Loading..

ব্লগ

রিসেট

১১ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০৫:৩৪ অপরাহ্ণ

মূল্যায়ন ও বিবিধ; আমার গবেষণা

মূল্যায়ন ও বিবিধ

ভূমিকা:

শিক্ষা একটি বিমূর্ত ধারণা; এর শুরু থেকে শেষ নির্ধারণ করাও অত্যন্ত কঠিন কাজ তবুও বাস্তবতার নিরিখে একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে শিক্ষাকে পরিমাপ পদ্ধতির আওতায় এনে মূল্যায়ন (মূল্য আরোপ) প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় যা শিক্ষার্থীর অর্জিত ব্যাপৃত জ্ঞানের সম্মিলন ঘটিয়ে, শিক্ষার্থীর জানার পরিধির তুলনা করে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই প্রাথমিক শিক্ষাস্তর থেকেই তার শিক্ষাক্রম ব্যবস্থাপনার আলোকে চলে শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন

শিক্ষার্থীর আচরণের সার্বিক বিকাশ ইতিবাচক পরিবর্তন সাধন প্রক্রিয়া সংগঠনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে মূল্যায়নকে ধরা হয়েছে কেননা, মূল্যায়ন ছাড়া শিখন শেখানো প্রক্রিয়ার সফলতার মাত্রা যাচাই করা যায় না

 

শিক্ষা:

শিক্ষা প্রক্রিয়ায়, কোন ব্যক্তির অন্তর্নিহিত গুণাবলীর পূর্ণ বিকাশের জন্য উৎসাহ দেয়া হয় এবং সমাজের একজন উৎপাদনশীল সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য যে সকল দক্ষতা প্রয়োজন সেগুলো অর্জনে সহায়তা করা হয় সাধারণ অর্থে, জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা ব্যাপক অর্থে, পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়াকেই শিক্ষা বলে তবে শিক্ষা হল সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের অব্যাহত অনুশীলন বাংলা শিক্ষা শব্দটি এসেছে 'শাস' ধাতু থেকে, যার অর্থ শাসন করা বা উপদেশ দান করা

অন্যদিকে শিক্ষার ইংরেজি প্রতি- শব্দ 'Education' এসেছে ল্যাটিন শব্দ 'Educare'  বা 'Educere' বা 'Educatum’ থেকে

যার অর্থ বের করে আনা অর্থাৎ ভেতরের সম্ভাবনাকে বাইরে বের করে নিয়ে আসা বা বিকশিত করা

সক্রেটিসের ভাষায়, শিক্ষা হল মিথ্যার অপনোদন সত্যের বিকাশ

এরিস্টটল বলেন, সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই হল শিক্ষা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, শিক্ষা হল তাই যা আমাদের কেবল তথ্য পরিবেশনই করে না, বিশ্ব-সত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে

 

মূল্যায়ন মূল্য যাচাই পরিবীক্ষণ:

শিক্ষা অর্জনের পূর্বশর্ত হলো নির্ধারিত শিখনফল আহরণ করা; যা মূল্যায়ন এর মাধ্যমে যাচাই করা হয়

 

 

 

পরিমাপ মূল্যায়ন: সংজ্ঞা ধারনা

আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বহু জিনিসের পরিমান নির্ণয় করে থাকি যেমন- চাল কিনতে বাজারে গেলে আমরা বলি, আমাকে কেজি বা ১০ কেজি চাউল দিন এখানে কেজি বা ১০ কেজি হল চাউলের পরিমাণ আবার আমরা কাপড় কিনতে গেলে বলি, মিটার কাপড় দিন, কখনও বা জিজ্ঞেস করি, এই শাড়ীটা মিটার লম্বা কি'না এখানে, মিটার বা মিটার কাপড় বা শাড়ীর দৈর্ঘ্যের পরিমাণ দৈনন্দিন জীবনে কোন কিছুর পরিমান নির্ণয় করাকে বলা হয়, পরিমাপ

সুতরাং পরিমাপ হল কোন কিছুর পরিমান নির্ণয় করা বা অন্য কথায় কোন কিছুর পরিমাণকে সংখ্যায় প্রকাশ করা শিক্ষা ক্ষেত্রেও পরিমাপ, পরিমাণ নির্ণয় করা হয়ে থাকে তবে এই পরিমাপ মূলত শিক্ষার্থীর সাফল্য, কৃতিত্ব বা পারদর্শিতার পরিমাণের হিসাব

মনে করি, আমি একদল শিক্ষার্থীর গণিতে সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ণয় করব এজন্য শিক্ষার্থীদের গণিত পরীক্ষা নিলাম তাদের উত্তরপত্র যাচাই করে তাতে নম্বর প্রদান করলাম এখানে, গণিতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত নম্বর হল তার সাফল্যের পরিমাণ বা তার সাফল্যের সংখ্যাগত ধারণা প্রকাশ করার প্রক্রিয়া হল পরিমাপ

বিভিন্ন শিক্ষাবিদ মনোবিজ্ঞানী পরিমাপ এর বিভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন গ্রনল্যান্ড (Gronlund) লিনের (Linn) মতে, কোন ব্যক্তির মধ্যে কোন নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য কতটুকু আছে তার সংখ্যাগত বর্ণনা লাভের প্রক্রিয়া হল পরিমাপ (Measurement) [1990]  

পরিমাপের বর্ণনা দিতে গিয়ে (R. N. Patel) প্যাটেলের মতে, কোন মূল্য আরোপের বেলায় বা কোন ক্ষেত্রে যে প্রক্রিয়ায় সংখ্যাসূচক স্থির করা হয় তাই হল পরিমাপ

