Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৪ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০৬:০৩ অপরাহ্ণ

আলিয়া মাদরাসার ফাযিল(ডিগ্রি ,অনার্স) কামিল( মাস্টার্স) স্তরের কারিকুলাম প্রণয়ন, পরিমার্জন ও সংস্করণ; সমস্যা ও সম্ভাবনা

"আলিয়া মাদরাসার ফাযিল(ডিগ্রি ,অনার্স) কামিল( মাস্টার্স)  স্তরের কারিকুলাম প্রণয়ন, পরিমার্জন ও সংস্করণ; সমস্যা ও সম্ভাবনা" :


 উন্নত বিশ্ব তাদের কারিকুলাম প্রণয়ন করে থাকে মার্কেট ভ্যালু দেখেই।এবং স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনা ও পরামর্শ  করে।তাদের কেমন ম্যান পাওয়ার প্রয়োজন, কী পরিমাণ প্রয়োজন ইত্যাদি।কিন্তু আমাদের দেশে কী সেটা হয়? বিশেষ করে ফাযিল ও কামিল স্তরের কারিকুলাম তৈরির ক্ষেত্রে।আমাদেরকে এমন একটা কারিকুলাম তৈরি করা দরকার। যে কারিকুলাম সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে নতুন চাহিদা অনুযায়ী ম্যান পাওয়ার তৈরি করতে সক্ষম হয়।কোন ধরনের কারিকুলাম প্রণয়ন করলে শিক্ষার্থীরা ভালো আলেম হতে পারবে  এবং ইসলাম জানার  সাথে সাথে জব সুবিধাও বেশি পাবে সেটাও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। 

আমাদের ফাযিল ও কামিল স্তরের পড়াশোনা আপাতত থিওলজি বা ধর্মতত্ত্বকেন্দ্রিক।তাই এর স্টেক হোল্ডার কারা কারা এবং কোন কোন  সেক্টরে কেমন জনশক্তি দরকার তা খুঁজে বের করে সেই মানের  ম্যানপাওয়ার তৈরি করা দরকার। আমাদের ধর্মীয় অঙ্গনে কিছু আলেম, দা'ঈী, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে পারদর্শী,তাফসিরবেত্তা,হাদিসবেত্তা,ফকিহ্ এবং সাধারণ ও ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞ, নাহুভী, আদিব, ইসলামি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ, সমাজবিজ্ঞানী,ইমাম ও খতীব, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী,শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, গবেষক, দক্ষ অনুবাদক,মিডিয়াকর্মী ও সাংবাদিক, ইসলামের ইতিহাসবেত্তা ইত্যাদি সেক্টর জনশক্তি প্রয়োজন। আমাদের স্টেক হোল্ডার হিসেবে রয়েছে রাষ্ট্র ও সরকার,  রয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ( তাদের দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করার মতো আরবি ভাষায় দক্ষ শ্রমিক ও ব্যবসায়ী তৈরি করা) বিভিন্ন মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানি,ক্যান্টেনমেন্ট স্কুল এন্ড কলেজের পরিচালক, স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ইমাম ও খতীব নিয়োগ কমিটি,  বিভিন্ন দেশের  দূতাবাস,বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা  ইত্যাদি।এদের সাথে আলোচনা করে এবং তাদের মতামত নিয়ে কারিকুলাম তৈরি করা হলে আমি মনে করি শিক্ষার্থীরা বেশি উপকৃত হবে। কারণ যাদের জন্য এই আয়োজন তারা যদি বেনিফিটেড না হয় তাহলে লাভ কী? আর অনেক সময় দেখা যায় আমাদের কারিকুলামে অনেক বিষয় অনেক বেশি করে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সিলেবাস দেখে সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে আমাদের পাশ্ববর্তী দেশগুলো এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের  কারিকুলাম। 


√যেই বিষয়গুলো বিবেচনায় আনা যেতে পারে :

এক্ষেত্রে আমাদেরকে সর্বপ্রথম চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সির কথা মাথায় রাখতে হবে।

১.কুরআন ও তাফসিরে ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সূরা ও তাফসির একসাথে একই ইয়ারে না দেওয়া। বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী সূরা, আয়াত ও তাফসির সিলেক্ট করা।উসূলে তাফসির,তাফসীরে ইতিহাস ও মূলনীতি, বিশুদ্ধ তাফসীরগ্রন্থ, মুফাসসিরের যোগ্যতা, আহকামুল কুরআন ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করা। 

কারণ সিলেবাস অনেক বড় হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যায়। কারো ভাষা দক্ষতা থাকলে সে নিজেই পড়ে নিতে পারবে।আর কারিকুলামে সব কী দেওয়া  এবং শেখানো কী সম্ভব? 

