন্ধানে ব্যাকুল ও প্রতিনিয়ত জীবন সংগ্রামে নাস্তানাবুদ বেশীর ভাগ মানুষকে এখন আর আগের মতো শরতের শিউলি ফুলের সুগন্ধ মোহাআবিষ্ট করে না। নগরের মানুষ গাড়ি-বাড়ি, অর্থ -প্রতিষ্টা, পদ-পদবি, খ্যাতির মোহে আচ্ছন্নের মতো ছুটে চলছে প্রতিনিয়ত ।তাই তাদের কাছ থেকে শরতে শিউলির সুবাস আর শরতের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখবে সে আশাকরা অলীক স্বপ্ন মাত্র ।তাই তো লোভাতুর চোখগুলো প্রকৃতিকে লুট করে চলেছে নিয়ত। সেজন্য ধরণী আজ ক্ষত-বিক্ষত। অনেক ঋতু বৈচিত্র্যেরেরই হচ্ছে অপমৃত্যু ।


# ব্যর্থ প্রেমিকার সূর্যের স্পর্শে ঝরে পড়া শরৎকালের  শিউলি ।


০২.১০.২১

মন্তব্য করুন