শিক্ষা বিজ্ঞানে পরিমাপ হলো শিক্ষার্থীর সাফল্য বা কৃতিত্ব বা পারদর্শিতাকে সংখ্যায় প্রকাশ করার প্রক্রিয়া পরিমাপ সম্পর্কে ধারণাকে সুসংবদ্ধ করার জন্য শিক্ষায় মূল্যায়ন বলতে যা বোঝায়, সেই ধারণাকে খোলসা করতে হবে

মূল্যায়ন কথাটির শব্দগত অর্থ বিশ্লেষণ করলে সহজেই অনুমেয় হয় যে, মূল্যায়ন হল মূল্য বিচার বা মূল্য নির্ধারণ মনে করি, পঞ্চম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী গণিতে ১০০ নম্বরের মধ্যে ১০০ নম্বর পেয়েছে এই ১০০ নম্বর হল গণিতে তার সাফল্যের পরিমাপ আবার, শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী ১০০ নম্বরের মধ্যে ৩২ নম্বর পেয়েছে এই ৩২ নম্বর শিক্ষার্থীর পারগতার স্তর (গণিতে) সর্বনিম্ন তা বোঝাচ্ছে অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে, প্রথম শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতে সবচেয়ে ভালো এবং দ্বিতীয় শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতে সন্তোষজনক অবস্থানে নেই

আবার পেশাগত দক্ষতা বিচারে মনে করি, একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে এসেছেন তিনি প্রশিক্ষণের তাত্ত্বিক পরীক্ষায়, শতকরা ৬০ নম্বর পেলেন তার শ্রেণি পাঠদান প্রক্রিয়া মোটামুটি, তবে তার উপকরণ ব্যবহার ভাল নয়সবমিলিয়ে এই মর্মে ধারণা গ্রহণ করা যায়, তিনি একজন দ্বিতীয় গ্রেডের শিক্ষক অর্থাৎ দ্বিতীয় গ্রেডের শিক্ষক হিসেবেই তিনি মূল্যায়িত হবেন মূল্যায়নের মধ্যে শিক্ষার্থীর কৃতিত্বের পরিমাণগত গুণগত বর্ণনা এবং বর্ণনার ভিত্তিতে তার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ অন্তর্ভুক্ত  

সুতরাং মূল্যায়ন = (শিক্ষার্থীর কৃতিত্বের পরি মানগত বর্ণনা + শিক্ষার্থীর সাফল্যের গুণগত বর্ণনা) +কৃতিত্ব সাফল্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ

অর্থাৎ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ কথাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ

(আমি বা) একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে যেকোনো একটি বিষয় পড়ান তখন বিষয় পড়ানোর ক্ষেত্রে বেশ কিছু জিনিস মনে রাখতে হয় [যেমন- নির্দিষ্ট বিষয়ের বিভিন্ন পাঠ্যাংশের যেসব শিখনফল থাকে (শিক্ষাক্রম অনুযায়ী)] পড়ানোর শেষে শিক্ষককে মূল্যায়ন করে দেখতে হয় নির্দিষ্ট বিষয়ের পাঠদান কতটুকু সফল হয়েছে অর্থাৎ শিখনফল গুলো যথার্থভাবে অর্জিত হয়েছে কি-না মূল্যায়নের পারিভাষিক শব্দ হিসেবে বিভিন্ন শিক্ষাবিদগণ অনেকেই 'Assessment' আবার অনেকেই 'Evaluation' ব্যবহার করেছেন এমনকি Oxford Advanced Learner's Dictionary- তে 'Assessment' এর প্রতিশব্দ হিসেবে 'Evaluation' শব্দটিকে ব্যবহার করা হয়েছে তবে বাংলা মূল্যায়নের বিভিন্ন প্রকারভেদে 'Assessment' 'Evaluation' উভয়ই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে গ্রনল্যান্ড লিন (1990) শিক্ষা মূল্যায়ন সম্পর্কে যেভাবে বর্ণনা দিয়েছেন তার ভাবার্থ হল, শিক্ষণ উদ্দেশ্যের কতটুকু শিক্ষার্থীরা অর্জন করতে পেরে -ছে তা নির্ণয়ের জন্য তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণও ব্যাখ্যার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হলো মূল্যায়ন ফ্রিম্যান এবং লুইস (1998) এর মতে- মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর শিখনের মাত্রা  যাচাই করা হয় নরম্যান ইসলাম (1999)-এর বিশ্লেষণে- শিক্ষার উদ্দেশ্য কতটুকু শিক্ষার্থীরা অর্জন করতে পেরেছে তা নির্ণয়ের সুসংবদ্ধ প্রক্রিয়া হল মূল্যায়ন শিক্ষা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মূল্যায়ন হল কোন শিক্ষার্থীর সাফল্য বা ব্যর্থতা পরিমাপ করে তার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ মূল্যায়ন চারটি বিষয়ের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত এগুলো হল-

* শিখনের উদ্দেশ্য: শিক্ষার সংজ্ঞায়িত লক্ষ্য

* শিখনের বিষয়বস্তু: শিক্ষণীয় বিষয়

* শিখন অভিজ্ঞতা: পরীক্ষণ, আলোচনা, প্রশ্ন- উত্তর, প্রদর্শন ইত্যাদি

মূল্যায়ন কৌশল উপকরণ:

লিখিত, মৌখিক ব্যবহারিক পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ

নিচে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া দেখানো হল:

উদ্দেশ্য‌‌‌‌

মূল্যায়ন কৌশল

বিষয়বস্তু

শিখন অভিজ্ঞতা

মূল্যায়নের বৈশিষ্ট্য:

মূল্যায়ন একটি ধারাবাহিক, নিরবচ্ছিন্ন সুসংবদ্ধ প্রক্রিয়া

শিক্ষণ-শিখন মূল্যায়ন প্রক্রিয়া পাশাপাশি চলে

মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষণের চেয়ে শিখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ

মূল্যায়ন যেমন গুণগত তেমনই পরিমাণগতও বটে

 