২.হাদিসের ক্ষেত্রে হাদিসের সকল কিতাব একসাথে না দিয়ে "সিহাহ সিত্তাহর" এক ইয়ারে ২ টি করে দেওয়া। হাদিসের অধ্যায়, বাব ও বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে  ইমান,ইসলাম, আকাইদ, ফিকাহ, আদব এর সাথে "কিতাবুয যুহুদ" ও "কিতাবুল ফিতান" অন্তর্ভুক্ত করা।উলুমুল হাদিস ও ইমলুল জারাহ ওয়াত তাদিল এবং সাহাবিদের (রাবীদের) জীবনী রাখা।

৩.ফিকাহ্ বিষয় সিলেক্ট করার ক্ষেত্রে শরীয়ত এরমূল দিকগুলো (অধ্যায়গুলো) নির্বাচন করার সাথে সাথে তুলনামূলক ফিকাহ্ অন্তর্ভুক্ত করা।অন্যান্য ফিকহী মাযহাবের কবিতা রাখা এবং ফিকাহ্ ও উসূলে ফিকাহ এর মূলনীতি ও ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা।

৪.মাকাসিদুশ শারিয়াহ অন্তর্ভুক্ত করা। 

৫.আরবি ভাষা দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ব্যবহারিক আরবিকে((ফাংশনাল আরবি) প্রাধান্য দেয়া। এবং সকল বিভাগ ও প্রতি ইয়ারে ব্যবহারিক আরবি রাখা। 

৬.আরবি এর সাথে ব্যবহারিক ইংরেজি(ফাংশনাল ইংরেজি)  ভাষাকে সমানভাবে গুরুত্বদেয়া।প্রতি ইয়ারে ইংরেজির একটা কোর্স  রাখা।কারণ জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী ইংরেজি বাধ্যতামূলক।আর বতর্মানে চাকরির বাজারে ইংরেজির গুরুত্ব অনেক।আর ইংরেজিতে  দুর্বলতার কারণে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে থাকে।কারণ আলিমের পর অনেক শিক্ষার্থী ইংরেজি ভাষা চর্চা থেকে দূরে থাকেন।

৭.মাতৃভাষা হিসেবে বিশুদ্ধ বাংলা ভাষা চর্চা ও বিশুদ্ধ বাংলা লেখার ক্ষেত্রে ব্যবহারিক বাংলা (ফাংশনাল বাংলা)ও সংক্ষিপ্ত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রাখা।কারণ জবের পরীক্ষায় বাংলা থেকে চারভাগের একভাগ প্রশ্ন থাকে।

৮.বাংলাদেশ স্টাডিজ রাখা। নিজের দেশ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে বাংলাদেশ স্টাডিজ কোর্স রাখা। কারণ জব পরীক্ষায় সাধারণ জ্ঞান থাকে।আর জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ বাংলা ভাষা রাখা ব্যধ্যতামূলক।

৮.আইসিটি [ICT] কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা।কারণ একজন শিক্ষার্থীর বর্তমানে কম্পিউটার জানা থাকলে দুনিয়া তার হাতের মুঠে।

৯.শিক্ষায় গবেষণা কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা।

১০.মিডিয়া আরবি বা আধুনিক আরবি অন্তর্ভুক্ত করা 

১১.অনুবাদ (বাংলা থেকে আরবি,আরবি থেকে বাংলা, আরবি থেকে ইংরেজি ইত্যাদি) কোর্স রাখা।

১২.শিক্ষক নিবন্ধন সিলেবাস পর্যালোচনা করে তার সিংহভাগ পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা। 

১৩.বাংলাদেশে ও সমকালীন মুসলিম  বিশ্বের ইতিহাস কোর্স রাখা। 

১৪.ইসলামের ইতিহাস, ইতিহাস  ও মুক্তিযুদ্ধ(বাংলাদেশ স্টাডিজ)  অংশ অন্তর্ভুক্ত করা। 

১৫.মুসলিম ও সমকালীন বিশ্ব বা আন্তর্জাতিক সংস্থার পরিচিত অন্তর্ভুক্ত করা। 

১৬.মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্ব। 

১৭.ব্যবহারিক কম্পিউটার ও আউটসোর্সিং। 

১৮.ইসলামি অর্নীতি,  ইসলামি ব্যাংকিং, বিজনেস এন্ড পলিসি অব মিডলইস্ট।

১৯.অ্যারাবিক ল্যাংগুয়েজ  ইন টেকনলজি।এবং টিচিং মেথডলোজি অন্তর্ভুক্ত করা 

২০.প্রয়োজন হলে আগের কারিকুলামের ত্রুটি খুঁজে বের করা।এক্ষেত্রে নামকরা আলিয়া মাদরাসাগুলোর শিক্ষক এবং  শিক্ষার্থীদের থেকে মতামত নেওয়া যেতে পারে। 


বি.দ্র.:প্রত্যেকটি কোর্সের সাথে কোর্সের  লক্ষ্য ( Mission)ও উদ্দেশ্য (Vision)  সুনির্দিষ্টভাবে লিখে দেওয়া। 


এরসাথে সাথে শিক্ষার্থীদেরকে ক্লাসমুখী করার জন্য উপস্থিতিতে নম্বর রাখা, অ্যাসাইনমেন্ট, ইনকোর্স, টিউটোরিয়াল পরীক্ষা, টার্মপেপার, মৌখিক পরীক্ষা  ইত্যাদি রাখা। 


এগুলো সবই আমার ব্যক্তিগত মতামত। 

লেখক :

আব্দুর রহিম 

সাবেক শিক্ষার্থী 

আরবি বিভাগ 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। 

শিক্ষক, 

সৈয়দ আব্দুল মান্নান ডি. ডি. এফ. আলিম মাদরাসা বরিশাল।

মন্তব্য করুন