মূল্যায়নের লক্ষ্য উদেশ্য:

মূল্যায়নের প্রধান লক্ষ্য হলো গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক কোর্স বা পাঠের বিষয়বস্তু শেখার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীকে উৎসাহিত বা উদ্বুদ্ধ করা (Freedom & Lewis, 1998) এটি প্রধানত শিক্ষার্থীর শিখন মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহায়তা করে (Cartwright, Weiner & Streamer-Veneruso, 2009) শিক্ষার্থীদের শিখনফল অর্জনে মূল্যায়ন তাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হল শিক্ষার্থীর শিখন অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য প্রদান তাই মূল্যায়নের ফল থেকে বিষয়বস্তুর শিখনফল কতখানি অর্জিত হয়েছে তা বোঝা যায় এছাড়া শিক্ষার্থী কতখানি অগ্রসর হয়েছে বা কতটা পিছিয়ে পড়েছে যে সম্পর্কিত তথ্য জানা যায় এবং সে অনুযায়ী শিক্ষার্থীকে তার শিখন মান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা যায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে মূল্যায়নের ফল বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় যেমন- শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, চাকরিদাতা- প্রতিষ্ঠান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি বিভিন্ন উদ্দেশ্যে মূল্যায়নের ফল ব্যবহার করে থাকে অর্থাৎ বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষে মূল্যায়নের ফল ব্যবহার করে থাকে শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রেষণা সৃষ্টি বা শিখনে আগ্রহ বৃদ্ধি, শিখনের সুযোগ বৃদ্ধি করা, শিক্ষার্থীকে শিখন সহায়ক পরামর্শ বা ফলাবর্তন দেয়া, শিক্ষককে শিক্ষণ পদ্ধতি যাচাই করার সুযোগ প্রদান, গ্রেড প্রদান, শিখন মান নিশ্চিত করা ইত্যাদি (Rust, 2002)

 

বাস্তবতার নিরিখে মূল্যায়নের উদ্দেশ্যসমূহ হলো:

) শিক্ষার্থীর শিখনকে সহায়তা করা,

) শিক্ষকের শিক্ষণ প্রক্রিয়ার মানোন্নয়ন করা,

) শিক্ষার্থী নির্বাচন করা,

) শিখনের সনদ প্রদান,

) শিক্ষার্থীর প্রোফাইল বর্ণনা,

) অভিভাবক অন্যদের শিক্ষার্থীর অগ্রগতি জানানো

 

) শিক্ষার্থীর শিখনকে সহায়তা করা: মূল্যায়নের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীর শিখনকে সহায়তা করা, শিক্ষাবিদ গন মনে করেন, যেকোন মূল্যায়নের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর শিখনকে উৎসাহিত করা (Black et al, 2005, Freeman & Lewis, 1998) সতর্কতার সাথে পরিকল্পনা করা হলে মূল্যায়ন শিক্ষার্থীর শিখনকে উৎসাহিত করতে পারে মূল্যায়ন কৌশল শিক্ষার্থীর শিখনকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করতে পারে যেমন-

* প্রশ্নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর আগ্রহ বৃদ্ধি করা,

* শিক্ষার্থীর মূল্যায়নের মাধ্যমে অনুশীলন করার সুযোগ প্রদান করা,

* শিক্ষার্থীর কাজ বা পারদর্শিতার ওপর ফলাবর্তন (Feedback) দেওয়া যার দ্বারা শিক্ষার্থী তার দুর্বলতা দূর করে শিখন মান বৃদ্ধি করতে সক্ষম হবে

* মূল্যায়ন ফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীর পরবর্তী ধাপে কী করতে হবে সে সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেওয়া,

* শিক্ষার্থীকে তার অগ্রগতি চিহ্নিত করতে সহায়তা করা মূল্যায়নের একাধিক কৌশল প্রয়োগ করে ফলাবর্তন দেওয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে তার শিখনে উৎসাহিত করা যায়

) শিক্ষকের শিক্ষণ প্রক্রিয়ার মানোন্নয়ন করা: শিক্ষার্থীর শিখন মূল্যায়নের তথ্য শিক্ষককে তার শিক্ষণ পদ্ধতি কলাকৌশল পর্যালোচনা করার সুযোগ প্রদান করে অন্য কথায়, মূল্যায়ন শিক্ষককে তার শ্রেণিতে ব্যবহৃত শিক্ষণ পদ্ধতির প্রভাব যাচাই করার সুযোগ প্রদান করে যেমন- শ্রেণিতে শিক্ষার্থীরা কোন প্রশ্নের উত্তর কতটা সঠিকভাবে দিতে পারছে; সব শিক্ষার্থী উত্তর দিতে পারছে কিনা ইত্যাদি তথ্যের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষক তার শিক্ষণ পদ্ধতির মান যাচাই করতে পারেন যদি শিক্ষক দেখতে পান যে, অনেক শিক্ষার্থী প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে দিতে পারছে না, তখন তাকে উক্ত বিষয়ে পাঠ উপস্থাপন পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে

) শিক্ষার্থী নির্বাচন করা: মূল্যায়ন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নির্বাচন করার কাজে ব্যবহার করা হয় যেমন- শিক্ষার্থী কোনো কোর্সে ভর্তি হতে চাইলে বা কোনো চাকরির জন্য আবেদন করলে কোর্সের বা চাকরির যোগ্যতা যাচাইয়ের কাজে মূল্যায়নের ফল ব্যবহার করা হয় এক্ষেত্রে মূল্যায়নের কাজ হচ্ছে কোর্স বা চাকরিতে শিক্ষার্থী কতটা সফল হবে সে সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বানী করা নির্বাচনের জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীকে তার মূল্যায়নের ফলের ভিত্তিতে অবস্থান (Ranking) প্রদান করা হয় এক্ষেত্রে তুলনাভিত্তিক মূল্যায়ন (Norm-referrenced) কৌশল ব্যবহার করা হয়

) সনদ প্রদান: মূল্যায়নের একটি বহুল ব্যবহৃত বা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে শিক্ষার্থীকে তার কৃতিত্বের স্বীকৃতি দেওয়া অর্থাৎ শিক্ষার্থী কোন কোর্স বা বিষয়ে নির্ধারিত মানদণ্ড (Particular Standard) অর্জন করতে পেরেছে কি-না তার একটি প্রমান বা সনদ প্রদান করা হয় মূল্যায়নের মাধ্যমে (Black, Harrison, Lee, Marshall & William, 2005), যেমন- পিইসি, জেএসসি, এসএসসি বা যেকোন ধরনের বার্ষিক পরীক্ষা ইত্যাদি শিক্ষার্থীকে তার অর্জনের সনদ প্রদান করার বিভিন্ন উপায় আছে এই সনদ হতে শুধু পাস-ফেল (কৃতকার্য বা অকৃতকার্য) সম্পর্কিত, যোগ্য অথবা এখনো যোগ্য নয় এধরণের মূল্যায়নে শিক্ষার্থীর পারদর্শিতার একটি বিশেষ স্তর অর্জন করেছে কি-না সে সম্পর্কে সনদ প্রদান করে এই সনদ পরবর্তী স্তরে অধ্যয়ন বা কাজের যোগ্যতার প্রমাণক হিসেবে ব্যবহৃত হয় 

) শিক্ষার্থীর প্রোফাইল বর্ণনা: বাস্তব জীবনে অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থী তার একাডেমিক কোর্স থেকে কী শিখতে বা জানতে পেরেছে কিংবা কী দক্ষতা অর্জন করতে পেরেছে সে সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ জানা প্রয়োজন হয় শিক্ষার্থীর পারদর্শিতা / কৃতিত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ নথিবদ্ধ করা, অন্য কথায় শিক্ষার্থীর প্রোফাইল বর্ণনা করা শিক্ষার্থীর শিখন মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর পারদর্শিতা মূল্যায়নের ফল সরল এবং স্বাভাবিকভাবে অনেকটা সংক্ষেপেই প্রকাশিত হয় যেমন-বর্ণ গ্রেড (যেমন- A, A+, B  ইত্যাদি), সাংখ্যিক নম্বর, উত্তীর্ণ, অনুত্তীর্ণ ইত্যাদি এই পদ্ধতি শিক্ষার্থীর পারদর্শিতা বা কৃতিত্ব সম্পর্কে সাধারণ ধারণা মাত্র দিতে পারে এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীর তেমন কোন তথ্য জানা যায় না অন্যদিকে প্রোফাইল হলো শিক্ষার্থীর কৃতিত্বের বিভিন্ন অংশের বিবরণ তাই শিক্ষার্থীর প্রোফাইল বর্ণনা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ

) অভিভাবক অন্যদের শিক্ষার্থীর অগ্রগতি জানানো: শিক্ষার্থীর অগ্রগতি কতটা হয়েছে বা শিক্ষার্থী কোনো কাজের জন্য কতটা যোগ্য- বিষয়ে অভিভাবককে অবহিত করা মূল্যায়নের একটি উল্লেখযোগ্য কাজ এর ফলে শিক্ষার্থীর শিখন প্রক্রিয়ায় অভিভাবকের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়, নিজ সন্তানের শিখন প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান করতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দানের সুযোগ লাভ করেন কার্যকর মূল্যায়ন : মানসম্মত শিক্ষণ শিখনের সাথে মূল্যায়নের নিবিড় সম্পর্কের একটি জানের বিস্তৃতি রয়েছে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর মূল্যায়নের বিকল্প নেই শিখন উদ্দেশ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে শিখন-শেখানো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে কি-না তা সঠিকভাবে নির্ণয় করতে প্রয়োজন কার্যকর মূল্যায়ন সর্বোপরি, কার্যকর মূল্যায়ন হলো সেই মূল্যায়ন, যা শিক্ষার্থীর শিখনকে ত্বরান্বিত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে যে মূল্যায়ন থেকে শিক্ষার্থী কতটুকু গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে তা পরিপূর্ণভাবে চিহ্নিত করা যায় শিক্ষণ পদ্ধতির পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ফলাবর্তন দিয়ে শিক্ষার্থীকে এগিয়ে যাওয়ার দিক-নির্দেশনা প্রদান করে, তা- কার্যকর মূল্যায়ন

 

শিখন মূল্যায়নের নীতি:

. শিশুসহায়ক মূল্যায়ন: মূল্যায়ন কৌশল বা পদ্ধতি শিক্ষার্থীর শিখনের জন্য সহায়ক (Facilitator) হিসেবে কাজ করা উচিত মূল্যায়ন এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে তা থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শেখার ইচ্ছা জাগ্রত হয় শ্রেণি শিখন শেখানো প্রক্রিয়ার সাথে মূল্যায়নকে সমন্বিত করে শিক্ষার্থীদের 'কীভাবে শিখতে হবে' (how to learn) সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন আর জন্য শিক্ষার্থীর শিখনকে প্রক্রিয়া (Process) হিসেবে দেখা দরকার, শুধু একটি সর্বশেষ ফল (Product) হিসেবে নয়

. মূল্যায়নের মানদণ্ড নির্ধারণ: মূল্যায়নের মানদণ্ড শিক্ষার্থীদের নিকট সুস্পষ্ট থাকা আবশ্যক, গোপনীয়তা শিক্ষার্থীর শিখনকে ব্যহত করে শিক্ষার্থীর সাফল্য অর্জনে সহায়তা করার জন্য তাদের সাথে মূল্যায়নের সাফল্য মানদণ্ড (Assessment Criteria) আলোচনা করা প্রয়োজন অর্থাৎ শিক্ষার্থীর কাছে এটা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন যে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কী ধরনের উত্তর আশা করেন সাফল্য মানদণ্ড শিক্ষার্থীকে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে এছাড়া শিক্ষকও বুঝতে পারবেন মূল্যায়নের সময় কোন নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন

. বহুমুখী মূল্যায়ন: শিক্ষার্থীদের অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে একাধিক ধরনের মূল্যায়ন কৌশলে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন যেহেতু মূল্যায়নের প্রধান উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীকে তার শিখনে সহায়তা করা, তাই শিক্ষার্থী যাতে তার জ্ঞান বা দক্ষতা প্রদর্শনের একাধিক সুযোগ লাভ করে সেদিকে লক্ষ্য করা প্রয়োজন শিক্ষার্থীর শিখন মূল্যায়নের বিভিন্ন কৌশল বা পদ্ধতি রয়েছে মূল্যায়নের জন্য কোন একক পদ্ধতি বা কৌশল যথেষ্ট নয় শিক্ষার্থীদের শিখন বা পারদর্শিতা প্রদর্শনের জন্য যাতে একাধিক সুযোগ লাভ করে বা বহুমুখী সুযোগ পায় সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন আর এই মূল্যায়নকে অনানুষ্ঠানিক বা স্বাভাবিক পরিবেশে সংঘটিত হওয়া প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থী মূল্যায়নকে শিখন শেখানো কার্যাবলী থেকে পৃথক না করতে পারে এতে শিক্ষার্থীর উদ্বিগ্নতা হ্রাস পায়

. স্ব-মূল্যায়ন সহযোগিতামূলক মূল্যায়ন: মূল্যায়ন কৌশলে স্ব-মূল্যায়ন (Self-assessment) সহযোগিতামূলক মূল্যায়নের (Collaborative-assessment) সুযোগ থাকা প্রয়োজন শিক্ষণ শিখন প্রক্রিয়াকে উচ্চ মানসম্পন্ন করার ক্ষেত্রে স্ব-মূল্যায়ন এবং সহযোগিতামূলক মূল্যায়নের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য কারণ এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের জ্ঞানের গভীরতা বৃদ্ধির সুযোগ লাভ করে দক্ষতা বোধগম্যতা বিকাশের সুযোগ হবে মূল্যায়নের সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যমান ভিন্নতাকে বিবেচনা করা প্রয়োজন বিভিন্ন শিক্ষার্থী বিভিন্নভাবে শেখে-এই বিবেচনা থেকে সকলের জন্য উপযুক্ত মূল্যায়ন কৌশল প্রয়োগ করা প্রয়োজন এক্ষেত্রে শিখন চাহিদা অনুযায়ী, বিভিন্ন শিক্ষার্থীর জন্য বিভিন্ন প্রকার মূল্যায়ন কৌশল প্রয়োগ করা প্রয়োজন

 

মূল্যায়ন-এর প্রকৃতি:

মূল্যায়ন হবে সমস্যা শনাক্তকারী, গাঠনিক এবং নিরন্তর বা নিয়মিত মূল্যায়ন সবচেয়ে ভালো কাজ করে যদি তা বিচ্ছিন্ন না হয়ে নিয়মিত পরিচালিত হয়, শিক্ষার্থীকে ফলাবর্তন দেয় শিক্ষার্থীকে শিখনে সহায়তা করে

 

মূল্যায়নের প্রকারভেদ:

মূল্যায়নের প্রকারভেদ বিভিন্নভাবে করা যেতে পারে মূল্যায়ন হতে পারে আদর্শমানভিত্তিক বা হতে পারে মানদণ্ডভিত্তিক এই মূল্যায়ন মূলত নির্ভর করে কি মূল্যায়ন করা হবে, কি জন্য করা হবে এবং কখন মূল্যায়ন করা হবে তার ভিত্তিতে অর্থাৎ শিক্ষার্থীর সবলতা, দুর্বলতা প্রয়োজন যাচাই মূল্যায়নের একটি দিক এবং অন্যদিকে শিক্ষার্থীর কৃতকার্যতা অকৃতকার্যতা নিরূপণ করা হলো মূল্যায়নের অপর একটি দিক মূল্যায়ন কালের উপর ভিত্তি করে বিশেষত, দু'ধরণের মূল্যায়ন নিয়ে আলোচনা করা হয়- গাঠনিক মূল্যায়ন (Formative Assessment) 

                   সামষ্টিক মূল্যায়ন (Summative Assessment)

 

 

গাঠনিক মূল্যায়ন : শিক্ষার্থীর সবলতা, দুর্বলতা প্রয়োজন বা অসম্পূর্ণতা জানার জন্য মূল্যায়ন এধরণের মূল্যায়নকে বলা হয় গাঠনিক মূল্যায়ন মূল্যায়ন করা হয় কোর্স চলাকালীন সময়ে (শ্রেনিতে পাঠদানের সময়ে), কোর্সের অন্তর্ভুক্ত পাঠ্যাংশ বিরতিতে মূল্যায়নের পর পরই ফলাফল শিক্ষার্থীদের জানিয়েও দেয়া হয়, পরবর্তী সময়ে মূল্যায়নে শিক্ষার্থীরা সহজেই ভুলগুলোকে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়

 

গাঠনিক মূল্যায়নের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

) এই মূল্যায়ন করা হয় কোর্স চলাকালীন সময়ে একটি শিক্ষণীয় বিষয়ে শিক্ষার্থী কতটুকু উদ্দেশ্য (শিখনফল) অর্জন করতে পেরেছে তা জানতে সহায়তা করে অর্থাৎ এর সাহায্যে শিক্ষার্থীর পারগতা যাচাই করা হয়

) শিক্ষার্থী শিক্ষনীয় বিষয়ের কতটুকু শিখতে পারেনি তা জানতে সহায়তা করে

) শিক্ষার্থীর বিষয়ে আর কি কি জানা প্রয়োজন তা নির্ণয়ে সহায়তা করে

) শিক্ষার্থীর দুর্বলতার জন্য কি কি জানা প্রয়োজন তা নির্ণয়ে সহায়তা করে

) এই মূল্যায়নের ফল কখনওই শিক্ষার্থী সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যবহার করা হয় না শিক্ষার্থীকে তার সাফল্য ব্যর্থতা সম্পর্কে ফিডব্যাক প্রদানে ব্যবহৃত হয়                   

সামষ্টিক মূল্যায়ন: শিক্ষার্থীর সম্পর্কে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এই মূল্যায়ন অর্থাৎ শিক্ষার্থীর পাশ-ফেল নির্ধারণের জন্য মূল্যায়ন এই মূল্যায়ন করা হয় মূলত কোর্স সমাপ্তি বা বছরের শেষে এধরনের মূল্যায়নকে বলা হয় সামষ্টিক বা প্রান্তিক মূল্যায়ন

সামষ্টিক মূল্যায়নের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

) এই মূল্যায়ন করা হয় কোর্স শেষে বা বছর শেষে তবে কখনও কখনও সাপ্তাহিক, মাসিক, ষান্মাসিক ভাবে এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পাদন করা যায়

) শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট সময় শেষে কোর্সের কতটুকু আয়ত্ত করতে পেরেছে তা জানা যায়

) পরবর্তী স্তরের জন্য শিক্ষার্থীকে প্রস্তুত করা হয়

) শিক্ষার্থীর সবলতা দুর্বলতা বিচারের মাধ্য সে কৃতকার্যতা অকৃতকার্যতা প্রকাশ পায়

) এই মূল্যায়নের ফল চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয় এই মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থী গ্রেড বা সনদপত্র প্রাপ্ত হয়

 

মূল্যায়নে গাঠনিক এবং সামষ্টিক মূল্যায়নের ভূমিকা:

এই দুই ধরণের মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় মধ্যে কোনো একটি অপরটির চেয়ে অধিক কার্যকর নয় শিক্ষার্থীদের শিখন সম্পর্কে যথাযথ তথ্য সংগ্রহ করার জন্য দুটি পদ্ধতিরই প্রয়োজন রয়েছে (Garrison & Ehringhaus, 2007) পদ্ধতি দুইটিকে, একে অপরের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন কেননা যে কোন একটির ওপর অত্যধিক নির্ভরতা বাস্তবে শ্রেণিকক্ষে অনুষ্ঠিত শিখন শেখানো প্রক্রিয়া সম্পর্কে অস্পষ্ট ধারণা দেবে সকল মূল্যায়ন শিক্ষার্থীর স্থায়ী শিখন অর্জনে সাহায্য করে যাতে নতুন পরিস্থিতিতে শিখন প্রয়োগ করতে পারে, 'অপরিচিত কদাচিৎ ঘটনা কিভাবে পরিচালনা করতে হয় তা শেখে (গ্রোভস, 2009) একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের স্থায়ী শিখনে তিনটি ধারণার মাধ্যমে শিক্ষা দিতে পারে

 

তা হলো:

# শিক্ষার্থীদের পূর্বজ্ঞান, দক্ষতা মনোভাব যাচাই করা

# শিক্ষার্থীকে সক্রিয়ভাবে নিয়োজিত করে

# নিরবচ্ছিন্নভাবে অগ্রগতি পরিবীক্ষণ করে, ফলাবর্তন প্রদান করে এবং শিক্ষার্থীদেরকে তাদের নিজস্ব শিখন পরিবীক্ষণ করতে সাহায্য করে

 

মূল্যায়ন কৌশল:

শিক্ষার্থীর সাফল্য, পারদর্শিতা, বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি মূল্যায়নের জন্য পরিমাপ প্রয়োজন আর পরিমাণের জন্য উপকরণ বা কৌশল প্রয়োজন এসব উপকরণের ব্যবহারই হলো মূল্যায়ন কৌশল মূল্যায়ন কৌশলগুলোকে তিনটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়

. অভীক্ষা উপকরণ: শিক্ষামূলক মনোবৈজ্ঞানিক অভীক্ষা প্রয়োগের মাধ্যমে মূল্যায়ন

. আত্ম বিবৃতিমূলক উপকরণ বা স্বীয় মতামত প্রকাশের উপকরণ: শিক্ষার্থীর নিজের বিবৃতি বা শিক্ষার্থীর প্রকাশিত নিজস্ব মতামত থেকে মূল্যায়ন     

মনোবৈজ্ঞানিক অভীক্ষা

বুদ্ধির অভীক্ষা

              

বিষয় সম্ভাবনার অভীক্ষা

          

    ব্যক্তিসত্তার অভীক্ষা

          

     অনুরাগের অভীক্ষা

                        

                যুক্তির অভীক্ষা

 . পর্যবেক্ষিত কৌশল: শিক্ষার্থীর আচার-আচরণ বা কার্য সম্পাদন পর্যবেক্ষণ করে তার মূল্যায়ন মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাবার পক্ষ্যে সাধারণত অভীক্ষা উপকরণ পদ্ধতির ব্যবহার অত্যধিক 

  অভীক্ষা পদ্ধতি:  অভীক্ষা উপকরণ

                             

                       কৃতিত্ব অভীক্ষা

                             

                       মৌখিক, লিখিত

                            

                     রচনামূলক, নৈর্ব্যক্তিক

                            

                 সংক্ষিপ্ত-উত্তর প্রশ্ন, দীর্ঘ - উত্তর প্রশ্ন 

                             

             এককথায় উত্তর, বহু নির্বাচনী, মিলকরণ, শূন্যস্থান পূরণ, সত্য-মিথ্যা

 

. আত্মবিবৃতিমূলক উপকরণ: শিক্ষার্থীর আত্মবর্ণনা বা বিবৃতি বা স্বীয় মতামত প্রকাশ থেকে কোন শিক্ষার্থী সম্পর্কে জানা যায় শিক্ষার্থী তার নিজের সম্পর্কে কী চিন্তা করে, কী তাকে আনন্দ দেয়, কী তাকে কষ্ট দেয়, কোনটি তার ভালো লাগে, কোনটি মন্দ লাগে, এসব থেকে শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করা যেতে পারে এভাবে মূল্যায়নের জন্য যে উপকরণ ব্যবহৃত হয় তাদেরকে বলা হয় আত্মবিবৃতিমূলক উপকরণ এই উপকরণ নানা রকম হতে পারে

 

প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীর জন্য ব্যবহার উপযোগী হতে পারে-

                     * প্রশ্নমালা

                     * সাক্ষাৎকার

                     * ব্যক্তিগত দিনপঞ্জী বা ডায়েরি

                     * আলোচনা

এদের মধ্যে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে উপযোগী মাধ্যম হলো সাক্ষাৎকার আলোচনা

২. পরীক্ষামূলক কৌশল: বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত রেখে শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য যে কৌশলগুলি ব্যবহার করা হয়ে থাকে তাদের বলা হয় পরীক্ষামূলক কৌশল। যেমন লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা এবং বুদ্ধির অভিক্ষা বা রচনাধর্মী অভীক্ষা বা বস্তুধর্মী অভীক্ষা।

. পর্যবেক্ষণভিত্তিক কৌশল: কোন শিক্ষার্থীর ওপর বা তার কোন কাজের উপর আপনার বা অন্য কোন ব্যক্তির পর্যবেক্ষণ থেকে শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করা হয় বলে একে পর্যবেক্ষণভিত্তিক মূল্যায়ন বলা হয় এবং এজন্য যে ধরনের উপকরণ ব্যবহার করা হয় তাকে বলা হয় পর্যবেক্ষণ ভিত্তিক উপকরণ বা কৌশল পর্যবেক্ষণ ভিত্তিক উপকরণ বা কৌশল ধরণের হতে পারে             

                       * শিক্ষার্থীর অতীত সংক্রান্ত তথ্যপঞ্জী,

                        * চেকলিস্ট (Check List)

                        * রেটিং স্কেল (Rating scale),

                        * সমাজনীতি বিষয়ক কৌশল (Sociometric technique)

প্রাথমিক স্তরের একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর অতীত সংক্রান্ত বিদ্যালয়- রক্ষিত তথ্য থেকে শিক্ষার্থীর দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ, আচার-আচরণ ইত্যাদি মূল্যায়ন করতে পারেন মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা: যেকোন শিক্ষা ব্যবস্থায় মূল্যায়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়নের ভিত্তিতেই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে দেশ, জাতি, সমাজ ব্যক্তি কি পাচ্ছে তা জানা সম্ভব

মূল্যায়নের উপকরণসমূহ:

উপরিউক্ত মূল্যায়ন কৌশলকে ব্যবহার করার জন্য উল্লেখযোগ্য যে উপকরণ সমূহের সাহায্য নেওয়া হয় তা হচ্ছে সাক্ষাৎকার। মূলত অসংগঠিত ও সংগঠিত এই দুই ধরনের সাক্ষাৎকার তালিকা তৈরি করে ব্যক্তির আত্মবিবৃতিমূলক কৌশলকে বাস্তবে রূপ দিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

প্রথমত- শিক্ষার্থীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে মূল্যায়নকারী প্রশ্নকারক নিজ পরিকল্পিত সাক্ষাত্কার তালিকা অনুসারে প্রশ্ন রেখে এবং তাদের উত্তর শুনে ও বুঝে কিছু প্রামাণ্য তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।

দ্বিতীয়ত- তথ্য সংগ্রহের অপর উপকরণটি হচ্ছে প্রশ্নগুচ্ছ। এখানে শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠানো প্রশ্নগুচ্ছের প্রশ্নানুসারে প্রতিক্রিয়ামূলক আচরণ পর্যালোচনা করে তাদের আগ্রহ ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে নানা তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।

তৃতীয়ত- উপকরণ হিসাবে ব্যবহারিক পরীক্ষাকে ব্যবহার করে অনেক বিষয়ের ব্যবহারিক দিকের দক্ষতার ও প্রয়োগক্ষমতাকে মূল্যায়ন করার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

চতুর্থত- পর্যবেক্ষণকে মূল্যায়নের একটি উপকরণ হিসাবে ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের ভাবগত এবং বুদ্ধিগত পরিণতি ও তাদের সামাজিক সংগতিশীল দক্ষতাকে পরিমাপ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে।

পঞ্চমত- শিক্ষার্থীদের নির্মিত বিভিন্ন উপাদান সামগ্রী ও অনেক সময় শিক্ষার্থীদের আচরণের উৎকর্ষতা-অপকর্ষতা নির্ধারণে ও নিরুপনে উল্লেখযোগ্য উপকরণ হিসেবে কাজ করে।

ষষ্ঠত- শিক্ষার্থীদের নিজস্ব ডায়রি রাখার ব্যবস্থা রেখে তা থেকে এবং শিক্ষার্থীদের দ্বারা সংরক্ষিত বিভিন্ন রেকর্ড, কেসহিস্ট্রি থেকে বিভিন্ন বিষয় যথা শিক্ষার্থীদের আগ্রহ, উৎসাহ, দৃষ্টিভঙ্গি, নানান বাক্তিগত সামাজিক সমস্যা, এমনকি তাদের ব্যক্তিত্ব মূল্যায়ন করা সম্ভব হতে পারে।

সপ্তমত- বিজ্ঞানের পরীক্ষাগারে, খেলার মাঠে, পাঠাগারে এবং আর্টকক্ষে প্রদর্শিত শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন আচরণ ধারা পরীক্ষা করেও শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিত্বের, আগ্রহের ও কর্মকুশলতার পরিচ নেওয়া যেতে পারে।

এতে করে, শিক্ষার্থীর সামাজিক, সুসম ও সর্বোত্তম বিকাশকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উপস্থাপন ও বিশ্লেষণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকে

সার্বিকভাবে মূল্যায়নের গুরুত্ব হলো:

  মূল্যায়ন শিক্ষাক্রম উন্নয়নে সহায়তা করে মূল্যায়নের মাধ্যমে জানা যায়, কোন শিক্ষাক্রম শিক্ষক, শিক্ষার্থী জাতির জন্য উপযোগী কি-না? এই তথ্য থেকে শিক্ষাক্রম উন্নয়ন বা নবায়ন করা যায়

মূল্যায়নের মাধ্যমে বিষয়বস্তু শিক্ষণ পদ্ধতির কার্যকারিতা জানা যায় এবং পরিবর্তন, পরিবর্ধন উৎকর্ষ সাধন করা যায়

মূল্যায়ন শিক্ষাক্ষেত্রে ত্রুটিহীন যুক্তিপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে থাকে

শিক্ষার লক্ষ্যকে ব্যাখ্যা সুস্পষ্ট করণে উত্তম মূল্যায়ন পদ্ধতির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে

শিক্ষার লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য অনুযায়ী শিক্ষাক্রম এর সাহায্যে নির্ধারিত শিখনফল কতটুকু অর্জিত হল তা জানতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক অভিভাবক প্রশাসককে মূল্যায়ন সহায়তা করে থাকে

সার্বিকভাবে মূল্যায়নের গুরুত্বের আলোচনা শেষ করা সম্ভব নয় শিখন শেখানো কার্যক্রম ছাড়াও মূল্যায়ন অন্যান্য বিষয়, যেমন- শিক্ষাক্রম পরিমার্জন, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার জবাবদিহিতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় এখানে শিক্ষকের শিক্ষণ চর্চা এবং শিক্ষার্থীর শিখন প্রক্রিয়ার উন্নয়নের জন্য মূল্যায়ন কী ভূমিকা রাখে তা সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো

শিক্ষকের নিকট মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা:

শ্রেণিকক্ষের প্রতিদিনের মূল্যায়ন শিক্ষকের শিখন শেখানো কলাকৌশল উন্নয়নে সহায়তা করে

শিক্ষার্থীর শিখন তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে শিক্ষক তার উপস্থাপন কৌশল পরিবর্তন করতে পারে

প্রতিনিয়ত মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষক শিক্ষার্থীর শিখন অগ্রগতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন

শিক্ষক প্রয়োজন অনুযায়ী কোর্সের বিষয়বস্তুতে পরিবর্তন আনতে পারেন

শিক্ষার্থীকে উচ্চতর শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করাতেও মূল্যায়ন শিক্ষককে সহায়তা করে


শিক্ষার্থীর নিকট মূল্যায়নের উপকারিতা:

শিক্ষার্থীর মধ্যে নিজে জ্ঞান দক্ষতা মূল্যায়ন করার সামর্থ্য বিকশিত হয়

শিক্ষক- শিক্ষার্থীর মধ্যে সংঘটিত মিথস্ক্রিয়া অর্থপূর্ণ হয় এবং শিক্ষার্থী শিক্ষকের ভূমিকা সম্পর্কে নিরাপদ বোধ করে; শিক্ষক যে তাদের প্রতি যত্নশীল তা তাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে

শিক্ষার্থীরা আরও দক্ষতা বৃদ্ধির সাথে অধ্যয়ন করতে সমর্থ হয় এবং তাদের মূল্যবান সময় বাঁচাতে পারে

শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠ গ্রহণ এবং মূল্যায়ন দুটোই আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে

শিক্ষার্থীর উত্তম অধ্যয়ন অভ্যাস (good study habits) গড়ে ওঠে

সুতরাং মূল্যায়নের লক্ষ্য উদ্দেশ্যগুলো পূরণের জন্য আমাদের কার্যকর মূল্যায়নের কলাকৌশল জানা দরকার

 

উপসংহার:

শিক্ষায় মূল্যায়ন একটি অতীব প্রয়োজনীয় ব্যাপার একজন শিক্ষার্থীর শিখন মান উন্নয়নের জন্য মূল্যায়ন একটি উপযুক্ত উপকরণ শিক্ষাবিদগণ প্রমান করেছেন যে, মূল্যায়ন শিক্ষার্থীর শিখনকে সর্বাধিকভাবে সরাসরি প্রভাবিত করে (Gipps, 1994; Glasson, 2009) গবেষণায় দেখা গেছে, সকল পরিবেশে সব ধরণের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কোন এক ধরণের মূল্যায়ন কৌশল বা পদ্ধতি কার্যকর হয় না চূড়ান্ত মূল্যায়নের পূর্বেই শিক্ষার্থীর শ্রেণিকক্ষ মূল্যায়ন শিক্ষার্থীর শিখনকে সুসজ্জিত করে পেশাগত শিক্ষা বিষয়টিতে একজন শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতার উন্নয়ন ঘটানোর লক্ষে যে সকল কার্যাবলীর উপর গুরুত্বারোপ করা হয় তার মধ্যে শিক্ষায় মূল্যায়ন অন্যতম মূলত শিক্ষকের শিক্ষণ প্রক্রিয়ার সফলতার মাত্রা জানা এবং শিক্ষার্থীর শিখনকে সহায়তা করার জন্য মূল্যায়ন সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান অত্যন্ত জরুরী

মন্তব্য করুন

ব্লগ